কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মায়েদের উৎকণ্ঠা শুনতে কী পাও

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

চলছে রাজনৈতিক কর্মসূচি। তবে তা যে সাধারণ ও স্বাভাবিক নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই কর্মসূচি সহিংস। এতটাই সহিংস যে, নিমিষেই মানুষের জীবন প্রদীপ যাচ্ছে নিভে। ২০ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধ কর্মসূচির পাশাপাশি আবার হরতালও চলছে। অবরোধ ও হরতাল সমর্থকদের ছোড়া পেট্রেলাবামা, আগুন ও অন্যান্য বিস্ফোরক দ্রব্যে এরই মধ্যে চলতি মাসে শতাধিক যানবাহন হয়েছে ভস্মীভূত। ঝলসে আহত হয়েছেন অনেকেই। নিহতের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছেই। এর মধ্যে নারী এবং শিশুও আছেন। সবচেয়ে বড় কথা, এদের কেউই রাজনৈতিক নেতাকর্মী নন। দেশের শান্তিপ্রিয় মানুষ যে উদ্বিগ্নতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য। মায়েদের সমস্যা যে আরও বেশি, তা বললে অত্যুক্তি হবে না।

ফেনীর সেই এসএসসি পরীক্ষার্থী শাহরিয়ারের কথা অনেকেরই মনে আছে। প্রাইভেট পড়ে সহপাঠীর সঙ্গে ফেরার পথে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের ছোড়া বোমায় আহত হয়ে তার ডান চোখ চিরদিনের জন্য নষ্ট হয়ে যায়। এখন তার স্বপ্নও বিনষ্ট হতে চলেছে। এ বছর এসএসসি পরীক্ষা পড়েছে অনিশ্চয়তার মধ্যে। ডাক্তারের মতে, এ বছর পরীক্ষা দেয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না। এ ব্যাপারে তার মা রোজি রুশনার আশঙ্কাই বেশি। লেখাপড়ার গাইড থেকে শুরু করে সার্বিক পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। সারা বছর সন্তানের জন্য খেটেছেন, দিন নেই রাত নেই পরীক্ষার প্রস্তুতিতে করেছেন সহায়তা। এখন তাঁর কষ্টেরও শেষ নেই। একদিকে সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা, সংসার, আবার হাসপাতালে সন্তানের পাশে থাকতে হচ্ছে নিয়মিত। নিজের দিকে তাকাবারও সময় নেই।

গরিব মেধাবী ছাত্র অভির মায়ের কষ্টগাথা ভুলার নয়। রাজধানীর কবি নজরুল কলেজের ছাত্র ছিল অভি। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকত পুরান ঢাকায়। কোচিং থেকে ফেরার পথে অবরোধকারীদের ছোড়া ককটেলের আঘাত লাগে মাথায়। তারপর তার স্বপ্ন সাধ চিরতরে মিলিয়ে যায় না ফেরার দেশে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে অভি ছিল ছোট। বড় বোন সন্তান জন্ম দিতে কয়েক বছর আগে মারা গেলে বাবা-মার একমাত্র অবলম্বন ছিল সে। তাকে ঘিরে আবর্তিত ছিল বাবা-মায়ের স্বপ্ন। ডিম বিক্রেতা বাবা হয়ত সব আবদার পূরণ করতেও পারতেন না। মাও কষ্ট করে কিছু আয় করতেন ওর জন্য। সেই একমাত্র অন্ধের যষ্টি কেড়ে নিল সহিংস রাজনীতি। বাবার বুক যেমন ভেঙ্গে যায়, সন্তানের মৃত্যুতে তেমনি মায়েরও কলিজায় ঘটে রক্তপাত। মায়ের একটু বেশিই পোড়ে, কেননা সন্তান যে মায়ের নাড়ি ছেঁড়া ধন। এখানে নারীর কষ্টটাই বেশি প্রকট হয়ে ওঠে।

পেট্রোলবোমার আগুনে পোড়া আহতদের চিকিৎসা যেসব হাসপাতালে চলছে, সেখানে পারিবারিক স্বজন এবং সেবা-শুশ্রƒষাকারী হিসেবে নারীকেই দেখা যাচ্ছে বেশি। স্বামী, সন্তান, ভাই-বোনের পাশেই তাদের এ উপস্থিতি লক্ষণীয়। হাসপাতালগুলোর নিয়মানুযায়ী দগ্ধ আহত নারী ও শিশুদের পাশে নারী স্বজন বা অভিভাবকই অগ্রগণ্য। সেখানে নারীকে সবকিছু সামলিয়েই সময় দিতে হচ্ছে। তারা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকে, তা কিন্তু মোটেও নয়। ড্রেসিংয়ে সহযোগিতা, ওষুধ আনা, টেস্ট করিয়ে আনাÑ নানা রকম সংশ্লিষ্ট কাজ তাদের করতে হচ্ছে। আর দুশ্চিন্তা তো আছেই কখন না জানি কী হয়!

রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের এ পরিস্থিতিতে নারীদের উদ্বিগ্নতাই প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। বিশেষত, শহর এলাকার গৃহিণীদের সমস্যা ও বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা যেন প্রতি মুহূর্তে। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে সংসারের প্রাত্যহিক কাজ সেরে স্কুলপড়ুয়া শিশুসন্তানকে নিয়ে ছুটতে হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিশুসন্তানই শুধু নয়, সাবালক সন্তান নিয়েও মা যাচ্ছেন স্কুল-কলেজ বা কোচিংয়ে। এটা যেন নিয়তি। অবশ্য বর্তমান বাস্তবতায় এটা না মেনেও উপায় নেই। ফেব্রুয়ারিজুড়ে অনুষ্ঠিতব্য এসএসসি পরীক্ষার প্রায় ১৪ লাখ পরীক্ষার্থীর অভিভাবকরাও উৎকণ্ঠার মধ্যে আছেন তা বলা বাহুল্য। এই অবস্থায় অভিভাবকদের মধ্যে মা-ই দায়িত্ব পালন করেন বেশি। এখানেও নারীর সময় কাটবে উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে। যাওয়া আসার পথে তার প্রাণটা যেন থাকে হাতের মুঠোয়। এই বুঝি কোন দুর্বৃত্তের ছোড়া ককটেল-বোমা বা জ্বলন্ত পেট্রোল এসে পড়ল গায়ে! কর্মজীবী নারীও থাকেন দুশ্চিন্তায়। অফিসে যাওয়া, বাসায় ফেরার পথ তার জন্যও কুসুমাস্তীর্ণ নয়। তার বাহন পাওয়াটা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে। পেলেও সেখানে বিরাজ করে আশঙ্কা। প্রতিদিনের নানা ঝক্কি-ঝামেলার সঙ্গে এ এক নতুন বিপদ। তাকেও দগ্ধ হওয়ার ভয় নিয়ে পা বাড়াতে হয় জীবিকার তাগিদে কিংবা ঘরের টানে। অবিবাহিত নারী হলে তো তার উদ্বিগ্নতা আরেক ধাপ থাকে বেশি। শরীর-সৌন্দর্যসহ ভবিষ্যত স্বামী-সংসারের কথা ভাবতে হয় অহরহ। জীবনের চিন্তা তো আছেই।

যেসব পরিবারের পুরুষ কর্তাকে বেশির ভাগ সময় থাকতে হয় কর্মস্থলে বা সংসারের বাইরে, সেসব নারীকেও পোহাতে হচ্ছে দুশ্চিন্তাসহ বিড়ম্বনা। সংসারের কর্তা কখন সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে ঘরে ফিরবেন সেই চিন্তায় সংসারের কর্ত্রী থাকেন মহা দুশ্চিন্তায়। বাজার-সওদার দায়-দায়িত্বও পোহাতে হয় তাকে। অবরোধ-হরতালে বাজার যেহেতু স্থিতিশীল নয়, সে সবের ঝক্কি ও বিড়ম্বনা পোহাতে হয় নারীকেই। ঘরের বাইরে বাজারঘাটও তো অপরাজনীতির আগুনের বাইরে নয়; কখন তা গ্রাস করে সে চিন্তায় থাকেন তিনি উদ্বিগ্ন। এক কথায় বলতে গেলে সহিংস রাজনীতি নারী সমাজকে উদ্বিগ্নতার অতলে ক্রমান্বয়েই এগিয়ে দিচ্ছে এক ধাপ বেশি।

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫

৩০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: