কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অদ্ভুত দাঁড়কাক ॥ ইতিহাসবিদ মিশেল এ্যান্থনি

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরের ছোট্ট দ্বীপ-রাষ্ট্র ত্রিনিদাদ এ্যান্ড টোবাকো। দীর্ঘকাল স্পেনের উপনিবেশ হিসেবে থাকা এই দ্বীপ-রাষ্ট্রটির আয়তন মাত্র এক হাজার ৯শ ৮০ বর্গমাইল। আয়তনে ছোট হলেও মাথাপিছু আয়ে দেশটি অবস্থান করছে আমেরিকা ও কানাডার পরেই। বিশ্বব্যাংক একে চিহ্নিত করেছে উচ্চ আয়ের দেশ হিসেবে। ছোট্ট এ দেশটি শুধু যে আর্থিক দিক দিয়ে ধনী তা নয়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দিক দিয়েও ধনী। এই ছোট্ট দ্বীপ রাষ্ট্রটিতেই বেড়ে ওঠেছেন খ্যাতিমান লেখক মিশেল এ্যান্থনি। শৈশবে তাঁর মনোজগতে এই দ্বীপটির প্রকৃতি, মানুষ ও তাদের জীবনধারা প্রভাব বিস্তার করেছে। আর এরই প্রতিচ্ছবি তিনি এঁকেছেন তাঁর লেখায়। পাঁচ দশক ধরে তিনি লিখে চলছেন। একাধারে উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণকাহিনী এবং ইতিহাসের বই লিখে চলছেন। জয় করেছেন পাঠকের হৃদয়। পেয়েছেন অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। হয়েছেন ত্রিনিদাদের পঞ্চাশজন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন। আজকের আলোচনা সেই কীর্তিমান লেখককে নিয়ে।

মিশেল এ্যান্থনি তাঁর লেখায় কলোনিয়ালিজম, ন্যাশনালিজমের মতো বড় বড় বিষয়গুলোকে বাদ দিয়ে তুলে আনেন সমাজে ঘটে যাওয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনাগুলোকে। গল্পোচ্ছলে তুলে ধরেন সমাজের অসঙ্গতি। মানব জীবনকে দেখেন দার্শনিকের দৃষ্টিতে। বিশ্লেষণ করেন মানবসত্তা। মানুষের মনুষ্যত্ব, প্রেম, ভালবাসা, আগ্রহ-অনাগ্রহ, সমাজে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা পরিক্রমাকে স্থান দেন তাঁর লেখনীতে। খেলে চলছেন নিরন্তর মানব জীবনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো নিয়ে। হিংসা, বিদ্বেষ, ঘৃণা, হানাহানি, বৈষম্য, ভালবাসা, প্রতিজ্ঞা, প্রতিজ্ঞাভঙ্গ, অবহেলা এসব কিছু বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন মানব প্রাণে ভাল আর মন্দের নিত্য দ্বন্দ্ব।

এন্থোনির সফল উপন্যাসগুলোর দৃশ্যপট ত্রিনিদাদের দক্ষিণাঞ্চলের মায়ারো শহরকে ঘিরে। এই শহরেই তাঁর শৈশব, কৈশোর। শিশু-কিশোরের চেখে দেখা মায়ারো শহরের সৌন্দর্য, সৌন্দর্যের আড়ালে লুক্কায়িত সমাজের নোংরামি এসব কিছুকে পুঁজি করে তিনি বহু লেখা লিখেছেন। তাঁর লেখার বিশেষ্যত্ব হলো হালকা চালে তিনি অনেক গূঢ় গভীর অর্থ প্রকাশ করেছেন। সোশাল কমিটমেন্ট, রাজনৈতিক শোষণ, সামাজিক সচেতনতামূলক অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর লেখায় স্থান পেয়েছে। দেহ মনে প্রোথিত দেশপ্রেম তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে ত্রিনিদাদের প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরতে। তাই তো তিনি একেক পর এক ত্রিনিদাদ সম্পর্কিত ইতিহাসের বই লিখেছেন। যুগের পর যুগ ত্রিনিদাদবাসী এন্থোনিকে স্মরণ রাখবে তাঁর হিস্ট্রিক্যাল ডিকশনারী অব ত্রিনিদাদ এ্যান্ড টোবাগো, টাউনস এ্যান্ড ভিলেজেস অব ত্রিনিদাদ এ্যান্ড টোবাগো, গিলিম্পসেস অব ত্রিনিদাদ এ্যান্ড টোবাগো, প্রোফাইল ত্রিনিদাদ বইগুলোর জন্য। তাঁর মতো করে আর কেউ ত্রিনিদাদ এবং টোবাগোর প্রকৃত ইতিহাসকে তুলে ধরতে পারেননি। তিনি ইতিহাস লিখতে রীতিমতো দীর্ঘ গবেষণা করেছেন।

নাথানিয়েল এ্যান্থনি ও ইভা জোনস লাজারাসের ঘর আলো করে মিশেল এ্যান্থনি এই পৃথিবীতে এসেছিলেন ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৩০ সালে। বাবা-মায়ের আদরে বেড়ে ওঠা মিশেল দ্বীপের রোমান ক্যাথলিক স্কুলে প্রথমে লেখাপড়া শুরু করেন। তাঁর বয়স যখন এগারো বছর তখন তাঁকে সান ফারনানডোতে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়। খেলাধুলার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। সেই আগ্রহের প্রতিচ্ছবি তাঁর অনেক লেখাতেই পাওয়া যায়। দ্য গেমস ওয়ার কামিং এবং ক্রিকেট ইন দ্য রোড বই দুটিতে খেলাধূলাকে উপজীব্য করেই তিনি লিখেছেন। কারিগরি পাশ করে তিনি তেল পরিশোধন কোম্পানির শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। হাতুড়ি বাটল নিয়ে ঠোকাঠুকি, ওয়েল্ডি মেশিন দিয়ে লোহা গলানো, নাট বল্টু দিয়ে কাজ করতে তাঁর ভাল লাগার কথা নয়। তিনি সাংবাদিক হতে চেয়েছেন। কলম দিয়ে মানুষকে জানাতে চেয়েছেন নিজের মনে বয়ে যাওয়া কথামালাকে। নিজের শৈশবকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। ত্রিনিদাদের মায়ারো শহরকে পরিচিত করতে চেয়েছেন মানুষের কাছে। তাই তিনি কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করলেও সাংবাদিক হওয়ার বাসনা নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন ইংল্যান্ডে। সেই সময় তাঁর বয়স ছিল চব্বিশ বছর।

বিদেশ বিভূঁইয়ে যাওয়ার আগে ত্রিনিদাদ গার্ডিয়ান পত্রিকায় তাঁর কয়েকটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলো তাঁর মাঝে লেখক হওয়ার বাসনাকে তীব্র করে তোলে। কিন্তু ত্রিনিদাদে এরকম কোন চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন এ্যান্থনি। এই সময় ইংল্যান্ডে বৃত্তি নিয়ে যাওয়া বন্ধু ক্যানুথের সহায়তায় জুটিয়ে নেন চাকরি। ইংল্যান্ডে আসার ক্ষেত্রে তাঁর প্রেমিকা তাঁকে উৎসাহিত করেছিল। এ্যান্থনির ফিরে আসা পর্যন্ত মেয়েটি তাঁর জন্য অপেক্ষা করবে, সেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই ভরসায় ইংল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডে আসার পর প্রেমিকাকেও তিনি আসতে বলেছিলেন। কিন্তু কাজের চাপে প্রেমিকা আসতে পারেনি। কিছুদিন পর তাঁর প্রেমিকা লন্ডনে নার্সিং পড়তে যাওয়া সুন্দরী ইয়াবেট্টে ফিলিপের কাছে এ্যান্থনির জন্য একটি উপহার পাঠায়। ইয়াবেট্টেকে দেখেই এ্যান্থনির মনে ভালবাসা জাগ্রত হয়। প্রেমিকাকে ভুলে প্রেমে পড়ে যান ইয়াবেট্টের। তিনি বুঝতে পারেন, এই নারীর জন্যই সৃষ্টি হয়েছে তাঁর জীবন। প্রেমিকার কাছে চিঠি লেখে জানিয়ে দেন তাঁর নতুন করে প্রেমে পড়ার কথা। এ্যান্থনি ইয়াবেট্টের সঙ্গে তিন বছর চুটিয়ে প্রেম করার পর ১৯৫৯ সালে আবদ্ধ হন বিবাহ বন্ধনে।

যে লেখালেখির জন্য তিনি ইংল্যান্ডে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন, খুব শীঘ্রই বুঝে গেলেন ব্রিটিশ পত্রিকা ও ম্যগাজিন লেখালেখি এত সহজ নয়। এখানে লেখালেখিতে ক্যারাবিয়ানদের ক্যারিয়ার গড়তে বেশ বেগ পেতে হয়। বিবিসির ক্যারাবিয়ান ভয়েস রেডিও প্রোগামের জন্য তিনি কয়েকটি কবিতা ও একটি ছোট গল্প লিখে পাঠিয়েছিলেন। সেই কবিতা ও গল্পগুলো পড়ে নোবেল জয়ী সাহিত্যিক ভিআই নাইপল তাঁকে জীবনে আর কখনও কবিতা লিখতে মানা করে দেন কিন্তু গল্প লেখা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন। ক্যারিবিয়ান ভয়েসে এ্যান্থনির অনেক ছোট গল্প সম্প্রচার হয়। এই গল্পগুলো সঙ্কলন করে এক প্রকাশককে বইয়ের জন্য প্রেরণ করলে প্রকাশক প্রতিষ্ঠিত লেখক ছাড়া ছোট গল্পের বইয়ের বিক্রি ভাল হবে না এই অজুহাত দেখান। তবে তাঁকে উপন্যাস লেখার পরামর্শ দেন। এ্যান্থনি প্রকাশকের সেই পরামর্শ অনুযায়ী উপন্যাস লেখা শুরু করেন। কিন্তু সেটি উপন্যাস না হয়ে, হয়ে ওঠে আত্মজীবনী। প্রকাশক কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়ে এ্যান্থনির উপন্যাস লেখার জেদ বেড়ে যায়। হতাশ না হয়ে পুনরায় লেখা শুরু করেন। এবং লিখেন ‘দ্য গেমস ওয়্যার কামিং’ (১৯৬৩) নামক বইটি। এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। এরপর আর তাঁকে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক উপন্যাস লিখে গেছেন। আত্মজীবনী ঢংয়েই তিনি লিখতে থাকেন। এক্ষেত্রে তিনি আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এবং চার্লস ডিকেন্স দ্বারা প্রভাবিত হন।

ইংল্যান্ড ত্যাগ করার আগে লেখেন ‘দ্য ইয়ার ইন সান ফারনানডো (১৯৬৫), গ্রিন ডেইস বাই দ্য রিভার (১৯৬৭), টেলস ফর ইয়াং এ্যান্ড ওল্ড (১৯৬৭) বইটি। এরপর ইংল্যান্ডে স্বাস্থ্যগত সমস্যার মুখোমুখি হয়ে ফিরে যান নিজ মাতৃভূমি ত্রিনিদাদে। সালটা ১৯৬৮। কিন্তু সেখানে কোন চাকুরি জোটাতে পারেননি। ব্রাজিলে ইংরেজীর শিক্ষক হিসেবে চাকরি জুটিয়ে চলে যান। সেখানে ত্রিনিদাদের কনসালের সঙ্গে পরিচয় হয়। এবং ত্রিনিদাদ সরকারের পক্ষে কাজ করা শুরু করেন। ব্রাজিলের অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হলে চলে আসেন ত্রিনিদাদে। প্রথম দুই মাস ত্রিনিদাদ গার্ডিয়ানে চাকরি করার পর তিনি ন্যাশনাল কালচারাল কাউন্সিলে চাকরি পান। এখানে চাকরি করতে গিয়ে এ্যান্থনি নজর দেন দেশের ইতিহাসের প্রতি। লেখালেখিতে পুরো মনোনিবেশ করার জন্য ১৯৮৮ সালে তিনি সেই চাকরি থেকে ইস্তোফা দেন। ১৯৯২ সালে তিনি ভার্জিনিয়ার ইউনির্ভাসিটি অব রিচমন্ডে সৃজনশীল লেখনীর শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাগুলো হলো দ্য গেমস ওয়ার কামিং (১৯৬৩), দ্য ইয়ার ইন সান ফারনানডো (১৯৬৫), গ্রিন ডেইস বাই দ্য রিভার (১৯৬৭), টেলস ফর ইয়াং এ্যান্ড ওল্ড (১৯৬৭), সান্দ্রা স্ট্রিট এ্যান্ড আদার স্টোরিস (১৯৬৭), ক্রিকেট ইন দ্য রোড (১৯৭৩), কিং অব দ্য মাসকারেড (১৯৭৪), গিলিম্পসেস অব ত্রিনিদাদ এ্যান্ড টোবাগো (১৯৭৪), প্রোফাইল ত্রিনিদাদ (১৯৭৪), স্ট্রিটস অব কনফ্লিক্ট (১৯৭৬), ফক টেলস এ্যান্ড ফ্যান্টাসিস (১৯৭৬), দ্য মেকিং অব পোর্ট অব স্পেন (১৯৭৮), অল দ্যাট গ্লিটারস (১৯৮১), ব্রাইট রোড টু এল ডোরেডো (১৯৮৩), এ বেটার এ্যান্ড ব্রাইটার ডে (১৯৮৮), দ্য বেকেট ফ্যাক্টর (১৯৯০), দ্য গোল্ডেন কোয়েস্ট : দ্য ফোর ভয়েজেস অব ক্রিস্টোফার কলম্বাস (১৯৯২), দ্য চিফটেইন’স কার্নিভাস এ্যান্ড আদার স্টোরিস (১৯৯৩), ইন দ্য হিট অব দ্য ডে (১৯৯৬), হিস্ট্রিক্যাল ডিকশনারী অব ত্রিনিদাদ এ্যান্ড টোবাগো (১৯৯৭), হাই টাইড অব ইনট্রিগুয়ে (২০০১), টাউনস এ্যান্ড ভিলেজেস অব ত্রিনিদাদ এ্যান্ড টোবাগো (২০০১) ইত্যাদি।

মিশেল এ্যান্থনি লেখক হতে চেয়েছিলেন। তবে প্রকাশকের থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে নিরাশ হননি। চেষ্টা করে গেছেন। এবং সে চেষ্টার কারণেই একটা সময় তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম লেখক হিসেবে নিজের আসন গড়তে পেরেছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য হামিবার্ড মেডালসহ অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন। অর্জন করেছেন ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী। এখন তাঁর বয়স পঁচাশি বছর। কিন্তু কোন ক্লান্তি নেই। লিখে চলছেন যৌবনে প্রজ্বলিত শিখার আলোয়। এই তো, গত বছর তাঁর পঞ্চাশ বছরের লেখক জীবনের সম্মানার্থে একটি ফেস্টিভ্যাল হয় যেখানে প্রকাশ করা হয় তাঁর ‘দ্য ল্যাম্প লাইটার’ বইটি।

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫

৩০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: