কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কৃষকের আত্মহত্যা বেড়েই চলেছে ভারতে

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০১৫
  • শংকর লাল দাশ

জনসংখ্যায় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র ভারত আজও কৃষিভিত্তিক দেশ। গত কয়েক দশকে দেশটি যথেষ্ট শিল্পমুখী হলেও জনসংখ্যার বৃহত্তর অংশ এখনও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িত। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পেশা কৃষি হলেও নানা কারণে এ খাতের আশাব্যঞ্জক বিকাশ ঘটছে না। বরং গত কয়েক বছরে কৃষি প্রবৃদ্ধির হার বেশ হ্রাস পেয়েছে। কৃষিপণ্য উৎপাদনে চাষীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। এর প্রধান কারণ হিসেবে খুব সহজে সরকারী কৃষিঋণ না পাওয়া, ঋণের জন্য মহাজনদের দ্বারস্থ হওয়া, ঋণ ও সুদের চক্রে বাঁধাপড়া এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াকে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত কয়েক বছরে কৃষি খাতের অবস্থা এতটাই করুণ হয়ে পড়েছে যে, দেশটিতে কৃষকের আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়েই চলছে। দেনা বা ঋণের ভারে জর্জরিত কৃষক আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। ভারতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এই কৃষকদের ক্রমবর্ধমান আত্মহননের ঘটনায় অর্থনীতিবিদ, গবেষক, বিশ্লেষক থেকে শুরু করে কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।

ভারতে সম্প্রতি বছরগুলোতে আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ার কারণে খোদ জাতিসংঘ পর্যন্ত উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ ভারতকে ‘সুইসাইড ক্যাপিটাল’ বা আত্মহত্যার আধার হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিশ্বের যেসব দেশে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত তার প্রথম সারিতে। এরমধ্যেআত্মহননকারী কৃষকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো’ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ রিপোর্টেও এর প্রমাণ মিলেছে। ওই রিপোর্টে পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ভারতে প্রতি বছর মোট আত্মহননের সব থেকে বেশি সংখ্যক মানুষ কৃষির সঙ্গে জড়িত বা কৃষক। শতকরা হিসাবে যা ১১ দশমিক ৯ শতাংশ।

১৯৯৫ সাল থেকে ২০১৪ পর্যন্ত সময়ে ভারতে ২ লাখ ৯৬ হাজার ৪৩৮ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। সাম্প্রতিক বছরভিত্তিক পরিসংখ্যান গণনা করলেও আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান ভয়াবহতাকেই সমর্থন করে। যেমন ২০০৮ সালে ভারতে মোট ১৬ হাজার ১৯৬ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছে। ২০০৯ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩৬৮ জনে। ২০১০ সালে এ সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৯৬৪ জনে। ২০১১ সালে আবার আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে ১৯ হাজার ২২৯ জনে পৌঁছায়। ২০১২ সালে কিছুটা কমলেও তা ২০১০ সালের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ ওই বছর মোট আত্মহত্যাকারী কৃষকের সংখ্যা ১৮ হাজার ৮০২ জন। ২০১৩ সালের অবস্থাও অনেকটা অনুরূপ। ওই বছর মোট ১৬ হাজার ৪৬ জন কৃষক আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে আরও দেখা গেছে, ভারতে ‘ধনী রাজ্য’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া মহারাষ্ট্রে কৃষক আত্মহত্যার সংখ্যা সব থেকে বেশি। ১৯৯৫ সাল থেকে মহারাষ্ট্রে ৬০ হাজার ৭৫০ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ গত ১০ বছরে প্রতিদিন আত্মহত্যা করেছেন ১০ জনেরও বেশি কৃষক। এরপরেই রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ। সেখানে ২০১১ সালে ২ হাজার ২০৬ জন, ২০১২ সালে ২ হাজার ৫৭২ জন এবং ২০১৩ সালে ২ হাজার ১৪ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। গত পাঁচ বছর ধরে আত্মহত্যার শীর্ষে থাকা অপর তিনটি রাজ্য হলোÑ যথাক্রমে কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ ও কেরল।

কৃষক আত্মহননের প্রধান প্রধান কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভারতে বেশির ভাগ কৃষক এখনও কৃষিঋণের জন্য মহাজনদের দ্বারস্থ হচ্ছে। ব্যাংক থেকে ঋণের জন্য যেখানে সুদের হার সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। সেখানে মহাজনরা নিচ্ছে ৬০ শতাংশ। কৃষকের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সুবিধা না পৌঁছানোয় একবার কোন কৃষক মহাজনের খপ্পরে পড়লে সে কখনই ঋণ বা সুদের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। বছরের পর বছর এমনকি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ঋণ-সুদের ঘানি টেনে যেতেই হয়। যেখানে ব্যাংক পৌঁছিয়েছে, সেখানেও খুব সহজে কৃষক প্রয়োজনীয় এবং পর্যাপ্ত ঋণ পাচ্ছে না। রয়েছে দালাল-ফড়িয়াদের উৎপাত। উৎপাদন খরচের তুলনায় কৃষক পাচ্ছেন না ফসলের ন্যায্য মূল্য। সরকারী ভর্তুকির পরিমাণও সন্তোষজনক নয়। এর ওপরে রয়েছে খরা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টিসহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এসব কারণে কৃষক চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ভারত এখনও ‘কৃষিভিত্তিক’ দেশের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এখনও মোট জনসংখ্যার বড় অংশ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। সেখানে কৃষক আত্মহননের ঘটনায় সবার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়বে, এটিই স্বাভাবিক। কেন্দ্রীয় সরকার যেমন এসবের প্রতিকার হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে, তেমনি রাজ্য সরকারগুলোও নিচ্ছে নানা ‘জনমুখী’ কর্মসূচী। এমনকি কোন কোন রাজ্য সরকার কৃষিঋণ মওকুফের কর্মসূচীও বাস্তবায়ন করছে। এরপরেও আত্মহত্যা কমছে না, এটিই হচ্ছে বাস্তবতা।

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০১৫

২৫/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: