মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সন্তানের জন্যই হোন আদর্শ অভিভাবক

প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারী ২০১৫
সন্তানের জন্যই হোন আদর্শ অভিভাবক
  • সিরাজুল এহসান

সাধারণ ও প্রচলিত নিয়মে মানব জীবনে সন্তানের পিতা-মাতা হওয়া প্রতিটি বিবাহিত নর-নারীই প্রথম ও প্রধান চাওয়া। এর মধ্যে শুধু নরনারীর চরম আকাক্সক্ষাই নিহিত নয়Ñ সংসারের বন্ধন দৃঢ় ও স্থায়ী করতে সন্তান বড় নিয়ামক। এক অপার্থিব আনন্দবার্তা নিয়ে আসে সন্তান; সৃষ্টি করে আনন্দঘন পরিবেশ যেখানে শুধু আনন্দ আর আনন্দ। পিতামাতার অপত্য স্নেহের জোয়ার বইতে থাকে সংসারময়। সংসারের খরা সময়ে এই সন্তানই দেবদূতের মতো ঝরায় স্বস্তির বৃষ্টি। তাকে ঘিরেই পিতামাতা রোপণ করেন আগামীদিনের স্বপ্নবীজ। অন্তত বাঙালি সমাজে সংসারের বন্ধন সুদৃঢ়করণের প্রতীক হিসেবে সন্তানকেই করা হয় অগ্রগণ্য।

সন্তানকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সবার আগে প্রয়োজন আদর্শ অভিভাবক ও অনুক’ল পরিবেশ। এ ব্যাপারে আবশ্যকীয় কিছু বিষয় জেনে নেওয়া যাকÑ

মনে রাখা দরকার বিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর চার বছর বয়সেই কিছু বোধ আর স্মৃতি তৈরি হয়। এ সময়ে শিশু না বুঝেই অনেক অনাকাক্সিক্ষত আচরণ করে, শব্দ-বাক্য বলে ফেলে। পিতামাতা বিরক্ত ও বিব্রত হতে পারেন। তাকে ধমক না দিয়ে, মারধর না করে বুঝিয়ে বলতে হবে সে যা করছে তা ভালো নয়, খারাপ। কোনটা ভালো কোনটা মন্দ বোঝাতে সচেষ্ট হোন। পুনরায় যদি অনুরূপ ঘটনা ঘটে থাকে আচরণ দিয়ে বোঝাতে হবে তার ওপর বিরক্ত হয়েছেন। এ বয়সে ধমক বা মারধর তার মনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। বয়সের ধর্মানুযায়ী শিশু এ বয়সে বেশি আদর যতœ চায়।

ছেলেমেয়ে থাকলে লিঙ্গ বৈষম্য দেখানো মোটেও সমীচীন নয়। বোঝাতে চেষ্টা করুন সে মানুষ এবং আপনার সন্তান। ছেলে এবং মেয়েকে সমান চোখে দেখুন। কোনো খাদ্য, উপহার সামগ্রী প্রদানে ছেলেমেয়ের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখুন।

সন্তান বড় হচ্ছে, প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হোন। পর্যাপ্ত সময় তাকে দিন। গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বামী-স্ত্রী সময় ভাগাভাগি করে নিয়ে কাছে থেকে শিক্ষার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করুন ও সহায়তা দিন। চিহ্নিত করুন শিক্ষক যা চান তা আপনার সন্তান দিতে পারছে কি না। না পারলে সমস্যা কোথায় তা বের করে সমাধানে সচেষ্ট হোন। এতে সন্তানের সঙ্গে আপনার বন্ধন আরও দৃঢ় এবং পরস্পরকে বুঝতে ও চিনতে সহায়ক হবে।

নিজের রাগ, দুঃখ, হতাশার জের সন্তানের ওপর চাপানোর চেষ্টা করবেন না। কখনো তার দ্বারা মানসিকভাবে আহত হলেও সরাসরি দোষারোপ না করে বুঝিয়ে বলুন তার কাছ থেকে এমন আচরণ আপনি আশা করেন না।

পিতামাতার দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকুন। উদাসীনতা যেন ভর না করে।

সন্তানের সমস্যা নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করুন। কীসে, কীভাবে সমস্যা সমাধান হতে পারে তার কাছ কাছ থেকে প্রথমে জেনে নিন। অগ্রহণযোগ্য হলে কৌশলে এড়িয়ে যান। এর পর নিজেরা সিদ্ধান্ত নিন সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়।

এ দেশে গ্রাম ও শহুরে জীবনধারা, পারিবারিক সংস্কৃতির পার্থক্য রয়েছে। আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের পরিবারে কারো একার পক্ষে আয় করে জীবন নির্বাহ করাটা এখন দুরূহ। এমন অবস্থায় সংসার ও সন্তানকে বাবা বা মার পক্ষে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। ভাগ করে হলেও বাবা মাকে সময় বের করা আবশ্যক। কর্মজীবী বাবা মা’র জন্য এ বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

দুরন্তপনাতে বিরক্ত না হয়ে স্বাভাবিকভাবে শিশুকে চলতে দেওয়াই ভালো। শৈশব-কৈশোরে দুরন্তপনা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। দুরন্তপনা প্রাণোচ্ছ্বলের বহিঃপ্রকাশ। সেটা না থাকলেই বরং একটু চিন্তার বিষয়। এ গতি ব্যাহত হলে মনে রাখতে হবে সন্তানের মানসিক ও শারীরিকভাবে বেড়ে ওঠায় কোথাও কোনো সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে দুরন্তপনায় নেতিবাচক কিছু পরিলক্ষিত হলে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন তার কোন কোন দিকগুলো সীমা লঙ্ঘন করছে।

কখনোই বিরক্ত হয়ে শারীরিক আঘাত করা, অন্ধকার ঘরে বা বাথরুমে আটকে রাখা থেকে বিরত থাকুন।

সন্তানের সামনে ভুলেও যে কাজটি করবেন না তাহলোÑ স্বামী-স্ত্রী কেউ কাউকে হেয়, ছোট বা অপদস্ত করা। এতে শিশুর মনের ওপর প্রচ- নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পিতামাতা সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব তো জন্মাবেইÑ ভবিষ্যতে সম্মান-শ্রদ্ধা করতে দ্বিধা কাজ করতে পারে। আগামীদিনে তাদের দাম্পত্য জীবনেও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

সন্তানের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সময় হলো বয়ঃসন্ধিকাল। এ সময়টায় মানব দেহ ও শরীরে সবকিছুই দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। নিজেকে বড় ভাবতে শেখে। আসলে তা ‘অপরিপক্ব মস্তিষ্কপ্রসূত’ ভাবনা। এ সময়ে অভিভাবকের দায়িত্ব ও সতর্কতা বেশি। ছেলে হলে সমবয়সী মেয়েদের কাছ থেকে দূরে না রেখে বরং মিশতে দিন। নিজেই ভালো করে বুঝতে শিখুক লিঙ্গগতভাবে সে পুরুষ। লৈঙ্গিক ও শারীরিক পার্থক্য নারী ও পুরুষের মধ্যে রয়েছে। একই কথা অবশ্যই মেয়েদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মেয়েদের ব্যাপারে ছেলেদের তুলনায় শারীরিক পরিবর্তনটা দ্রুত ঘটে এবং তা স্পষ্টত বোঝা যায়। এ সময়ে পিতার চেয়ে মাকেই বেশি দায়িত্ব পালন করা জরুরি। শরীরের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করে তুলুন। তবে এমনটা করা মোটেও সমীচীন হবে না যা করলে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ভয়, অশ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায়।এ সময়ে ছেলেমেয়ে উভয়ই মানসিক দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে, নিজের পরিবর্তন ভাবিয়ে তোলে। শারীরিক কিছু জটিলতাও সৃষ্টি হয়। তাদের দিকে বন্ধুর মতো হাত বাড়িয়ে দিন। সন্তানদের বুঝিয়ে বলুন এ পরিবর্তন স্বাভাবিক। সবার জীবনেই ঘটে। নিজেকেই দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরুন যে আপনার জীবনেও এমনটা ঘটেছিল। বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিনÑ সে এখনও বড় হয়নি তবে বড় হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছে। সামনে তার ভবিষ্যৎ গড়ার সময়।

ছবি : সায়িদ মাহদিন আকরাম

মডেল : অহনা, রুমা ও মাহদিন

প্রকাশিত : ২৬ জানুয়ারী ২০১৫

২৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: