মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

জঙ্গী হামলায় উন্মত্ত পৃথিবী

প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারী ২০১৫
জঙ্গী হামলায় উন্মত্ত পৃথিবী
  • জাফর ওয়াজেদ

যতই চেষ্টা চরিত্তির করুক, পাকিস্তানের পক্ষে জঙ্গী নির্মূল করা দুঃসাধ্য কাজ। কারণ রাষ্ট্রটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে জঙ্গীবাদীদের মানসজাত চিন্তা-চেতনা বিস্তৃত হয়ে আছে। সশস্ত্র জঙ্গীদের অপারেশন নিয়ে জনমনে উৎকণ্ঠা, সংশয় দেখা দিলেও তার স্থায়িত্ব বেশি নয়। সর্বশেষ পেশোয়ারে একটি স্কুলে গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে ১৪১ জন শিশুকে হত্যা করার মতো পৈশাচিকতা চালিয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান নামক জঙ্গীরা। তেহরিক-ই-তালেবান নামক এই সংগঠনটি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সৃষ্টি। আর ওই ঘটনার পর পাকিস্তানে সামরিক আদালত গঠন করা হয়েছে জঙ্গীদের বিচারের জন্য। পাকিস্তানজুড়ে বহু জঙ্গী সংগঠন সক্রিয়। কারণ জঙ্গীদের উত্থান এই রাষ্ট্রটিতে। সর্বশেষ জামাতুল দাওয়া এবং হাক্কানী নেটওয়ার্ক নামক দুটি জঙ্গী সংগঠনকে পাকিস্তান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। অনেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া চাপেই তা করা হয়েছে এবং দেরিতে হলেও। নিষিদ্ধরা আবার ভিন্ন নামে আত্মপ্রকাশ করবে নতুবা অন্য জঙ্গীর সঙ্গে একীভূত হবে। পাকিস্তানী জঙ্গীরা অবশ্য অন্য দেশেও ভাড়ায় খাটে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে ইসলামিক স্টেট যে অবস্থান নিয়েছে তাতে জঙ্গীবাদের বিস্তার আরও বাড়ছে। এই সংগঠনটি এখন শীর্ষ অবস্থান করছে জঙ্গীদের মধ্যে।

সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গীপনাকে যারা প্রশ্রয় দিয়েছেন, সৃষ্টিতে নানাভাবে সহায়ক ছিলেন, তারাই শিকার হয়েছেন প্রথমে সৃষ্ট দানবের বিকট জঙ্গীপনায়, ধ্বংসের গর্জন-তর্জনে। সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গীপনার বহুবিস্তৃত বহু বিভক্ত ডালপালার কয়েকটিকে কমজোরি করে দেয়া গেলেও বিনাশ সাধন করা যায়নি। সন্ত্রাসবাদের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ওসামা বিন লাদেন, মোল্লা ওমরকে যারা সৃষ্টি করেছেন, যারা বিকশিত করেছেন, তারাই তাদের নিধনে প্রচুর অর্থ, অস্ত্রশক্তি ক্ষয় করেছেন এবং তা করার জন্য প্রচুর শ্রমও বিনষ্ট করে অবশেষে সফল হতে পেরেছেন নিধনে। কিন্তু আতঙ্ক ও আশঙ্কার বিনাশ ঘটেনি। জঙ্গীপনার মূলোৎপাটন করা আজ দুরূহ হয়ে পড়েছে। বরং তা বিস্তৃত হয়েছে বিশ্বজুড়ে। নানা নামে নানা রূপে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। আল কায়েদার নেতা আল জাওয়াহিরিও বাংলাদেশকে টার্গেট করে ভিত্তিও বার্তা দিয়েছেন।

একজন লাদেন বা একজন মোল্লা ওমর বধ হলেই জঙ্গীপনার বিনাশ ঘটেছে, তা নয়। একজন লাদেন, একজন মোল্লা ওমরের স্থানে আরেকজন ঠিকই চলে এসেছে শূন্যস্থান পূরণে। আল জাওয়াহিরি ঠিকই বহাল রেখেছে আল কায়েদার হাল। জঙ্গীবাদকে এশিয়া থেকে আফ্রিকায় ছড়িয়ে দিতে পিছপা হয়নি। পাকিস্তানজুড়ে তারা নানা নামে কার্যক্রম চালু রেখেছে। তেহরিক-ই-তালেবান, লঙ্কর-ই-তৈয়বা, হুজি, বোকো হারাম, হিজবুত তাহরী, ইত্যাদি সব সংগঠনের ভ্রূণ আল কায়েদা তথা তালেবান গোষ্ঠী। জঙ্গীরা একদিকে প্রাণ হারায়। অপরদিকে নতুন নতুন জঙ্গী সৃষ্টি হয়।

ওসামাউত্তর বিশ্বে জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ খানিকটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। কিন্তু কোনভাবেই তাকে মুছে দেয়া সম্ভব হয়নি। হওয়ার পথও দুর্গম। এখনও তাদের হামলা, হুমকি-ধমকি, হত্যাযজ্ঞ থেমে নেই। ইউরোপ আমেরিকাজুড়েও তাদের তৎপরতা মাঝেমধ্যেই আলোড়িত, আলোচিত হয়।

বিজ্ঞানের নিয়মানুসারে সব আঘাতেরই প্রত্যাঘাত থাকে। এই নিয়ম জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়। বিশেষত, এটা প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের যুগ বললে অত্যুক্তি হয় না। প্রতিশোধস্পৃহা মানুষের মধ্যে সৃষ্টিকাল থেকেই আছে। দুর্বলের স্পৃহা থাকলেও সাধ্যে কুলায় না, সমকক্ষরা সুযোগ খোঁজে। বলবানরা প্রতিশোধের উন্মত্ততায় ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। বরাবর ছিল, কিন্তু প্রবণতা এখন আরও বলবান এবং আরও অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনাশূন্য। আর গত এক দশকের বেশি আত্মঘাতী, মানবিকতাহীন, নির্দয়, উন্মত্ত প্রতিশোধস্পৃহারই প্রকাশ। সারা পৃথিবীতেই এখন নানা মানবগোষ্ঠীর মধ্যে উগ্রবাদ রুদ্ররূপ ধারণ করে আছে। এই গোষ্ঠী ধর্ম, ভাষা বা অঞ্চলভিত্তিক হতে পারে। কিন্তু হরেদরে উগ্রবাদের বার্তা একটাই ‘মারো, মারো, মারো।’ এই মরণ হোলির যূপকাষ্ঠে বলি হচ্ছে যারা, তারা কোন চিহ্নিত শত্রু নয়। তারা সাধারণ নিরীহ পথ চলতি মানুষ।

জঙ্গী উগ্রবাদের অভ্যুত্থান ঘটে সাধারণত গরিবই দেশগুলোতে। যেমন সোমালিয়া, নাইজিরিয়া। এদের কারও কোন ধর্মীয় আদর্শবাদ থাকতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। দরিদ্র ও বঞ্চনা প্রধানত জঙ্গীবাদের ইন্ধন। ইসলামী জঙ্গীবাদের মূলে ধর্মীয় উন্মাদনার আবেগ প্রবল। এখন অবশ্যই আল-কায়েদা ও তার সহযোগী গোষ্ঠীগুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংগঠিত জঙ্গীবাদী সংগঠন। দমনীতি, দ-ভীতি, কোনকিছুতেই এরা পিছপা হবে বলে মনে হয় না। এদের বিরুদ্ধে সংগঠিত আক্রমণও সম্ভব নয়। কারণ এরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে ছদ্ম পরিচয়ে। আক্রমণের রক্তপাত যত হবে, ততই উগ্রতর হবে জঙ্গীবাদ।

সন্ত্রাসবাদ বা জঙ্গীবাদ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে শিকড়হীন বিচ্ছিন্ন এক অস্তিত্ব, যার কোন অতীত নেই, আদর্শ নেই। শুধু নির্বিচারে মানুষ খুন করার মাধ্যমে চরম ভয় ধরিয়ে দেয়ার এক বিকৃত এজেন্ডা নিয়ে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা সফলভাবে সংগঠিত করছে মগজধোলাই সম্পন্ন হওয়া অসংখ্য মানুষকে। তাদের মধ্যে বাদ যাচ্ছে না শিশু ও কিশোরও। তারা এমনভাবে একেকটি অপারেশন সম্পন্ন করছে, যার ক্ষতদাগ দেশগুলো, তাদের বাসিন্দা, এমনকি পরবর্তী প্রজন্মও বয়ে বেড়াচ্ছে দীর্ঘকাল। এও তো সন্ত্রাসবাদেরই বিস্তার। কয়েকদিনের বিশেষ কিছু নির্মম নৃশংসতার দৃশ্যাবলী হাড়হিম করা মুহূর্ত জাগরূক হয়ে আছে সারাজীবনের জন্য। একরকম ভয়াবহ পরিস্থিতি বিশ্ববাসী দেখেছে নিউইয়র্ক সিটি, লন্ডনের পাতাল রেল, ভারতের মুম্বাই শহরে জঙ্গীদের অপারেশন কিংবা ইন্দোনেশিয়া, স্পেন, ফ্রান্সও মুখোমুখি হয়েছে জঙ্গীদের জঙ্গীপনার। আর পাকিস্তান জঙ্গীদের মদদ দিতে দিতে পুরো রাষ্ট্রটিই হয়ে উঠেছে জঙ্গীবাদী সন্ত্রাসবাদীদের অবাধ বিচরণক্ষেত্র। পাকিস্তানের জনগণ তালেবান, আল কায়েদার বিষাক্ত নিঃশ্বাসে জর্জরিত। প্রতিরোধের ক্ষমতাই নেই। তালেবানরা বহু জায়গায় তাদের নিয়ন্ত্রণ বহাল রেখে তালেবানী শাসন চালু করেছে। তারা সোমালিয়া, নাইজিরিয়ার বিশাল অংশ দখল করে শাসন চালু করেছে, যা ভয়াবহ এক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জঙ্গীদের নানা ঘাঁটি রয়েছে। তাদের তৎপরতা মাঝেমধ্যেই স্পষ্ট হয়। একেক দেশে তারা একেক ধরনের ফর্মুলা প্রয়োগ করে আসছে। ধর্মের নামে তারা অধর্মের কাজ যে করছে, সে বোধোদয় তাদের নেই। বরং মনে করে, ধর্ম প্রতিষ্ঠা করছে সশস্ত্রপনায়।

এতদিকে ছড়ানো জঙ্গীদের নেটওয়ার্ক যে, লাদেন, ওমরের মৃত্যুতে তারা শেষ হয়ে যায়নি। লাদেনের একনিষ্ঠ অনুগামীর সংখ্যা কমছে, তা নয়। বরং তা নানাভাবে বাড়ছে এবং নানা দেশে নানারূপে পল্লবিত হচ্ছে। লাদেন শীর্ষস্থানে ছিলেন ঠিকই; কিন্তু ৫৪ বছরের নেতার দেখানো পথে হাঁটার মতো আরও অনেক অনুগামী এতদিনে তৈরি হয়ে গেছে। প্রদর্শকের প্রভাব যে সহজে ম্লান হয় না সে তো জানা।

এই সন্ত্রাসবাদ বা ‘টেররিজম’ ছিল এক সময় সরকারের অস্ত্র। আধুনিক বিশ্ব এই সন্ত্রাসবাদকে ঘৃণা করে। ভাবে বিচ্ছিন্ন এক নৃশংসতা, যার কোন স্বপক্ষে সর্বদাই জনমানসে গ্রাহ্য হয় না। আঠারো শতকের শেষে ফরাসী বিপ্লবের সময়ে শব্দটির উৎপত্তি। এই পর্বটাকে বলা হয় ‘Reign of terror’। ১৭৯৫ সালেও এর প্রকৃত অর্থ ছিল, ‘Government intimidation during the reign of terror in franct!’ বিপ্লবের অন্যতম নেতা রোবস্পিয়েরও কথা বলেছিলেন সন্ত্রাসের পক্ষ নিয়ে, তবে সেখানে মিশেছিল নীতি ও সততা। বিপ্লবকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য রোবস্পিয়ের সব সময়ই নিজের প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু ১৭৯৪ সালে তাকে হত্যা করার পর বিপ্লব কার্যত নির্জীব হয়ে পড়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘If the basis of a popular government in peacetime is virtu. It’s basis in a time of revolation. Is virtue and terror-virtue. Without which virtue would be Inpotent..’

এই সূত্রেই প্রশ্ন ওঠে, ওসামা নিধন-দমনের পরও জঙ্গীদের সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ দূরে থাক, হ্রাস পায়নি। কোন দেশে সীমাবদ্ধ নয় এই তথাকথিত জঙ্গীবাদ। কোন নির্দিষ্ট প্রাপ্তি বা উদ্দেশ্য না থাকলেও ধর্মের নামে তারা বিশ্বের সম্রাট হয়ে বসতে চায় যেন। দিশাহীন লক্ষ্যপূরণে এরা নিজেদের শেষ করে দিতেও বিন্দুমাত্র ভীত নয়। জিহাদের নামে মৃত্যুভয় বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাটিয়ে দেয়া হয়। এই শূন্যতাকে শেষ করে দেয়া কি খুবই সহজ; তা নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ তাদের সহযোগীরা বহুদিন ধরেই হুমকি দিয়ে যাচ্ছেই, জঙ্গী-সন্ত্রাসবাদ বরদাশত করা হবে না। সমূলে উৎখাত করা হবে। তারা অবশ্যই জঙ্গীবাদ দমনে মাঠে শাঠ্যং নীতি অবলম্বন করে আসছে। কিন্তু বলপ্রয়োগে যে গেরিলা কৌশলের জঙ্গীবাদ বা আচমকা হামলাকে বন্ধ করা গেছে, তা নয়। জঙ্গীবাদ দমন করতে গিয়ে তারা যে চ-নীতি অবলম্বন করে চ-চরিত্রের পরিচয় দিয়ে আসছেন তাতে এদেরও জঙ্গীবাদী আখ্যা দেয়া হয়ে আসছে। আফগান, ইরাক, লিবিয়াতে তারা যা করেছে তা জঙ্গীবাদকে আরও উস্কে দিয়েছে। এমনকি মার্কিনীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পাকিস্তান তো জঙ্গীবাদীদের আখড়া। (চলবে)

প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারী ২০১৫

২৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: