কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পলায়নবাদী এক শিল্পী

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫
  • সরকার মাসুদ

ক্যাথরিন ম্যানস্ফিল্ড (কধঃযবৎরহব গধহংভরবষফ, ১৪ অক্টোবর ১৮৮৮-৯ জানুয়ারি, ১৯২৩) এক বিস্ময়ের নাম; কৌতূহলেরও। তিনি টিএস এলিয়ট, ইউজিন ও নীল প্রমুখের সমসাময়িক। কিন্তু খ্যাতির বিচারে তাদের থেকে অনেক খাটো। খ্যাতি অবশ্য লেখককে বাঁচিয়ে রাখে না, বাঁচিয়ে রাখে তাঁর সাহিত্যকৃতি। ছিয়াত্তরটি ছোট গল্প, জার্নাল এবং অসংখ্য চিঠিপত্র লিখে গেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর পর অতিক্রান্ত হয়েছে নব্বই বছর। কিন্তু দেশে-বিদেশে অসংখ্য পাঠকের মনে একটি উজ্জ্বল দীপ হয়ে থেকে গেছেন তিনি। উপরন্তু বিশ্বের বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। সুতরাং তাঁর অমরত্ব নিশ্চিত বলেই ধরে নেয়া চলে।

ক্যাথরিনকে বিশেষত তাঁর ছোটগল্প পড়ার পর, আমার খুবই উল্লেখযোগ্য লেখক মনে হয়েছে। তাঁর গল্পে একখ- জীবনের অনুপম স্বাদ লাভ করা যায়। রচনারীতি বাস্তবধর্মী। পাঠকের এ মিল জোলার কথা মনে পড়ে যেতে পারে। লেখক যেভাবে জীবনকে বলা উচিত জীবনের খ-কে, তুলে এনেছেন তাঁর লেখায় তাতে গল্পগুলোকে নতুন কোন শ্রেণীর ভেতর ফেলার প্রয়োজন পড়ে না। এ ব্যাপারে লেখকের সচেতন প্রয়াসও ছিল না। ফলে জীবন যেরকম তেমনভাবেই উপস্থাপিত হয়েছে। ছোট গল্পের এই পদ্ধতিতে প্লট বলতে তেমন কিছু থাকে না। কোন চূড়াস্পর্শী ঘটনাও লক্ষ্য করা যায় না। যা লক্ষ্য করি তা হচ্ছে, একটি চরিত্রের দৈনন্দিন জীবনের খ-িত অংশ। পরম আন্তরিকতা আর ঈর্ষণীয় দক্ষতার সঙ্গে লেখক সেটা তুলে ধরেন। জীবনের সমগ্রতার বোধকে ওই ঝষরপব ড়ভ ষরভব-এর ভেতর আস্বাদন করা সম্ভব হয়। ম্যানস্ফিল্ডের উল্লেখযোগ্য গল্প সঙ্কলন গ্রন্থগুলোর নাম, The garden party and other stories (1922), The doveÕs nest and other stories (1923), Bliss and other stories (1920) Ges Something childish and other stories (1924)| Acivci g~j¨evb M«š’¸‡jv n‡”QÑ The Journal of Katherine Mansfield (1927, 1954), The letters of Katherine Mansfield (1928, 1923) Ges Poems (1923)|

১৯০৮ সালে বিশ বছর বয়সে, ক্যাথরিন তাঁর স্বদেশ নিউজিল্যান্ড ছেড়ে যান এবং লন্ডন শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। দেশান্তরের ফলস্বরূপ তিনি যে ইংরেজ ও ফরাসী সংস্কৃতির এবং জীবনধারার গভীর সংস্পর্শে আসেন তা তাঁর সাহিত্যের জন্য খুবই ফলপ্রসূ হয়েছিল। পরিপূর্ণতাদানকারী এমন অভিজ্ঞতা একজন শিল্পীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। ক্যাথরিনের গল্পে ছেলেবেলার কথা বার বার এসেছে। বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি তাঁর লেখালেখির জন্য ইতিবাচক হয়েছিল। কেননা যুদ্ধের সময় তিনি তাঁর সহোদর ভাইকে হারান যে গভীর দুঃখপ্রদ ঘটনাটির সূত্রে লেখক বার বার পেছন ফিরে থাকিয়েছেন। আরেকটি ঘটনা ক্যাথরিনের লেখক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। সেটা হচ্ছে ১৯১১ সালে ‘ব্লুমসবেরি গ্রুপ’ নামে পরিচিত সাহিত্য আড্ডায় যোগদান। উল্লেখ্য, এই সৃষ্টিশীল দলটির অন্যান্য বিখ্যাত সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ই এম ফস্টার, ডিএইচ লরেন্স, ভার্জিনিয়া উলফ-এর মতো ব্যক্তিবর্গ। ‘ব্লুমসবেরি গ্রুপ’-এর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসার ফলে ম্যানস্ফিল্ড নিজের ভেতরের ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠেন। মানসিক দৃঢ়তা ও আত্মপ্রত্যয় তাঁকে বন্ধু-শুভাকাক্সক্ষী মহলে শ্রদ্ধেও করে তোলে।

এন্টনি এ্যালপার্স রচিত ক্যাথরিন ম্যানসফিল্ডের জীবনী ঞযব খরভব ড়ভ কধঃযবৎরহব গধহংভরবষফ (১৯৮০) থেকে আমরা জানতে পারি, ক্যাথরিনের চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অমিতাচার। তিনি এতটাই নির্ভীক ছিলেন যে, সামাজিক মূল্যবোধ ও রীতিনীতির পরোয়া করতেন না। ছিলেন সমকামী। সর্বদা দুঃস্বপ্নতাড়িত। তুষারপাতের ভেতর লন্ডনের রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত তাঁকে। গ্রীষ্মকালের রাতে শান বাঁধানো পুকুরে সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন হয়ে সাঁতার কাটতেন। পিতার সঙ্গে গুরুতর মনোমালিন্য হওয়ার পর দেশ ত্যাগ করেছিলেন তিনি। সেই তাকেই আবার দেখি মিডলটন মারির অনুগত স্ত্রী রূপে। তাঁর সৃষ্ট অসংখ্য চরিত্রের একটি খুব উল্লেখ্যযোগ্য দিক হচ্ছে লেখকের আত্মঃজৈবনিকতা। আপন ক্ষমতায় তিনি একেবারে মিশে যেতে পেরেছেন তাঁর রচিত চরিত্রের সঙ্গে। তিনি যখন কোন মহিলা বা শিশুর চরিত্র এঁকেছেন, আমরা দেখেছি, তা খুব হৃদয়স্পর্শী হয়েছে। অতটা দরদ এবং অন্তঃদৃষ্টি দিয়ে চরিত্র অঙ্কন করতে পারেন পৃথিবীর খুব কম লেখক। দু’চারটি লেখা পড়ে ক্যাথরিনকে অনুধাবন করা সম্ভব নয়। প্রকাশকালের ক্রম অনুসারে কয়েকটি গ্রন্থ পাঠ করে উঠতে পারলেই কেবল আপনি এই ক্ষয়রোগে আক্রান্ত, দুঃস্বপ্নগ্রস্ত, বেদনাতাড়িত লেখকের স্বরূপ বুঝতে পারবেন।

ক্যাথরিনের ক্ষয়রোগের পেছনে আছে তাঁর মৃত্যুর প্রচ- ইচ্ছা, এমনটাই মনে করতেন তাঁর ডাক্তার। প্রাবন্ধিক-সমালোচক মিডলটন মারির সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগে তিনি একটি অবৈধ মৃত সন্তান প্রসব করেছিলেন। জীবনীকার এ্যালপার্স মন্তব্য করেছেন যে, ওই বাচ্চাটি তার মাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেছে। জীবনী সূত্রে জানা যায়, মৃত শিশুটির মুখের দিকে তাকিয়ে মনে-মনে কিছুক্ষণ কথা বলেছিলেন ম্যানসফিল্ড। ঞযব ষরঃঃষব এরৎষ নামের গল্পে ছিন্নমূল চরিত্র ভিভিয়েন একটি মৃত বাচ্চার মুখের দিকে তাকিয়ে বলছে, তুমি যাও, আমি এখনই আসছি। ভিভিয়েন অবশ্য, তারপর, বছর বিশেক বেঁচে ছিল। সময়কে কাজে লাগানো তাঁর কাছে প্রধান বিষয় ছিল না, প্রধান বিষয় ছিল বিদায়ের প্রস্তুতি। যুদ্ধে তাঁর ভাই যেদিন মৃত্যুবরণ করে, সেদিন ক্যাথরিন এই মর্মে প্রার্থনা করেছিলেন, শোক ভুলে যাওয়ার লম্বা সময়টি যেন দ্রুতই ফুরিয়ে যায়।

সমারসেট মম, লরেন্স, উলফ, হেমিংওয়ে, জ্যাক লন্ডন প্রমুখের বইপত্র পড়লে বুঝা যায় তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু ক্যাথরিন যে জীবনের কাছে কি প্রত্যাশা করেছিলেন তা আমার কাছে আজও একটি ধাঁধা। জীবন থেকে পালানো ক্যাথরিনের মানসগঠনেরই একটি দিক। কিন্তু কেন এই পলায়নÑ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাননি এমনকি তার জীবনীকারও।

খ-ের মধ্যে সমগ্রের অনুসন্ধান অবশ্যই একটি দুরূহ প্রয়াস। ক্যাথরিন এই কঠিন কাজটিই স্বতঃস্ফূর্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন। তাঁর গল্পের পটভূমি প্রায়শই হোটেল, ভাড়া নেয়া বাড়ি, সমুদ্রসৈকত বা পরিপাটি উদ্যান। তাঁর প্রধান চরিত্ররা শিশু ও মহিলা। তবে জীবনযুদ্ধে পর্যুদস্ত, অস্থিরমতি নারীরাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। নারীকে তার সপরিবেশের মধ্যে রেখেই তিনি পুরুষপ্রধান সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরতে চেয়েছেন। ক্যাথরিন নারীবাদী নন; কিন্তু নারীর স্বাধীনতার স্বপক্ষে তাঁর কলম সব সময়ই বলিষ্ঠ।

আমার মনে হয়েছে, এই লেখকের গদ্য সূক্ষ্ম কাব্যবোধ দ্বারা প্রভাবিত। পরিস্থিতি কিংবা পরিবেশ বর্ণনা করার সময় তা বেশি করে চোখে পড়ে। অসাধারণ বাস্তববোধের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার-স্যাপার। ডায়ালগের ভেতর দিয়ে চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে সিদ্ধহস্ত তিনি। অনেক গল্পেই ক্যাথরিন প্রভাববাদী কলা-কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন। গল্পের কাঠামো ও সাহিত্যিক নির্মাণ বিষয়ে নিরীক্ষাও চালিয়েছেন। এগুলো বিবেচনায় রাখলে ইষরংং, ঞযব মধৎফবহ ঢ়ধৎঃু, অ পঁঢ় ড়ভ ঃবধ, ঞযব ষরঃঃষব মরৎষ, ঞযব ফধঁমযঃবৎং ড়ভ ঃযব ষধঃব পড়ষড়হবঃ প্রভৃতি গল্পকে উঁচু মানের সৃষ্টি বলেই মনে হয়। ক্যাথরিনের শক্তিশালী কলম তুলিত হয়েছে লরেন্স, চেখভ বা মোপাসাঁর সৃজনক্ষমতার সঙ্গে। যথার্থ এই তুলনা। ‘ব্লুমসবেরি গ্রুপ’-এর আড্ডাবাজ, ঝগড়াটে এই মহিলা সত্যিই এক ব্যতিক্রমী চরিত্র, জীবনে ও সাহিত্যে।

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫

৩০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: