মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘মাগো আল্লাহ আমারে নিয়া যায় না কেন’

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫
‘মাগো আল্লাহ আমারে নিয়া যায় না কেন’
  • বার্ন ইউনিট থেকে

শর্মী চক্রবর্তী ॥ শরীরের যন্ত্রণায় বারবার মা মা করে ডাকছেন জমির আলী (৪০)। মাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করছেন। মনে করছেন, মাকে জড়িয়ে ধরলে ব্যথা অনেকটা কমে যাবে। কিন্তু ক্ষত স্থানের জন্য মাকেও জড়িয়ে ধরতে পারছেন না। বিলাপ করছেন, মাগো ‘তুমি আমার কাছে আসো। তোমার বুকে মাথা রাখতে পারলে আমার শরীরের যন্ত্রণা একটু কমবে।’ বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটের এভাবেই আর্তনাদ করছিলেন দিনমজুর জমির আলী।

বৃদ্ধা মা জরিনা বয়সের কারণে কানে শুনেন না। ছেলে এতো বার ডাকছে এই ডাক কখনও মায়ের কানে পৌঁছায়। অনেক সময় তিনি শুনতেও পারেন না। ছেলের অস্থিরতা দেখে বুঝে নেন, ছেলের চোখের জলে বুঝতে পারেন ছেলে আমার কষ্ট পাচ্ছে। ছুটে এসে ছেলের পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলেন, ‘কাইন্দ না বাবা কাইন্দ না।’ এই বৃদ্ধা মার আর কিছুই করার নেই ছেলের জন্য। ছেলের কষ্টে মায়ের দু’চোখ গড়িয়ে পড়ছে পানি। পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট ভাই বাবু। ভাইয়ের যন্ত্রণা দেখে তার চোখের পানিও ধরে রাখতে পারছে না। মা জরিনা খাবার নিয়ে ছেলেকে খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু পেটে ক্ষুধা থাকলেও পোড়া মুখে খাবার খেতে কষ্ট হচ্ছে তার। খাবার দেখলেই ছেলে জমির আলীর আর্তনাদ আরও বেড়ে যায়, মাগো আমি খাইতে পারি না খুব কষ্ট হয়। এই কষ্ট না দিয়ে আল্লা আমারে নিয়ে যায় না কেনো। ছেলের কথা শুনে বৃদ্ধা মা বারবার তাকে সান্ত¡না দিচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে ২য় তলায় চিকিৎসাধীন জমির আলীর বেডের কাছে এমন দৃশ্যই দেখা যায়। পুড়ে যাওয়া শরীরের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছেন না তিনি। বেডে শুয়ে সর্বক্ষণ কাতরাচ্ছেন। ছেলের এই অস্থিরতা দেখে মা ও ছোট ভাই পাগলের মতো হয়ে কিভাবে তার যন্ত্রণা কমানো যায় তার চেষ্টা করছেন। একবার হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন আরেকবার পানি খাওয়াচ্ছেন। হাত নাড়াচাড়া করছেন তাতেও যদি একটু যন্ত্রণা কমে।

জমির আলী দিনমজুরের কাজ করেন। গ্রামের বাড়ি কাপাসিয়ার হাইলজর গ্রামে। সেখানেই পরিবারকে নিয়ে থাকেন তিনি। যখন হাতের কাছে যে কাজ পান তাই তিনি করেন। সংসারে স্ত্রী ও ৫ সন্তান আছে। ৩ ছেলে ২ মেয়ে। বড় ছেলে রুবেল ট্রাক ড্রাইভার তার পর এক মেয়ে। তাকে খুব কষ্টে বিয়ে দিয়েছেন। বাকি ১ মেয়ে ও ১ ছেলে পড়ালেখা করে। সবার ছোট হলো ৪ বছর বয়সের মেহেদী হাসান। বাবার এই দুর্ঘটনার পর বোনের কাছেই থাকে।

স্ত্রী পারভীন বেগম বলেন, স্বামী ও বড় ছেলে খুব কষ্ট করে সংসার চালায়। দিনমজুরের কাজ করে আমাদের সংসারের খরচ চলে। বাবার এ অবস্থার কথা শুনে ছেলে মেয়েরা পাগলের মতো হয়ে গেছে। টেলিভিশনে বাবার ছবি দেখে সবাই কান্নাকাটি করছে। বাবাকে দেখতে চাচ্ছে সবাই। কিন্তু কিভাবে আনবো তাদের এক দিকে হরতাল অবরোধ চলছে অন্যদিকে এতো টাকাপয়সা নেই যে, তাদের ভাড়া দিয়ে ঢাকায় আনবো। তিনি আরও বলেন, ২৩ তারিখ শুক্রবার আমাকে মাকে আনার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিলেন তিনি। যাওয়ার পথেই এ ঘটনা ঘটে। তার মুখ ও হাত আগুনে ঝলসে গেছে। শরীরের বিভিন্ন অংশ ও আগুনে ঝলসানো।

আহতের ছোট ভাই বাবু বলেন, আমি দিনাজপুরে থাকি। মা আমার সঙ্গেই থাকেন। ভাইয়ের এই দুর্ঘটনার খবর শেুনে মা পাগলের মতো হয়ে যান। টেলিভিশনে ভাইয়ের ছবি দেখে সেদিনই আসার জন্য পাগল হয়ে যান। পরে অনেক কষ্টে মাকে নিয়ে ঢাকা আসি। আমরা ৫ ভাই জমির আলী সবার বড়। আমি কাজের সুবাদে মাকে নিয়ে দিনাজপুরে থাকি। ভাই অনেক কষ্ট করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে এখানে থাকে। আমার ভাই তো কোন রাজনীতি করে না সে দিন আনে দিন খায়ে। তাহলে কেন তাকে এই রাজনীতির আগুনে জ্বলতে হলো? আমরা সেই নাশকতাকারীদের বিচার চাই।

সংবাদ সম্মেলন ॥ এদিকে বড় ধরনের দুর্যোগে অগ্নিদগ্ধদের চিকিৎসার জন্য ডিজাস্টার কমিটি গঠন করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) বাহারুল হক দুলাল বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নির্দেশে অগ্নিদগ্ধদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বেশকিছু সংখ্যক ডাক্তার ও নার্স নতুন করে বার্ন ইউনিটে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ৬৪ জেলা থেকে সার্জারি বিশেষজ্ঞদের এনে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটের অধীনে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেখানে এ ধরনের অগ্নিদগ্ধের ঘটনা ঘটবে সেখানেই রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হবে। প্রয়োজনে এ ডিজাস্টার কমিটি ঘটনাস্থলে ছুটে যাবে। রোগীদের সেবায় সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।

এর আগে, সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে প্রফেসর ড. সাজ্জাদ খন্দকার সাংবাদিকদের জানান, সম্প্রতি রাজনৈতিক সহিংসতায় অগ্নিদগ্ধ মোট ৯১ জনকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। বুধবার রাতে অগ্নিদগ্ধ নতুন আরও তিনজনকে ভর্তি করা হয়েছে। এ তিনজনসহ বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪৮ জন। তাদের মধ্যে ছয়জনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বার্ন ইউনিটের পরিচালক প্রফেসর ড. আবুল কালাম, আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল, বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন প্রমুখ।

Ÿুধবার রাত সাড়ে আটটার দিকে পল্লবীর কালশীতে ২২ তলা স্টান্ডার্ড গার্মেন্টের সামনে রাস্তা পারাপারের সময় ককটেলে বিস্ফোরণে আহত হন আসাদুজ্জামান (২৫) নামে এক সহকারী জজ। তিনি মিরপুর ১১ নম্বরের লালমাটিয়ার ৭১/৩ নম্বর বাড়িতে থাকেন। আহত সহকারী জজের বড় ভাই নুরুজ্জামান টিটু জানান, তার ভাই আসাদুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম পাস। তিনি সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে পোস্টিং হয়নি। আহত সহকারী জজকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তার পিঠ বোমার আঘাতে ঝলসে গেছে।

ককটেলে ঝলসে যাওয়া সহকারী জজ আসাদুজ্জামানকে দেখতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে (ঢামেক) যান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা।

বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে তিনি ঢামেক বার্ন ইউনিটের ছয় তলায় কেবিন ব্লকে চিকিৎসাধীন আসাদুজ্জামানকে দেখতে যান। তার স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নিয়ে ৫টা ৫০ মিনিটের দিকে বেরিয়ে যান।

আহত সহকারী জজের বড় ভাই নুরজ্জামান টিটু জানান, তার ভাই আসাদুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করেছেন। তিনি সহকারী জজ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন কিন্তু এখনও তার পোস্টিং হয়নি।

প্রকাশিত : ৩০ জানুয়ারী ২০১৫

৩০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: