মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সম্ভাবনাময় দেবলীনা

প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারী ২০১৫
সম্ভাবনাময় দেবলীনা
  • অঞ্জন আচার্য

এক নির্মল সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে ওঠা তাঁর। মা গান করতেন, গান করতেন মামারাও। খুব অল্পবয়সে বিয়ে হয় মায়ের। জন্মের পর দেবলীনাকে রেখেই তাই লেখাপড়া চালিয়ে যেতে হয়েছে মাকে। ফলে মামার বাড়িতেই বড় হতে হয়েছে তাঁকে। মামারা কখন গণসঙ্গীত গাইছেন, কখনওবা করছেন আবৃত্তি। শিশু দেবলীনাও পিছিয়ে থাকেননি। আধো আধো বোলে শোনাতেন রবীন্দ্রনাথের ছড়া, কবিতা কিংবা গানের কয়েক পঙ্্ক্তি। সেই বাড়িতে থাকতে তিনি দেখেছেন দলবেঁধে সবাইকে কীর্তন গাইতে। সেই কীর্তনের সুরে সুর মিলিছেন দেবলীনা সুর। এককথায় না শিখেই অনেক কিছুই শেখা হয়ে যায় তাঁর।

মায়ের কাছেই হারমোনিয়ামের রিড শেখা দেবলীনার। তাঁরই একান্ত আগ্রহে শিশুকাল থেকেই দেবলীনাকে পড়াশুনার পাশাপাশি চালিয়ে যেতে হয়েছে সঙ্গীতচর্চাও। একই সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শিশু সংগঠন চাঁদেরহাটের সঙ্গে। একদিন সেই সংগঠনের এক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে মাত্র ৫ বছর বয়সেই দেবলীনা অর্জন করেন স্বর্ণপদক। এরপর ছড়াগান গেয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন জনপ্রিয় শিশুতোষ টিভি অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’-তে। নানারকম পুরস্কার, অজস্র সম্মাননা ও অসংখ্য মানুষের প্রশংসায় নিজ জেলা যশোরে অল্পতেই তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে শিশুশিল্পী হিসেবে। এদিকে মা চাকরিতে প্রবেশ করলে তাঁর জন্য বাড়িতে রাখা হয় সঙ্গীতশিক্ষক। দীর্ঘ একটা সময় সঙ্গীতের শিষ্য হিসেবে থাকেন শিল্পী অর্ধেন্দু প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্নেহতলে। তাঁর কাছেই গানের হাতেখড়ি। তবে এসবই ছিল তাঁর গতানুগতিক। গানের প্রতি ফাঁকিবাজ দেবলীনার স্বপ্ন ছিল অন্যদিকে। আইন নিয়ে পড়ে পিতামহের মতো নিজেকে দেখতে চেয়েছিলেন ডাকসাইটে আইনজীবী হিসেবে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় স্বপ্নের বাঁক। যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তাঁর মনে হয় সঙ্গীত নিয়ে পড়ার। সেই স্বপ্নপূরণে সফল হতে দেবলীনা চলে যান শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতে বি-মিউজ অনার্সে প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে উত্তীর্ণ হন তিনি। সেখানে পেয়েছেন মোহন সিং থাঙ্গোরা, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, গোরা সর্বাধিকারীর মতো গুণী শিল্পীদের সাহচর্য। এরপর আইসিসিআই স্কলারশিপ পেয়ে ভর্তি হন কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতে প্রথম বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। এদিকে শিক্ষাজীবনেই দেবলীনার জীবনে ঘটে যায় এক বিস্ময়কর ঘটনা। ২০১২ সালের কথা। তখন তিনি রবীন্দ্র ভারতীর শিক্ষার্থী। সেসময় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য অধিদফতর আয়োজন করে ‘রাজ্য সঙ্গীত একাডেমি’ প্রতিযোগিতা। এতে অংশ নেয় দেবলীনার বন্ধুরা। মূলত বন্ধুদের জোরাজুরিতেই সেই প্রতিযোগিতায় নাম লেখান তিনি। সেখানে লোকগানে প্রতিযোগীদের নামে প্রথম স্থানকারী হিসেবে নিজের নাম শুনে বিশ্বাস করতে পারেননি তিনি, পঞ্চগীতি কবির গানে অর্জন করেন তৃতীয় স্থান। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে কল্যাণ সেন বরাট, শ্রাবন্তী মজুমদার, নির্মলা মিশ্র, অমর পালের মতো সঙ্গীত-দিকপালের সঙ্গে একই মঞ্চে গান গাওয়ার সুযোগ পান দেবলীনা। গান শুনে দর্শকরা বলতে থাকেনÑ ওয়ান মোর, ওয়ান মোর। অজস্র করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে সেই সন্ধ্যাটি। ‘এর বহুদিন পর কেউ একজন ফোন করে সেদিন আমার গাওয়া সেই গান শুনিয়েছিলেন আমাকে। এ আমার জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি।’ উচ্ছাস কণ্ঠে জানালেন দেবলীনা।

২০১৩ সালে দেশে ফিরে আসেন দেবলীনা সুর। সেই বছরের মাঝামাঝি সময় থেকেই ঢাকায় অবস্থান করছেন তিনি। আর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি জাতীয় পর্যায়ে শিল্পী হিসেবে দেশবাসীর মন জয় করে নেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারের অনুদানে নির্মিত ‘বৃহন্নœলা’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে অভিষেক হয় তাঁর। ঐ ছায়াছবির গানটিও লিখেছেন শিল্পী নিজেই। হিন্দী ‘রেইনকোট’ চলচ্চিত্রে গুলজারের লেখা মাইথেলি ভাষার একটি গানের আদলে দেবলীনা লিখলেন, গাইলেন গানÑ “প্রিয় তোর কীসের অভিমান,/ সঘন শ্রাবণ এল পায়ে পায়ে/ মথুরার পালকি এল আমার গায়ে/ এল না সে এল না/ অঙ্গিনা হলো সুনসান।”

দেবলীনা গান করেছেন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল দেশ টিভি, আরটিভি, একুশে টিভি, এসএ টিভি, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর, মোহনা, যমুনা, ইন্ডিপেনডেন্টসহ প্রায় সব দেশীয় টিভি চ্যানেলে। বছরখানিক ধরে উপস্থাপনা করছেন দেশ টিভির জনপ্রিয় ‘প্রিয়জনের গান’ অনুষ্ঠানের। এছাড়া গতবছর নবেম্বর মাসে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম মৌলিক এ্যালবাম ‘জল ফড়িং’। জি-সিরিজের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অগ্নিবীণা থেকে প্রকাশিত এ এ্যালবামটির সঙ্গীতায়োজন করেন ইমন সাহা। লাকি নাম্বার বিবেচনা করে এ্যালবামটিতে তাই রাখা হয় ৭টি আধুনিক গান। এ্যালবামের গানগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘তোমার কথা ভেবে ভেবে’, ‘ও জলফড়িং তোর ব্যস্ত দিন’, ‘ইচ্ছেগুলো আজ মেলেছে ডানা’, ‘ভালো আছো ভালো থেকো’, ‘মাঝির লাগি বইসা আছি’ গানগুলোর কথা ও সুর করেছেন শিল্পী নিজেই। এছাড়া ‘প্রভাতের স্নিগ্ধতা’ গানটি লিখেছেন সুমন সাহা ও ‘পাগল তোর জন্য আমি’ গানের সুর করেছেন ইমন সাহা।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর বিশ্বভারতী থেকে ডিগ্রি অর্জন করার পর প্রথম এ্যালবামটি কেন আধুনিক গান দিয়ে সাজিয়েছেন?- এমন প্রশ্ন রাখা হলে দেবলীনা খুব সাবলীলভাবেই বলেন- “সঙ্গীত জীবনের শুরুতে সবই শিখতে হয়েছে আমাকে। তবে কোন নির্দিষ্ট টাইপের শিল্পী হতে আমি চাইনি। তবে কলকতা থেকে ফেরার সময়ই আমি একটি গানের এ্যালবাম তৈরি করেই নিয়ে এসেছিলাম। তবে ইমন সাহার অনুপ্রেরণায় আমি আমার প্রথম অ্যালবামটি আধুনিক গান দিয়ে সাজাই।” পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপাতত চলতি এ্যালবামটির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া পাওয়ার পর পরবর্তী কাজ নিয়ে ভাবব। তবে এর মধ্যে ভালবাসা দিবস কিংবা পহেলা বৈশাখকে ঘিরে কিছু কাজ করার ইচ্ছে আছে। একক রবীন্দ্রসঙ্গীত কিংবা আধুনিক গান রেকর্ড করে সেগুলো ইউটিউবে প্রকাশ করবো।”

গত বছর অক্টোবর মাসে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন দেবলীনা। জীবনসঙ্গী সুমন সাহা দেশ টিভির প্রযোজক হিসেবে কর্মরত আছেন। কণ্ঠশিল্পী দেবলীনার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন পাশে ছিলেন ‘সুমন’ নামের সুমনের মানুষটি। নববিবাহিত জীবন কেমন কাটছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে দুজনেই একে অপরের দিকে রোমান্টিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুচকি হেসে দ্বৈতকণ্ঠে বললেন- বেশ ভাল।

প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারী ২০১৫

২৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: