মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘তোমার ব্যাট আছে তোমার কাছেই’

প্রকাশিত : ২৮ জানুয়ারী ২০১৫
  • বলেছিলেন মানিন্দর সিং ও রমন লাম্বা

মোঃ মামুন রশীদ ॥ তাঁর ব্যাটে ছিল বিস্ময়! কোন এক জাদুবলে যেন বেরিয়ে আসত একের পর এক শতক- উইলো থেকে। যে হাতের ছোঁয়ায় ব্যাট থেকে রানের ফুলঝুড়ি ছুটেছে, তিনি ছিলেন ভারতীয়দের চোখে ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ উপাধি পাওয়া লিটল মাস্টার শচীন টেন্ডুলকর। ওয়ানডে এবং টেস্ট উভয় ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বাধিক ব্যক্তিগত রানের মালিক হয়েছেন তিনি বিশ্বব্যাপী লাগামহীন ঘোড়ার মতো ব্যাট চালিয়ে। এমন বিস্ময়কর ব্যাট কে বানালো? কার ব্যাট নিয়ে বাইশ’ গজে ইতিহাস সৃষ্টি করে যুগ যুগান্তরের জন্য রেকর্ডের পাতায় নিজেকে লিপিবদ্ধ করলেন শচীন? এমনটা জানার ইচ্ছা সবারই। অনেকে তাঁর ব্যাট ছুঁয়ে দেখেছেন। অবসর নেয়ার পর তাঁর ব্যবহৃত ব্যাটের নিলামে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন গাঁটের সব টাকা ঝেড়ে ফেলে সংগ্রহ করতে। ক্রিকেট বিশ্বে যখন স্বরূপ চিনিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তখন তাঁকে ব্যাট দেয়ার জন্য হাজারটা প্রতিষ্ঠান পিছু পিছু ঘুরেছে। তবে সবাইকে ব্যর্থ হতে হয়েছে। কারণ, শচীনের ব্যাট স্পন্সরের প্রতিষ্ঠান পরবর্তীতে হয়ে গেছে বিশ্বখ্যাত ক্রিড়াসামগ্রী প্রতিষ্ঠান এডিডাস। এ প্রতিষ্ঠানটিই শচীনের চাহিদামতো ব্যাট তৈরি করে নানা প্রতিষ্ঠান থেকে এনে দিয়েছে। যার প্রস্তুতকারক হিসেবে বিশ্বের প্রায় সমস্ত নামিদামি প্রতিষ্ঠানই নিজেদের দাবি করেছে। এসব কথা অবশ্য নিজের আত্মজীবনীতেও পরিষ্কার করেননি শচীন। তবে ক্যারিয়ারের শুরুতে তো আর স্পন্সর ছিল না। তাই ব্যবহার করতে হয়েছে বিসিসিআইয়ের দেয়া ব্যাট। এই ব্যাট নিয়েই নিজের লেখা আত্মজীবনীতে দারুণ এক ঘটনার বর্ণনা করেছেন ক্রিকেট ইতিহাসের এ ব্যাটিং বিস্ময়! কি সেই চমকপ্রদ ঘটনা?

অনেকে দাবি করেন শচীনের ব্যাটগুলোর অধিকাংশই আসতো অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিভিন্ন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান থেকে। সাধারণ ওজনদার ব্যাট-ই ব্যবহার করতেন তিনি। কারণ হালকা ব্যাট নিয়ে খেললে টাইমিংটা নিখুঁত হতো না বলে সেই চেষ্টা করেননি অনেকে পরামর্শ দেয়ার পরও। অনেকবারই বিস্ময়কর ইনিংস উপহার দেয়ার পর ব্যাট নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে টেস্ট ও ওয়ানডে মিলিয়ে শতকের সেঞ্চুরি হাঁকানো শচীনকে। তিনি মূলত ক্রিকেট ব্যাট বিশেষজ্ঞ রাম ভা-ারীর তৈরিকৃত ব্যাট ব্যবহার করেছেন। তবে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাট প্রস্তুতকারক টিম কিনলিরও অনেক ব্যাট তিনি চালিয়েছেন। মূলত বিএএস, আরএনএস, নিউবেরি, এমআরএফ ব্যাটই বেশি চালিয়েছেন। এর মধ্যে শুধু বিএএস ব্যাটেই নাকি শচীনের উইলো থেকে বেরিয়েছে সর্বাধিক ১৩টি শতক এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে করা ২০০ রানের ওয়ানডে ইনিংস! এছাড়াও এসএস, টিওএন, ভি১২, এসপিএস, এমএ্যান্ডএইচ, বিডিএম, হ্যামার ও এসটি ব্যাট ব্যবহার করেছেন। এর সবগুলোই শচীনের চাহিদামতো তৈরি করা হতো কিছুটা ওজনদার করে। নিজের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’-তে তিনি লিখেছেন অনেকেই তাঁকে হালকা ব্যাট ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। পরামর্শ দিয়েছেন গ্রিপ পরিবর্তনের। এ বিষয়ে শচীন লিখেছেন, ‘আমি কিছুটা বেশি ওজনের ব্যাট ব্যবহার করতাম এবং সেজন্য মাঝে মধ্যে আমাকে উৎসাহ দেয়া হতো হালকা ব্যাট ব্যবহারের। আমি চেষ্টাও করেছি কিন্তু কখনই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করিনি। কারণ আমি মনে করতাম সুবিধামতো ব্যাট চালনা নির্ভর করত ওজনের ওপর। টাইমিংটাও বেশ ভাল হতো।’

সাধারণত ব্যাটের হ্যান্ডেলের শেষ প্রান্তে হাত দিয়ে ব্যাট আগলে রাখতেন ব্যাটিংয়ের সময়। এটা নিয়েও অনেকে অনেক মন্তব্য করে একটু ওপরের দিকে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন শচীনকে। কিন্তু মাত্র ১১ বছর বয়সে যখন আসল ক্রিকেট বলে খেলা শুরু করেছিলেন তখন থেকেই তিনি এ অভ্যাসটা করেছিলেন। কারণ শচীন তাঁর চেয়ে ১০ বছরের বড় ভাই অজিতের পূর্ণ দৈর্ঘ্যরে ব্যাট ব্যবহার করতেন তখন। ভারি ব্যাট ভালভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্য একেবারে হ্যান্ডেলের গোড়া আঁকড়ে ধরতে হতো। তখন থেকেই গ্রিপের এই অভ্যাস এবং ভারি ব্যাট ব্যবহারে মানিয়ে ওঠেন শচীন। তাই অনেক কোচ বার বার গ্রিপ পরিবর্তনে কথা বলার পর সেটা চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি। এভাবে খেলেই তিনি ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমে শারদাশ্রম বিদ্যামন্দির স্কুলের হয়ে জাইলস শিল্ড ও হ্যারিস শিল্ডে দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়েছিলেন। হ্যারিস শিল্ডের রেকর্ড ১০২৫ রান করেছিলেন সে মৌসুমে। মাত্র ৫ ম্যাচে এ রান করা শচীন আউট হয়েছিলেন মাত্র এক ইনিংসে। এর মধ্যে কোয়ার্টার ফাইনালে ২০৭, সেমিফাইনালে ৩২৬ ও ফাইনালে ৩৪৬ রানের তিনটি বিস্ময়কর অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। মৌসুমের প্রথম ম্যাচে ১২৫ রান করার পর নিজের ভুলেই আউট হয়েছিলেন। শ্রবণ প্রতিবন্ধী এক অফস্পিনারের ফ্লাইটেড ডেলিভারি মিস করেছিলেন। উইকেট থেকে বেরিয়ে আসা শচীন ভেবেছিলেন স্টাম্পিং হয়েছেন। তাই পেছনে না তাকিয়েই হাঁটা দেন সাজঘরের দিকে। অথচ উইকেটরক্ষকও বলের ফ্লাইটে বিভ্রান্ত হয়ে বল ধরতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু শচীন চলে যাওয়াতে তিনি সুযোগ পেয়ে যান স্টাম্পিংয়ের।

এক বছর পরই ভারতীয় দলে সুযোগ পান প্রথমবারের মতো। তাও আবার টেস্ট ক্রিকেটে এবং দেশের বাইরে। চিরশত্রু ভূমি পাকিস্তান সফর। ক্যারিয়ারের এবং সফরের দ্বিতীয় টেস্টে ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতক হাঁকিয়েছিলেন ফয়সালাবাদে। লাহোরে তৃতীয় টেস্টে করেছিলেন ৪১। সফরের চতুর্থ ও শেষ টেস্ট ছিল শিয়ালকোট। শচীনসহ দলের অনেককেই শিয়ালকোট পৌঁছুনোর পর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল এমবি মালিক ব্যাট প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে। শিয়ালকোট আরও আগে থেকেই এখন পর্যন্ত ক্রিকেট ও ফুটবল সরঞ্জামাদি প্রস্তুতকারক অঞ্চল হিসেবে খ্যাতিমান। তখন শচীন কোন ব্যাটে খেলবেন তার কোন চুক্তি না থাকায় যেমন খুশি তেমন পছন্দ করে যেকোন ব্যাটেই খেলতে পারতেন। এই প্রথম শিয়ালকোটের মতো জায়গায় একটি বড় ব্যাট প্রতিষ্ঠানে যাওয়া, ১৬ বছর বয়সী কিশোর শচীন দারুণ উত্তেজিত ছিলেন। ওই প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান থেকে তিনটি ব্যাট নিয়েছিলেন শচীন। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ব্যাটগুলো নাড়াচাড়া করেছিলেন এতটাই পছন্দ হয়েছিল সেগুলো। স্বপ্ন ছিল চতুর্থ টেস্টে এগুলো নিয়েই ব্যাটিং করার। এক রাতে ব্যাট নিয়ে স্বপ্নও দেখেন। গভীর রাতে নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে তিনি জোরে জোরে চিৎকার করছিলেন, ‘আমার ব্যাট কোথায়?’ মানিন্দর সিং এবং রমন লাম্বা বের হয়ে দেখেন শচীন করিডর ধরে হেঁটে নিচে চলে যাচ্ছেন আর চিৎকার করছেন। দুজন তাঁকে ডাক দিয়ে বলেন,‘ তোমার ব্যাট তো তোমার কাছেই আছে।’ কিন্তু শচীন সেদিকে কর্ণপাত করেননি। এরপর তাঁরা বুঝতে পারেন শচীন ঘুমের ঘোরেই ব্যাটের খোঁজে বেরিয়েছেন। দুজনে মিলে শচীনকে ধরে আবার তাঁর কক্ষে নিয়ে শুইয়ে দেন। এরপর লাম্বার খুব ভাল বন্ধু হয়ে ওঠেন শচীন। নিয়মিত লাম্বার সঙ্গে ব্যাটিং কৌশল, ব্যাট নিয়ে আলোচনাও করেছেন তিনি। পরবর্তীতে সেই শচীন হয়ে গেছেন বিশ্বের কিংবদন্তি ব্যাটসম্যান!

সূত্র- শচীন টেন্ডুলকরের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’

প্রকাশিত : ২৮ জানুয়ারী ২০১৫

২৮/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: