কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দুই নেত্রীর আলোচনা কতটুকু যুক্তিযুক্ত?

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০১৫
  • মুনতাসীর মামুন

(২৪ জানুয়ারির পর)

আর এই হচ্ছে ১৮ দলের প্রধান দুই দল বিএনপি-জামায়াতের প্রকৃতি। অবশ্য তাদের দোষ দেয়া যায় না। ঐতিহাসিকভাবে তারা ভায়োলেন্সে বিশ্বাসী। ১৯৭১ সালে জামায়াতের আলবদর রাজাকাররা কি করেছিল তা আমাদের জানা। জিয়াউর রহমান কর্তৃক পুনর্বাসিত হওয়ার পর জামায়াত বিরোধীদের ধরে হাত-পায়ের রগ কেটে দিত যাতে বিরোধী ব্যক্তি মারা যায় বা পঙ্গু হয়ে যায়। রগকাটা রাজনীতি নামে তাদের এটি পরিচিত হয়ে ওঠে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় থাকার জন্য কমপক্ষে ‘এক হাজার সেনা ও সেনা কর্মকর্তাকে খুন’ করেছিলেন ‘দ-’ দিয়ে। বিএনপি-জামায়াত যখন ক্ষমতায় আসে তখন এক গ্রেনেড হামলায়ই মেরে ফেলেছিল প্রায় ৩০ জন। পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল তার চেয়েও বেশি। ক্ষমতায় আসার পর পর তারা যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষজন আর সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করেছিল তা নজিরবিহীন। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর এবং কিছুদিন আগে থেকেই মন্দির পোড়ানো, সংখ্যালঘুদের প্রাণ ও সম্পত্তিনাশ চলছিল। ক্ষমতায় থাকতে ১০ জন হিন্দুকে পুড়িয়ে মেরেছিল বিএনপি-জামায়াত। নির্বাচনের দিন এবং পরে যে এমনটি ঘটবে তাও সবার অজানা ছিল না। এছাড়া খালেদা জিয়া সেদিন তার ভাষায় ‘আন্দোলন’ ও আমাদের ভাষায় সন্ত্রাস চালাবার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই নির্দেশে চাঙ্গা হয়ে আবার সুনির্দিষ্টভাবে নৌকার সমর্থক ও হিন্দুদের ওপর আক্রমণ হয়েছে। এমনও শোনা গেছে, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে যারা ছিল তাদেরও কিছুটা খুশি করে গিয়েছিল হামলাকারীরা।

সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো- এরপর বিএনপির নেতৃবৃন্দ এর জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এ রকম শঠতা তারা না করলেই পারতেন। আবার মিডিয়া তখন এই ঘটনায় হামলে পড়েছে। দুঃখ ইত্যাদি প্রকাশ করেছে। কিন্তু মিডিয়ার একাংশের উস্কানি যে ছিল তা কি অস্বীকার করা যাবে? নির্বাচন যে-কোন মূল্যে স্থগিতের প্রচারণা তো তারাই বেশি করেছে। তবে, আমরা সৌভাগ্যবান বলতে হবে, মিডিয়ার একটি অংশ বিএনপি-জামায়াতের হঠকারিতাও তুলে ধরেছিল।

এই হচ্ছে বিএনপি-জামায়াতের প্রকৃতি, একেবারে শ্বাপদের মতো। ক্ষমতায় না যেয়ে তারা যা করেছে এবং করছে ক্ষমতায় গেলে তারা যে কী করবে তা ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। সাধারণ মানুষ যদি এখনও তাদের না চিনে থাকেন তাহলে কপালে আরও দুঃখ আছে। এই যে প্রায় ১৫০ জন মানুষ মারা গেলেন এরা সবাই দুঃখী-দরিদ্র সাধারণ মানুষ। কোন রাজনৈতিক নেতার ক্ষতি হয়নি।

এত যে স্কুল পোড়ানো হলো তাতে বিএনপি-জামায়াত নেতাদের কোন ছেলেমেয়ের ক্ষতি হয়নি। তাদের ছেলেমেয়েরা বাইরে পড়ে ও থাকে। যানবাহনের ক্ষতির কথা নাই বললাম।

গত দু’সপ্তাহে কি একই ধরনের ঘটনা ঘটেনি? শিশুরা মাত্র বই পেয়েছিল। সে বই পড়তেও পারেনি, অনেক আহত হয়েছে, অনেকের মৃত্যু হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি যদি মানুষের জন্য রাজনীতি করে তাহলে মানুষ পোড়াচ্ছে কেন? কোন সুশীল এ প্রশ্ন তুলেছেন? বরং সুশীলরা বলতে পারেন, বৃহত্তর স্বার্থের কারণে এ রকম ঘটনা ঘটতেই পারে। কিন্তু যাদের সব পুড়েছে তারা কি সবই আওয়ামী লীগ? নেতারা সরকারের প্রতিরোধের কারণে নিরাপদে জেল বেছে নিয়েছেন। পত্রিকায় দেখলাম, এক সন্ত্রাসী বলছে বড় মেঝ সেঝ কোন নেতা মাঠে নেই দেখে, সে ছোট এক নেতার নির্দেশে মানুষ পোড়াচ্ছে। এর জন্য সে টাকা পাচ্ছে এবং যুবদলের মাঝারি সাইজের একটি পদও পেতে পারে। বিএনপি কর্মীরা নেতাদের নির্দেশে বিশেষ করে মাদার অব গণতন্ত্র খালেদা জিয়া ও গুয়েভারা রিজভীর নির্দেশে এসব করছেন। যারা ধরা পড়ছেন, গ্রেফতার হচ্ছেন, কষ্ট করেছেন তারা কি কখনও ভেবে দেখেছেন তাদের আত্মত্যাগে খালেদা ও জামায়াত ক্ষমতায় আসবে। মাখন-রুটি খেয়ে তারাই পাজেরো চালাবেন। এসব কর্মীরা বা সন্ত্রাসীরা নেতার জনসভায় প্রথম সারিতেও তখন স্থান পাবেন না।

আওয়ামী লীগও অনেক মাখন খাওয়া, পাজেরো চড়াদের দিয়েছে, আত্মত্যাগীরা অনেক কিছুই পায়নি। তফাৎটা হলো তারা চায়ওনি। তৃণমূলের বড় অংশ আওয়ামী লীগে বা ১৪ দলের আদর্শে বিশ্বাস করে, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনা ভক্ত তারা। এবং শেখ হাসিনার যাতে কোনরকম ক্ষতি না হয় তাই তারা চান। এই তফাতের কারণে আওয়ামী লীগ সরকার ও দলীয় নেতারা অনেকাংশে জনবিচ্ছিন্ন হলেও আওয়ামী লীগের তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে বার বার এমনটা ঘটলে ক্ষতি হবে না কে বলবে?

এখনও দেখি খালেদার উপদেষ্টা সাংবাদিক শওকত মাহমুদ তারস্বরে বলছেন, সরকার এসব জ্বালাও পোড়াও করে বিএনপির ওপর দোষ চাপাচ্ছে। এসব মিথ্যাচারের কারণে, বিএনপি আরও গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। শোনা যায় [সত্য মিথ্যা জানি না] হান্নান শাহ্-এর ফোনকল অমিত শাহ্্র ফোনকল বলে চালানোর আর কংগ্রেসম্যানদের ভুয়া বিবৃতির কথা নাইবা তুললাম। এ রকম লিখিত অঙ্গীকার অস্বীকার বার বার মিথ্যাচার মানুষকে ক্লান্ত করে তুলছে।

৬.

বর্তমান যে পরিস্থিতি তাতে কোন আলোচনা হবে না, হলেও তা সঙ্কট সমাধান করতে পারবে না। এ সহজ সত্যটি আমাদের অনেকে, সুশীলরা ভুলে যান, হয়ত ইচ্ছে করেই। কারণ, আলোচনার প্রসঙ্গ জিইয়ে রাখলে বিএনপিকে প্রধান বিরোধী দল ও গণতন্ত্রমনা বলা যাবে। সুশীলদের অনেকে বলছেন জামায়াতের বিচার হচ্ছে চলুক, বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চলুক। সংলাপ সফল হলে বিএনপি জামায়াতকে ছাড়বে। যদি না ছাড়ে তাহলে তারাই ছাড়বেন বিএনপি। ভণ্ডামি আর কাকে বলে! ছাড়তে যদি হয় এখন ছাড়লে ক্ষতি কি? রবীন্দ্রনাথ কি সাধে লিখেছেন- যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক আমি তোমায় ছাড়ব না। আমরা ভুলে যাই জামায়াতের স্পিরিট বিএনপির প্রাণশক্তি।

গত বছরগুলোর কথা ধরেন না কেন? খালেদার দৃষ্টিভঙ্গি ও শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গিই দেখুন না কেন? তাহলেই বোঝা যাবে কেন সংলাপ হবে না।

খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতি করেন বটে কিন্তু দেশটির প্রতি তার কোন ভালবাসা নেই। তিনি কিভাবে ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করেন? শেখ হাসিনা তাকে কাতরভাবে অনুরোধ করেছিলেন, আপনি অনুগ্রহ করে ১৫ আগস্ট জন্মদিন পালন করবেন না। আমার কষ্ট হয়। খালেদার উত্তর ছিল, ১৫ আগস্ট কি কারও জন্মদিন হতে পারে না? যৌক্তিক উত্তর। কিন্তু আমরা তো জানি ১৫ আগস্ট তার জন্মদিন নয়। এটি একটি অরুচিকর ব্যাপার যা তার ঘনিষ্ঠ মওদুদ আহমদও উল্লেখ করেছেন। শুধু অরুচিকর নয়, এটি এক ধরনের নিষ্ঠুরতা, প্রতারণা তো বটেই। জাতির জনককে হেয় করা সুস্থ মানসিকতার পরিচয় নয়।

কয়েকদিন আগেও তিনি বলেছেন, গোপালগঞ্জের নাম মুছে দেবেন। এটির উৎসও সেই বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যা তথা মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ব্যক্তিগত আক্রোশ। গোপালগঞ্জের নাম পাকিস্তানী হানাদাররাও বদলাতে পারেনি। তিনি কি করে পারবেন? শুনেছি, ফেসবুক ও অনলাইনে নাকি ‘বলাবলি’ হচ্ছে গোপালগঞ্জ নাম বদলে জানজুয়াগঞ্জ রেখে তিনি প্রতিশোধ নেবেন। এ কারণেই গোপালগঞ্জের বাসিন্দাদের বলেছেন গোপালী। হাসিনা ঠাট্টা করে অবশ্য বলেছেনÑ গোপালীরা কপালিও। বর্তমান অবস্থা অবশ্য সেটি প্রমাণ করে।

এই দৃষ্টিভঙ্গির একজন যখন কোন দলের নেতা হন তখন সেই দলের চরিত্র কেমন হতে পারে তা অনুমেয়।

ইদানীং অনেক সুশীল বলছেন, গত ২০১৩-১৪ সালে যা ঘটল তার জন্য দু’দলই দায়ী। কেন একদল নয়, দু’দল দায়ী তার ব্যাখ্যা তারা দেন না। সংবিধান অনুসারে চলা তা হলে অপরাধ? ভায়োলেন্সের চাপে পড়ে সংবিধান বদল করা তাহলে খুব ভাল? ভায়োলেন্সই যদি প্রধান আপত্তির বিষয় হয় তাহলে ভায়োলেন্স যারা করছে এবং যারা করছে না তাদের মধ্যে পার্থক্য থাকবে না? বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেফতার করা গণতন্ত্রবিরোধী, একমত। কিন্তু যারা ভায়োলেন্স প্রচার করছে তারা যদি তা না করে তাহলে গ্রেফতারের যুক্তি সরকারের থাকত না। সুশীলদের এই যুক্তি ঠিক হলে দলে দলে লোক আজ রাস্তায় নেমে বিরোধী দলের প্রতি আচরণের প্রতিবাদ করতেন। পুলিশের বাধা মানতেন না। জেলের ভয়ও করতেন না।

এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেছেন, বিএনপিকে জামায়াত ছেড়ে আসতে, তাহলে আলোচনার পথ সুগম হবে। তাঁর সঙ্গে আমি দ্বিমত পোষণ করি। এ যুক্তি আওয়ামী লীগের টিপিক্যাল যুক্তি। সে বিষয়ে পরে আসছি। উত্তরে খালেদা জিয়া বলেছেন, তিনি কাকে সঙ্গে রাখবেন কি রাখবেন না এটি তার ব্যাপার। আমি মনে করি তার উত্তরটি ঠিক।

আজকাল অনেকেই যারা মুক্তিযুদ্ধপন্থী তারা বলেন, বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে আগে জামায়াতকে সাইজ করা উচিত, তাহলে তারা পথে আসবে। শেখ হাসিনা, অনেক বামপন্থী নেতা, এমনকি শুনেছি নিরাপত্তা সংস্থার মানুষজনও এতে বিশ্বাস করেন।

(চলবে)

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী ২০১৫

২৫/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: