কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সমাবর্তনে প্রাণের মিলনমেলা

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০১৫
  • রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

জাকির হোসেন তমাল

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবনের ইতি টেনে অনেক আগেই কর্মজীবনে প্রবেশ করেছিলেন তাঁরা। প্রিয় ক্যাম্পাস ছেড়ে থাকতে হয়ত অনেকের মনে চিড় ধরেছে। বার বার মন টানছিল ক্যাম্পাসে। কর্মজীবনের টানে অনেক বন্ধু, ছোট ভাইকে ছাড়তে হয়েছিল কয়েক বছর আগে। প্রাণের সেই ক্যাম্পাস, সেই চিরচেনা মুখগুলোর দেখা যদি আবারও হয় তাহলে আনন্দের যেন কমতি থাকে না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের জন্য ১৮ জানুয়ারি ছিল তেমনি একটি দিন।

দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতাকে পেছনে ফেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবম সমাবর্তনে জমা হয়েছিলেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী। কর্মজীবনের টানে হারিয়ে ফেলা প্রিয় ক্যাম্পাসে এসে আবারও আড্ডায় মেতে উঠেছেন সমাবর্তনের গ্র্যাজুয়েটরা। তাঁদের পদচারণায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয় মিলনমেলায়।

১৮ জানুয়ারি দুপুর বেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেডিয়ামে ডিগ্রী প্রদানের মাধ্যমে শেষ হয় নবম সমাবর্তন। সমাবর্তনে সভাপতিত্ব করেন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদ। এতে সমাবর্তন বক্তা ছিলেন দিল্লীর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. তালাত আহমদ। এবারের সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ৯টি অনুষদ ও ৫টি ইনস্টিটিউট থেকে পিএইচডি, এমফিল, স্নাতকোত্তর এবং এমবিবিএস, বিডিএস ও ডিভিএম ডিগ্রী অর্জনকারী ৪ হাজার ৭৭১ জন গ্র্যাজুয়েটকে সনদ দেয়া হয়।

সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মিলনমেলাকে আরও আনন্দ ও উপভোগ্য করে তুলেছিল ক্যাম্পাসের বিভিন্ন রাস্তায় রংতুলিতে আল্পনা আকার মাধ্যমে। গ্র্যাজুয়েটদের আগমনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসের মোড়ে মোড়ে স্থাপন করা হয়েছিল সমাবর্তনের রং-বেরঙের বিলবোর্ড। ক্যাম্পাসজুড়ে করা হয়েছে সৌন্দর্যবর্ধন।

সমাবর্তনের অনুষ্ঠানস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেডিয়ামের ভেতরে পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে। স্টেডিয়ামের ভেতরের গ্যালারিতে চুনকাম, গ্যালারির সব দিকে বিভিন্নভাবে সাজানো হয়েছিল। স্টেডিয়ামের ভেতরে পূর্বপার্শ্বে তৈরি করা হয়েছিল মঞ্চ। ক্যাম্পাসের বাইরের বিভিন্ন সড়ক ও এর আশপাশের স্থাপনা রূপ নিয়েছিল ভিন্ন সৌন্দর্যে।

গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি

সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ। এখানে যে জ্ঞানচর্চা হয় তা প্রবহমান। জ্ঞানের তরঙ্গস্রোতে ক্রমবিকশিত মানব জীবনের অনুসৃত ধারাই বিশ্ববিদ্যালয় বহন করে। শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তির, অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধ, সর্বোপরি গভীর দেশপ্রেম জাগ্রত করার একমাত্র উপায় হচ্ছে মানসম্মত শিক্ষা।’

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আজ আমরা একবিংশ শতাব্দীর নাগরিক। তথ্য-প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান বিকাশ এ শতাব্দী আমাদের সামনে যেমন অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে তেমনি ছুড়ে দিয়েছে চ্যালেঞ্জও। ‘সম্ভাবনা’ ও ‘চ্যালেঞ্জ’কে সামনে রেখে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানে আন্তর্জাতিকমানে গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে পারে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আবদুল হামিদ রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তোমরা আজ গ্র্যাজুয়েট, দেশের উচ্চতর মানবসম্পদ। আজকের এই সমাবর্তন একদিকে যেমন তোমাদের অর্জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, তেমনি দায়িত্বও অর্পণ করছে। সে দায়িত্ব নিজের পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি, সর্বোপরি দেশ ও জাতির প্রতি।’

তিনি আরও বলেন, ‘নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাথাপিছু আয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, তথ্য প্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তাই সামগ্রিক আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে উত্তরণের সৃষ্টি হয়েছে তা এগিয়ে নিতে ছাত্র সমাজকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে ষাটের দশকে যে ছাত্র আন্দোলন ছিল তা স্বাধীনতা অর্জনের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে স্বাধীকার আন্দোলন। তা আমরা অর্জন করেছি। আজকের আন্দোলন দেশ গড়ার।’

গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে সমাবর্তন বক্তা

সমাবর্তন বক্তা হিসেবে দিল্লীর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার উপাচার্য অধ্যাপক তালাত আহমেদ ইংরেজিতে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্য সবকিছুর চেয়ে শিক্ষার্থীরাই প্রধান। বড় বড় দালান-কোঠার চেয়ে শিক্ষার্থীদের উৎকর্ষতার মাধ্যমেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচিত হয়। তাই তোমাদের যে পরিবেশ শিক্ষা দেয়া হয়েছে পেশাগত একাগ্রতা, দক্ষতা ও ব্যক্তিগত শক্তিমত্তার মাধ্যমেই তার সীমা অতিক্রম করতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে সুপ্ত সম্ভাবনা রয়েছে তা অনুধাবন করার চেষ্টা করতে হবে। মনে রাখতে হবে নিজেদের, পিতামাতা, প্রতিষ্ঠান ও বৃহত্তর সমাজের প্রতি তোমাদের দায়বদ্ধতা রয়েছে।’

এ সময় নারী গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বাংলাদেশ নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এ সময় নারী গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমাদের সংগ্রাম ও কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং লক্ষচ্যুত হওয়া যাবে না। তোমাদের চলার পথে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে কিন্তু তোমরা যদি দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ থাকো তাহলে লক্ষ্যের শেষ সীমায় উজ্বল নক্ষত্র হতে পারবে।

গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে উপাচার্য

স্বাগত বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের প্রাণপ্রিয় শিক্ষাঙ্গন। এ শিক্ষাঙ্গনকে আমরা সবকিছুর উর্ধে রাখতে চাই। সাম্প্রতিক সময়ের শিক্ষক হত্যার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা এ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারকে ক্ষুব্ধ ও উদ্বিগ্ন করেছে তার যৌক্তিক নিরসন প্রয়োজন। আমরা এমনটা আর দেখতে চাই না। সমাজের সর্বস্তরের মতো বিশ্ববিদ্যালয়েও ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রত্যয়টি দলমতের উর্ধে রাখতে হবে।

গ্র্যাজুয়েটদের আনন্দ-বেদনা

২০- দলীয় জোটের টানা অবরোধেও ক্যাম্পাসে আসা ঠেকাতে পারেনি গ্র্যাজুয়েটদের। হাসি আনন্দে মাতিয়ে তুলেছিলেন প্রিয় ক্যাম্পাসকে। একজন ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে গেলেও অনেকেই সঙ্গে এনেছিলেন দুই থেকে তিনজন।

সমাবর্তনে ক্যাম্পাসে আসার আনন্দ বলতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী বোখারী আজাদ বলেন, ২০১২ সালে প্রিয় ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছিল কর্মজীবনের টানে। সেখানে গিয়ে অনেক মিস করতাম প্রিয় ক্যাম্পাস, সময়ের আবর্তে হারিয়ে যাওয়া চিরচেনা মুখগুলোকে। কিন্তু সমাবর্তন আবারও এনে দিয়েছিল সেই মধুক্ষণ। বন্ধুদের কাছে পেয়ে আবারও সেই আনন্দ শুরু করে দিয়েছিলাম।

ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আরিফ হোসেন বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রাজশাহী থেকে দূরে অবস্থান করা আমার অনেক বন্ধু নিবন্ধন করেও সমাবর্তনে উপস্থিত হতে পারেনি। তাদের জন্য খারাপ লাগছে।

সমাবর্তনে এসেও নেয়া হয়নি সনদপত্র

মূল সনদপত্র নেয়া, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা এবং প্রিয় ক্যাম্পাসের টানে দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় অনেকটা ভোগান্তি পাড়ি দিয়ে সমাবর্তনে জড়ো হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু অনেকেই সমাবর্তনে এসে সনদপত্র নিয়ে আবারও ক্যাম্পাস ত্যাগ করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স এ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ৫০ জন প্রাক্তন শিক্ষার্থীর সনদপত্র নেয়া হয়নি। বিভাগ থেকে তাঁদের সনদপত্র দেয়া হলেও বিভিন্ন ভুল থাকায় তা আবারও ফেরত দিয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে হয়েছে।

সমাবর্তনের গ্র্যাজুয়েট ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স এ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মুহম্মদ সুজন অভিযোগ করে বলেন, আমি মাস্টার্সে ২০০৭ সালে ¯œাতক পাস করেছি। তখন আমার রেজাল্ট ছিল সিজিপিএ ২.৩৩। কিন্তু সমাবর্তনে এসে আমাকে দেয়া মূল সনদপত্রে দেয়া হয়েছে সিজিপিএ ৩.৩৩। তাই সনদপত্র নেয়া হয়নি।

সমাবর্তনের গ্র্যাজুয়েট ও একই বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম বলেন, ২০০৭ সালে স্নাতক পরীক্ষায় আমি সিজিপিএ ৩.০০ পেলেও সমাবর্তনে দেয়া সনদপত্রে আমাকে সিজিপিএ ৩.৯ রয়েছে। এই বিষয়টি সংশোধন করতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সমাবর্তনে যোগ দিয়েছিলেন ফাইন্যান্স এ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম। তিনি ২০০৭ সালের ব্যাচ। কিন্তু বহু প্রত্যাশিত সনদপত্র তিনি পাননি। কারণ হিসেবে তিনি জানান, আমাদের সনদপত্র সরবরাহ করা হলেও তাতে ভুল থাকায় তা ফেরত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এ কারণে সনদপত্র ছাড়াই আমাদের ফিরতে হচ্ছে। একই ধরনের বক্তব্য অন্য সাবেক শিক্ষার্থীদেরও।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন ও ফাইন্যান্স এ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আমজাদ হোসেন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক থেকে বিভাগে সরবরাহকৃত একাধিক সনদপত্রে অনাকাক্সিক্ষতভাবে প্রচুর ভুল হয়েছে। তাই ভুল সনদপত্র সমাবর্তনের গ্র্যাজুয়েটদের না নিয়ে তা সংশোধন করার জন্য রেখে দিয়েছি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, এবারই প্রথম কম্পিউটারের মাধ্যমে সনদপত্র তৈরি করা হয়েছে। তাই দ্রুততার সঙ্গে করতে গিয়ে হয়ত অনাকাক্সিক্ষত কোন ভুল হয়ে গেছে। আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগে তা সংশোধন করা যাবে। তিনি আরও বলেন, যেসব গ্র্যাজুয়েট সমাবর্তনে এসেও সনদপত্র না নিয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন সংশোধন করে সেই সনদপত্র তাদের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০১৫

২৫/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: