মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট-৮ ॥ রোড টু মেল বোর্ন

প্রকাশিত : ২৮ জানুয়ারী ২০১৫

অস্ট্রেলিয়ার আর একটি অনন্য জয়

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সপ্তম তথা শতাব্দীর শেষ আসর বসে ১৯৯৯ সালে। আর ঊনিশ শতকের শেষ আসর আয়োজনের দায়িত্ব পেল আবারও সেই ইংরেজরা। যারা বিশ্বকাপের প্রথম তিনটি আসর সফলভাবে সম্পাদন করেছিল। এক সময় মনে করা হচ্ছিল ইংরেজরা ছাড়া আর কেউ বিশ্বকাপের মতো এতবড় আসর আয়োজন করতে পারবে না। ইংল্যান্ডের বাইরে বিশ্বকাপের তিনটি আসর বসার পর সবার সে ধারণা পাল্টে যায়। তারপরও ২০ বছর পর আবারও ব্রিটেনে বসল বিশ্বকাপের সপ্তম আসর। তবে আগের তিনটি বিশ্বকাপ ইংরেজরা একা আয়োজন করলেও এবারে আর সেটা করতে পারেনি। আইসিসি এবারে তাদের সঙ্গে আরও দুই ল্যান্ড স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডকে সহ-আয়োজক মনোনীত করে। আর যেহেতু বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রথম ৩টি আসর বসে ইংল্যান্ডে সেহেতু সপ্তম আসরের সফলতা নিয়ে কারও কোন সন্দেহের অবকাশ ছিল না। কেবলমাত্র বিশ্বকাপই নয়, ফুটবলের বড় আসর বিশ্বকাপ ফুটবল, অলিম্পিক গেমস, আইসিসি ট্রফির মতো ক্রিকেটের সবচে’ বড় টুর্নামেন্টের প্রথম ৩টি আসরও সফলভাবে সম্পাদন করে নিজেদের আগেই প্রমাণ করেছিল ইংরেজরা।

এ বিশ্বকাপের বাংলাদেশের জন্য বিশেষ চমক অপেক্ষা করছিল। বলা যায় ‘স্পেশাল ওয়ার্ল্ড কাপ ফর বাংলাদেশ’। যদিও বাংলাদেশ এর আগেই ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিতে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ফেলেছিল। সুতরাং অংশগ্রহণটা কোন নতুন খবর ছিল না। চমকটা ছিল অন্যখানে। অভিষেক বিশ্বকাপে বাংলাদেশ স্বাগতিক স্কটল্যান্ডকে তাদের দেশের মাটিতে ২২ রানে হারিয়ে তামাম ক্রিকেটবিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেয়। এখানেই চমকের শেষ হয়নি। এর পরে বাংলাদেশ ‘৯২’র চাম্পিয়ন পাকিস্তাকে অপ্রত্যাশিতভাবে ৬২ রানে হারিয়ে দিলে সারা ক্রিকেট দুনিয়ায় রীতিমতো আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। বাংলাদেশ উঠে আসে পাদপ্রদ্বীপের আলোর নিচে। সারা ক্রিকেটবিশ্ব বাংলাদেশকে নতুন করে চেনে।

দু’একটি ছোটখাটো বিষয় বাদ দিলে সপ্তম বিশ্বকাপের নিয়ম-কানুন মোটামুটি আগের মতোই একই রকম থাকে। এবারেও বিশ্বকাপে ৫০ ওভার করে খেলার নিয়ম বহাল থাকে। এবারের বিশ্বকাপে মোট ৪২টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দ. আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুইয়ে, বাংলাদেশ, কেনিয়া, ও স্কটল্যান্ড এবারের বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার সুযোগ পায়। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও আয়ারল্যান্ডের ২২টি স্টেডিয়ামে এ বিশ্বকাপের খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। স্টেডিয়ামগুলো হচ্ছেÑ ইংল্যান্ড : লর্ডস, ওভাল, ওল্ড ট্রাফোর্ড, এজবাস্টন, হেডিংলি, ট্রেন্টব্রিজ, হোভ, ডার্বি, ট্যানটন, ব্রিস্টল, ইরস্টার, এ্যামস্টেলডিন, উরচেস্টার, ক্যান্টবেরি, চেমসফোর্ড, নর্দাম্পটন, সাউদাম্পটন, লিস্টার, কার্ডিফ, চেস্টার ল’ স্ট্রিট। স্কটল্যান্ড : এডিনবরা ও আয়ারল্যান্ড : ডার্লিন।

সপ্তম বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী ১২টি দলকে দুই গ্রুপে ভাগ করা হয়। গ্রুপ পর্বের শীর্ষ ৬টি দল সুপার সিক্সে ওঠে। সুপার সিক্সে সেরা ৪ দল সেমি-ফাইনাল ও সেফিাইনাল বিজয়ী দুই দল ফাইনাল খেলে। ফাইনালে বিজয়ী দল চ্যাম্পিয়ন হয়। গ্রুপ এতে ইংল্যান্ড, ভারত, দ. আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুইয়ে ও কেনিয়া এবং গ্রুপ বিতে অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, বাংলাদেশ ও স্কটল্যান্ড খেলে। ১৪ মে উদ্বোধনী ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ক্রিকেটের জনক স্বাগতিক ইংল্যান্ড। স্বাগতিক ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়নদের ৮ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে হারিয়ে এ বিশ্বকাপেও শুভ সূচনা করে। এ জয়ের পেছনে এ্যালেক স্টুয়ার্ট ও গ্রাহাম হিকের বড় অবদান ছিল। স্টুয়ার্ট ৮৮ ও হিক অপরাজিত ৭৩ রান করে ইংল্যান্ডকে সহজ জয় পাইয়ে দেন। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ স্কটল্যান্ড ও পাকিস্তানকে হারিয়ে চমক দেখানো ছাড়াও জিম্বাবুইয়ে এবারও একটি অঘটন ঘটিয়ে ফেলে। তারা ভারতকে ৩ রানে হারিয়ে দেয়। যদিও তাতে করে ভারতের সুপার সিক্সে ওঠার পথে কোন বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। বাকি সব ম্যাচে প্রত্যাশিত ফলাফল দেখা যায়।

দ. আফ্রিকা এ গ্রুপে ৫ ম্যাচের ৪টিতে জিতে ৮ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে গৌরবের সঙ্গে সুপার সিক্সে ওঠে। এ গ্রুপের অপর ভারত ৩ খেলায় ৩ জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্স আপ হয়। বি গ্রুপে পাকিস্তান গ্রুপের ৫ ম্যাচে ৪টিতে জিতে ৮ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ও অস্ট্রেলিয়া ৫ ম্যাচের ৩ ম্যাচ জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্স আপ হয়। জিম্বাবুইয়ে বড় দলগুলোকে টপকে সুপার সিক্সে উঠে সবাইকে চমকে দেয়। যদিও সুপার সিক্সে তারা ভারতকে নিয়ে বাদ পড়ে। তেমন কোন অঘটন ছাড়াই শেষ হয় সুপার সিক্স পর্ব।

প্রথম সেমি-ফাইনালে পাকিস্তান ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। নিউজিল্যান্ডের ৫০ ওভারে ৭ উইকেটে ২৪১ রান তাড়া করে জয় তুলে নিতে পাকিস্তানকে মাত্র ১টি উইকেট খরচা করতে হয়। হাতে থাকে ১৫টি বলও। সাঈদ আনোয়ার করেন ১১৩ রানের এক অনুপম ইনিংস। অপর সেমিফাইনালে দ. আফ্রিকার সঙ্গে ভাগ্য আরও একবার প্রতারণা করা। এর আগে ১৯৯১ সালের সেমিফাইনালে বৃষ্টি তাদের জয় কেড়ে নেয়। তাদের ১ বলে ২২ রান করার হাস্যকর টার্গেট দেয়া হয়। আর এবার তাদের ইনিংস শেষ হয় ঠিক ২১৩ রানে। অস্ট্রেলিয়াও প্রথমে ব্যাট করে ২১৩ রান করে। ফলে সুপার সিক্সে দ. আফ্রিকার বিপক্ষে জয় পাওয়ার সুবাদে অস্ট্রেলিয়া আবার একটি হাস্যকর জয় পায়। আরও একবার স্বপ্ন ভঙ্গ হয় স্প্রিংবকদের। ২০ জুনের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া পাকিস্তানের মোকাবেলা করে। পাকিস্তান শুরু থেকে দাপটের সঙ্গে খেলে আসলেও ফাইনালে দর্শক দেখল অন্য এক পাকিস্তানকে। যে পাকিস্তানের সঙ্কে আগের পাকিস্তানের কোন সম্পর্কই নেই। এ যেন এক রিভার্স পাকিস্তান। এক অচেনা পাকিস্তান। ফাইনালে পাকিস্তান ১৩২ রানের এক ম্যাড়মেড়ে ইনিংস খেলেও সেটা টপকাতে অস্ট্রেলিয়াকে এতটুকু বেগ পেতে হয়নি। অস্ট্রেলিয়া হেসে-খেলে মাত্র ২০.১ ওভারে ২ উইকেট খরচায় সহজ জয় তুলে নেয়। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া (২০.১ ওভারে ১৩৩/২ রান) ৮ উইকেটে পাকিস্তানকে (৪৯.২ ওভারে ২২৭ রান) হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায়। অস্ট্রেলিয়ার উইকেট-কিপার এডাম গিলক্রিস্ট ৫৪ রান করেন। বিজয়ী দলের শেন ওয়ার্ন ৩৩ রানে ৪ উইকেট নেয়ার সুবাদে হন ম্যান অব দ্য ফাইনাল। তিনি সেমিফাইনালেও ৩২ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলেন। সেমিফাইনালের আগেই দ. আফ্রিকার ল্যান্স ক্লুজনার ‘ম্যান অব দ্য সিরিজ’ ঘোষিত হওয়ায় অন্য কারও আর ‘ম্যান অব দ্য সিরিজ’ হওয়ার সুযোগ ছিল না।

ভারতের রাহুল দ্রাবিড় ৮ ম্যাচে ৬৫.৮৫ গড়ে ৪৬১ রান করেন ও নিউজিল্যান্ডের জিওফ এ্যালোট ৯ ম্যাচে ১৬.২৫ গড়ে ও অস্ট্রেলিয়ার শেন ওয়ার্ন ১০ ম্যাচে ১৮.০৫ গড়ে ২০টি করে উইকেট নেন। চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া দলের নেতৃত্ব দেন স্টিভ ওয়াহ এবং রানার্স আপ পাকিস্তান দলের ওয়াসিম আকরাম। সপ্তম বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্টিভ বাকনার এবং ইংল্যান্ডের ডেভিড শেফার্ড। সপ্তম বিশ্বকাপে যে যোগ্য দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়া কাপ জয় করেছিল এ কথা অনেকেই মানবেন না। এ বিশ্বকাপে সেরা দল ছিল দ. আফ্রিকা ও পাকিস্তান। কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় ছিল না। ম্যাচ জিততে যে ভাগ্য সহায় থাকতে হয় সে কথাটা এ বিশ্বকাপে আবার প্রমাণিত হলো। (চলবে)

ব-সধরষ : ংুবফসধুযধৎঁষঢ়ধৎাবু@মসধরষ.পড়স

প্রকাশিত : ২৮ জানুয়ারী ২০১৫

২৮/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: