রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সংসদে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড়

প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • সংসদে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড়
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অসদাচরণ
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অসদাচরণ

সংসদ রিপোর্টার ॥ সমবেদনা জানাতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিএনপির আচরণে রবিবার নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল জাতীয় সংসদে। প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সাক্ষাত করতে না দেয়ার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন সরকার ও বিরোধী দলের সিনিয়র সংসদ সদস্যরা।

তাঁরা এ ঘটনাকে ‘চরম রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত’ আখ্যায়িত করে বলেছেন, দরজা বন্ধ করে দিয়ে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীকে নয়, সারা বিশ্বের মানবতাকে অপমান করেছে। বিএনপি নিজেদের অপমানিত করার পাশাপাশি মানবতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ ও মানুষের আকাক্সক্ষাকেও অপমানিত করেছে। এ ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণিত, যারা কথিত আন্দোলনের নামে ৩০ মানুষকে পুড়িয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতে পারে, সেই দলটির কাছ থেকে রাজনৈতিক শিষ্টাচার বা ভদ্রতা আশা করা যায় না। কোন মায়ের পুত্র হারানোর শোক অনেক কষ্টের। পেট্রোলবোমায় নিহতদের মায়ের ভীষণ কষ্ট ও যন্ত্রণা এবার হয়ত বুঝতে পারবেন খালেদা জিয়া। পুত্রের মৃত্যুশোকের মধ্যেও বিএনপি নেত্রী কীভাবে হরতাল-অবরোধের কর্মসূচী বাড়িয়ে আরও মৃত্যুর পথ প্রশস্ত করতে পারেন, এটা দেখে গোটা জাতিই আজ বিস্মিত, হতবাক।

মাগরিবের নামাজের বিরতির পর স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হলে অনির্ধারিত এ বিতর্কের সূত্রপাত করেন বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ। বিতর্কে অংশ নেন সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দিপু মনি, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, জাসদের মইনউদ্দীন খান বাদল।

রওশন এরশাদ আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে শোক এবং বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করে বলেন, দেশবাসী যখন জানতে পারল প্রধানমন্ত্রী সমবেদনা জানাতে যাচ্ছেন তখন পুরো জাতি আশান্বিত হয়েছিলেন হয়ত এবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সংঘাত-নাশকতা বন্ধ হবে। হরতাল-অবরোধে আহত হয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা দগ্ধ মানুষরাও ভেবেছিলÑ দু’নেত্রীর সাক্ষাত হলে হয়ত এসব জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ হবে। কিন্তু তা হয়নি। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সেখানে যাবেন তা দু’ঘণ্টা আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। সন্তানশোকে বিএনপি নেত্রীকে ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার ঘটনা হতেই পারে। কিন্তু তখন ওই কার্যালয়ে তো বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা ছিলেন। তাঁরা কি সামান্য শিষ্টাচার দেখাতে পারলেন না?

তিনি বলেন, গাড়িতে পেট্রোলবোমা মেরে মানুষ হত্যা চলছেই। মানুষ আশাবাদী হয়েছিল দুই নেত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত হলে একটি সমঝোতা হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী গেলেও প্রধানফটকে তালা লাগিয়ে দেয়ার ঘটনায় গোটা জাতিই মর্মাহত। প্রধানমন্ত্রী যখন গুলশানের কার্যালয়ে যান তখন সেখানে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, এম কে আনোয়ার, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারসহ বিএনপির বড় বড় নেতা এবং বিএনপি নেত্রীর আত্মীয়-স্বজনরা ছিলেন। তাঁরাও তো এসে প্রধানমন্ত্রীকে ভেতরে নিয়ে যেতে পারতেন, কথা বলতে পারতেন, শোকবইয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাক্ষর করার সুযোগ দিতে পারতেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁদের কাছেই তাঁর শোক জানাতে পারতেন। কিন্তু সেই ভদ্রতাটুকু না করার ঘটনায় পুরো জাতিই হতবাক ও মর্মাহত। বিএনপি যা করেছে তা দেশের মানুষের সঙ্গে শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। তিনি বিএনপি নেত্রীকে সমবেদনা জানাতে যাওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।

সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেন, বিএনপির নেত্রীর সন্তান হারানোর ঘটনায় আমরাও ব্যথিত। দেশবাসী দেখেছে কি ঘটেছে। তাই এই দুঃখজনক বিষয়টি নিয়ে বেশি আলোচনা না করাই ভাল। তোফায়েল আহমেদ বলেন, একজন মা হিসেবে আরেক পুত্রহারা মাকে সমবেদনা জানাতে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু হঠাৎ করেই দরজায় তালা মেরে দেয়া হয়। ভেতর থেকে জানিয়ে দেয়া হলো দেখা করা যাবে না। তখন কার্যালয়ের ভেতরে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা ছিলেন। একজন প্রধানমন্ত্রী সবকিছু ভুলে গিয়ে মানবিকতা, সহমর্মিতা নিয়েই গিয়েছিলেন, কিন্তু পারলেন না। এ ঘটনা বাঙালী জাতি গ্রহণ করেনি। তিনি বলেন, দেখা না করার ঘটনায় বিস্মিত বা অবাক হইনি। বিস্মিত হয়েছি একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী সন্তান হারিয়েও অবরোধ ও হরতাল বৃদ্ধি করেছেন। তাঁর ছেলে নিহত হয়নি, স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু যাদের কথিত আন্দোলনের নাশকতায় যেসব মায়ের বুক খালি হচ্ছে সেই মায়েদের কষ্ট-ব্যথা যে কতটা ভীষণ তা হয়ত এখনও বিএনপি নেত্রী বুঝতে পারছেন না। সরকারের চরম সমালোচকরাও এখন স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন- প্রধানমন্ত্রী বিরল একটি কাজ করেছেন। আর বিএনপি যা করেছে তা মোটেও কাম্য ছিল না।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, বঙ্গবন্ধুর কন্যা যেখানে যান জাতীয় পতাকা নিয়ে যান, জাতির প্রতিনিধিত্ব করেন। কিন্তু অপাত্রে ঘৃতদান করলে বিপদ আছে। মায়ের মমতা নিয়ে সমবেদনা জানাতে একজন প্রধানমন্ত্রী সাবেক একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে গেলেন। যারা আন্দোলনের নামে নৃশংসভাবে মানুষকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করতে পারে, তাদের কাছে মানবতাবোধ আশা করা যায় না- তা আবারও প্রমাণিত। যিনি মারা গেছেন (কোকো) তিনি দ-িত অপরাধী। তার মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রী কেন, কোন মন্ত্রীরই তো যাওয়ার কথা ছিল না। এর পরও শুধু মানবতাবোধ ও মায়ের মমতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী গেলেন, কিন্তু তাঁকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দেখা করতে না দিয়ে বলা হলোÑ খালেদা জিয়াকে নাকি ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে! তিনি বলেন, এই ঘটনায় আমাদের শিক্ষা নিতে হবে আর অপাত্রে ঘি ঢালা যাবে না। আগামীদিনের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই ঘটনা কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। আগুনের সঙ্গে যেমন তেলের মিল করা যায় না তেমনি অপরাধী অপরাধীই।

শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী পৌঁছানোর ৫ মিনিট আগে বিএনপি নেত্রীর কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেয়া হয়। যাদের মধ্যে বিন্দুমাত্র সৌজন্য, ভদ্রতা, মনুষ্যত্ব আছে তারা এ কাজটি করতে পারতেন না। বিএনপি চেয়েছিল প্রধানমন্ত্রীকে অপমানিত করতে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে নয়, পুরো দেশ ও গোটা জাতিকে অপমানিত করেছে বিএনপি। নিজেরাও অপমানিত হয়েছে, সারাজাতি তাঁদের ধিক্কার দিচ্ছে। তিনি বলেন, যারা নিষ্ঠুরভাবে মানুষকে পুড়িয়ে মারতে পারে তাদের কাছ থেকে শিষ্টাচার, মানবতা ও ভাল ব্যবহার আশা করা যায় না। তিনি বলেন, সেখানে বিএনপির পক্ষ থেকে নাটক ও তামাশা করা হয়েছে। ইঞ্জেকশন দিলে সারারাত ঘুমিয়ে থাকার কথা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী ফিরে আসার ৩০ মিনিট পরেই খালেদা জিয়া ধন্যবাদ জানালেন। এটা কী ধরনের তামাশা? সন্তান হারানোর পরও বিএনপি নেত্রী অবরোধ-হরতাল দিয়ে মানুষ হত্যার নির্দেশ কিভাবে দিতে পারেন, তা ভেবে গোটা জাতি আজ হতবাক।

মইনউদ্দীন খান বাদল বলেন, কথিত অবরোধ-হরতালের নামে যে ৩০ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তারাও কোন না কোন মায়ের সন্তান। একজন মা-ই বোঝেন সন্তান হারানোর প্রচ- ব্যথা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবতা ও মানবিকতা থেকেই বিএনপি নেত্রীকে সমবেদনা জানাতে গিয়েছিলেন। আমরা কেউ অমানুষ নই যে এ ঘটনা নিয়ে রাজনীতি করব। আমরাও আশা করি, বিএনপি নেতারাও যেন লাশ নিয়ে, দাফন নিয়ে কোন রাজনীতি না করেন, নতুন করে মাতম সৃষ্টি না করেন।

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি কোকোর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, রাজনীতিবিদদের জন্য চরম অস্বস্তিকর-লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেছে বিএনপির গুলশানের কার্যালয়ে। একজন মা, রাজনীতিবিদ ও দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মানবিকতা থেকেই পুত্রশোকে কাতর বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে গিয়েছিলেন। যে কোন মায়ের কাছে সন্তান বিয়োগের মতো বেদনাদায়ক ঘটনা আর হতে পারে না। একজন মা শোকে মূহ্যমান হবেন, ইঞ্জেকশন দিয়ে তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হতেই পারে- এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অস্বাভাবিক হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির কার্যালয়ে পৌঁছানোর দু’মিনিট আগে প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেয়ার ঘটনা। দেশের প্রধানমন্ত্রী রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলেন, অথচ ফটকের তালা খোলা হলো না! এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী অপমানিত হননি, অপমানিত হয়েছে মানবতা, মানবিকতা, মূল্যবোধ ও মানুষের আকাক্সক্ষার। একটি মৃত্যু নিয়ে যে দল এমন চরম অসৌজন্যতাবোধ দেখাতে পারে, জাতি তাদের কাছ থেকে কী আশা করতে পারে?

প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারী ২০১৫

২৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: