কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

উদ্যোক্তারা ঝুঁকছেন বিদেশী ঋণের দিকে

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০১৫
  • এমএ খালেক

অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন উদ্বৃত্ত পুঁজি অধিক মুনাফা এবং স্বল্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের দিকে ধাবিত হবে, এটাই স্বাভাবিক প্রবণতা। এর ব্যত্যয় ঘটলেই তা অস্বাভাবিক। বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের বেশি মাত্রায় বিদেশী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ প্রক্রিয়াকে তাঁরা পুঁজি প্রবাহের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখাতে চাচ্ছেন। অর্থাৎ তাঁরা প্রকারান্তরে এটাই বলতে চাচ্ছেন যে, বাংলাদেশ যেহেতু পুঁজি বিনিয়োগের একটি লাভজনক এবং নিরাপদ গন্তব্য, তাই বিদেশী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখানে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করছে। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বিদেশী সূত্র থেকে ঋণ আহরণের পরিমাণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিগত পাঁচ বছরে স্থানীয় দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫৫৪ কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ ৪৪ হাজার ২১২ কোটি টাকা বিদেশী ঋণ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এটা ঠিক যে, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অনেকেই ক্রমবর্ধমানহারে বিদেশী ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এটা উদ্বেগজনক নাকি স্বস্তিদায়ক তা নিয়ে যে কেউ প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেন। কারণ আমাদের দেশের ব্যাংকগুলো বর্তমানে বিনিয়োগযোগ্য বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত তারল্য নিয়ে অপেক্ষা করছে। সেই অবস্থায় উদ্যোক্তাদের বিদেশমুখী হওয়াটা কোনভাবেই শুভ লক্ষণ বলে মনে করার কারণ নেই। কিন্তু তারপরও বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট হাউসগুলো বিদেশ থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে।

উদ্বৃত্ত পুঁজি অধিক মুনাফা এবং স্বল্প ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার দিকে ধাবিত হবে এটা সব সময় নাও হতে পারে। বাংলাদেশ স্থানীয় এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত লাভজনক একটি গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হবার দাবি রাখে। কারণ এখানে রয়েছে ১৬ কোটি মানুষের বিশাল বাজার। রয়েছে সস্তা শ্রমশক্তির নিশ্চিত যোগান। মানুষের ভোগ ব্যয় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেকটাই বেড়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সরকার স্থানীয় এবং বিদেশী বিনিয়োগ, বিশেষ করে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগকে নানাভাবে উৎসাহিত করছেন। তাদের বিনিয়োজিত পুঁজির পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করছেন। এমন অবস্থায় বিদেশী উদ্যোক্তা-বিনিয়োগকারীদের তো উদ্বৃত্ত পুঁজির পসরা নিয়ে আমাদের দেশে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা ছিল। কিন্তু কার্যত আমরা সে অবস্থা প্রত্যক্ষ করছি না।

বর্তমানে বিদেশী সূত্র থেকে স্থানীয় উদ্যোক্তারা যে ঋণ গ্রহণ করছেন তার পেছনে নানা কারণ কাজ করছে। বিদেশী ব্যাংকগুলো অত্যন্ত স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করছে। তারা উন্নত এবং অনুন্নত দেশের ক্ষেত্রে প্রায় একই রকম হারে সুদ নির্ধারণ করে থাকে। এই সুদের হার বার্ষিক ৪ থেকে ৫ শতাংশ। সেখানে বাংলাদেশে ব্যবসায়রত ব্যাংকগুলো গড়ে ১৫/১৬ শতাংশ হারে সুদারোপ করছে। এটা দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিদেশী সূত্র থেকে ঋণগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করছে। এ ছাড়া কোন একজন উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করতে গেলে তাঁকে যেভাবে হয়রানি করা হয় ,তাতে ঋণ গ্রহণের ইচ্ছে নষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে একটি শিল্প কারখানা স্থাপন করেছেন অথচ কোন পর্যায়েই অবৈধ অর্থ ব্যয় করতে হয়নিÑ এমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। যেসব উদ্যোক্তা অবৈধ অর্থ ব্যয় করতে চান না তাঁদের পদে পদে হয়রানি করা হয়। আমাদের দেশের উদ্যোক্তারা অত্যন্ত সৃজনশীল এবং উদ্ভাবনী শক্তির অধিকারী। তাঁরা সুযোগ পেলে অনেক কিছুই করতে পারেন। যেহেতু স্থানীয় ব্যাংকিং সেক্টর থেকে ঋণ পাবার ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাই তারা তুলনামূলক কম সুদে বিদেশী ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। স্থানীয় ব্যাংকগুলো যদি হয়রানিমুক্তভাবে ঋণ প্রদান করত তাহলে উচ্চ সুদ দিয়েও ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও উদ্যোক্তাদের কোন আপত্তি থাকত না।

কিন্তু বিদেশী সূত্রগুলো কেন এদেশের উদ্যোক্তাদের ঋণ দিচ্ছে সেটাও বিবেচ্য। উন্নত দেশে বিনিয়োগ বা ঋণ প্রদান করা হলে তা অধিকতর নিরাপদ থাকে। সেখানে পুঁজি হারানোর কোন ভয় থাকে না। কিন্তু আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশের উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান করা হলে, তাতে কিছু না কিছু ঝুঁকি থেকেই যায়। যেহেতু সুদের হার উন্নত-অনুন্নত দেশ নির্বিশেষে প্রায় একই রকম এবং উন্নত দেশে ঋণের ঝুঁকি কম তাই বিদেশী ব্যাংকগুলোর তো উন্নত দেশের উদ্যোক্তাদেরই ঋণ দেবার কথা। তারা আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের ঋণ দিচ্ছে কেন? স্থানীয় কর্পোরেট হাউসগুলো বিদেশী ঋণের ক্ষেত্রে এক ধরনের উপযোগিতা সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছেন। এই উপযোগিতার কারণেই বিদেশী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ঋণ দিচ্ছে।

ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য এবং ট্রাক রেকর্ড বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। আমরা যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখব, কোন সাধারণ উদ্যোক্তা, জাতীয় পর্যায়ে যাঁর তেমন কোন গ্রহণযোগ্যতা নেই, তাঁরা কিন্তু বিদেশ থেকে ইচ্ছে করলেই ঋণ আনতে পারছেন না। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিদেশী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের কোন ধরনের গ্যারান্টির প্রয়োজন পড়ছে না। অর্থাৎ ব্যাংক-গ্রাহক দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্কের ভিত্তিতেই ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। তবে বিদেশী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের পূর্বে যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্ব অনুমোদন গ্রহণ করতে হয় তাই তাঁরা যদি পরবর্তীতে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সেখানে কিছুটা দায়বদ্ধতা থাকে বৈকি। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছে করলেই ঢালাওভাবে বিদেশী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের অনুমতি প্রদান করতে পারে না। কারণ পরবর্তীতে তাঁরা যখন ঋণের কিস্তি পরিশোধ করবেন তা করতে হবে বৈদেশিক মুদ্রায়, বিশেষ করে মার্কিন ডলারে। এতে আমাদের রিজার্ভের ওপর চাপ পড়তে পারে। বর্তমানে উচ্চ মাত্রায় রিজার্ভ সংরক্ষিত থাকায় হয়ত বিষয়টি সেভাবে অনুভূত হবে না, কিন্তু আগামীতে স্থানীয়ভাবে আমদানি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে রিজার্ভ কমে যেতে খুব একটা বেশি সময় লাগবে না। এ ছাড়া যাঁরা বিদেশী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করবেন তাঁরা যদি নির্ধারিত সময়ে কিস্তি পরিশোধ করতে না পারেন সেটা দেশের ইমেজের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।

দৃশ্যত কয়েকটি বিশেষ কারণে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিদেশী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণের অনুমতি প্রদান করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় স্থানীয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া মুনাফা অর্জনের প্রবণতায় আঘাত হানা। স্থানীয় ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো এক ধরনের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঋণের সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা ইচ্ছে করেই সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে না।

বিদেশী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু অনিয়মের অভিযোগ ইতোমধ্যেই উত্থাপিত হতে শুরু করেছে। কিছু দিন আগে এ মর্মে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল যে, বিদেশী সূত্র থেকে এক উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রহণ করে কোন কোন উদ্যোক্তা তা অন্য খাতে প্রবাহিত করছেন। কেউ যাতে এক উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রহণ করে তা অন্য কোন খাতে ব্যবহার করতে না পারেন তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি বাড়ানো উচিত।

চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে এক বছরের মধ্যে কম করে হলেও ৭০ হাজার কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। বিনিয়োগের হার জিডিপির অন্তত ২৯ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। বর্তমানে বিনিয়োগের পরিমাণ জিডিপির ২৫ শতাংশের মতো। এটাও বাস্তব বিনিয়োগ কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিদেশে সূত্র থেকে ঋণ গ্রহণের যে সুযোগ দেয়া হচ্ছে, সেটা অবশ্যই ভাল। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা করা না গেলে, তা আমাদের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া বিদেশী ঋণ গ্রহণ এবং পরিশোধ পর্যায়ে কোনভাবেই যাতে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার হতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু বিদেশী ঋণ গ্রহণ এবং পরিশোধ উভয় প্রক্রিয়ার সঙ্গেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যুক্ত থাকবে, তাই এ ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। এখন আমাদের রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ আছে, কিন্তু এই রিজার্ভ কোনভাবেই স্থায়ী নয়। যে কোন সময় রিজার্ভ কমে যেতে পারে। তাই আমাদের দেখে শুনে পথ চলতে হবে।

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০১৫

২৫/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: