রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আদিবাসীদের বৈচিত্র্যময় জীবনধারা দেখতে হলে আসুন দুর্গাপুর

প্রকাশিত : ২৪ জানুয়ারী ২০১৫
  • সেই কবে থেকে এখানে আকাশ-মাটির সঙ্গে মিতালী

সঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে ॥ সুসং দুর্গাপুর। আঁকাবাঁকা পথ, সবুজ পাহাড়, টিলা আর নদী-ছড়াবেষ্টিত এ প্রাচুর্যময় জনপদ। ভারত সীমান্তের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নেত্রকোনার রত্নগর্ভা উপজেলা এটি। মেঘালয় রাজ্যের পাদদেশে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যম-িত এ জনপদকে ঘিরে রয়েছে পর্যটন শিল্পের উজ্জ্বল সম্ভাবনা। কিন্তু উন্নত যোগযোগ ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বিরাট এ সম্ভাবনাটি তেমন কাজে লাগছে না। উপরন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য অবলোকন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ-বিদেশের ভ্রমণপিপাসুরা। সরকারও হারাচ্ছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

নেত্রকোনা শহর থেকে মাত্র দু’ঘণ্টার পথ পেরোলেই দুর্গাপুর। গারো, হাজং, কোচ, বানাই ও অন্যান্য আদিবাসী অধ্যুষিত পাহাড়ী জনপদ। একটু দূর থেকে দেখলে মনে হয়- এক খ- ঘন কালো মেঘ যেন সেই কবে থেকে আকাশ-মাটির সঙ্গে মিতালী করে আছে। বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বিরামহীন সংগ্রাম চলছে এখানে।

কথিত আছে, গহীন জঙ্গল আর জীব-জানোয়ারদের সঙ্গে মিতালী করে একসময় গারো আদিবাসীরা বসবাস শুরু করেছিল বলেই এর নাম হয় গারো পাহাড়। ‘সোমেশ্বর পাঠক’ নামে এক ধর্মযাজক প্রথম দুর্গাপুরে সুসং রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর বংশ পরম্পরায় রাজত্ব করেন আরও অনেকে। গারো বিদ্রোহ, হাজং বিদ্রোহ, টঙ্ক আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন ও হাতিখেদা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বহু বিপ্লব-বিদ্রোহের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে এককালের এই সুসং পরগণা।

দুর্গাপুরের সৌন্দর্য শুধু পাহাড়েই সীমাবদ্ধ নয়। ঘন সবুজ পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে আছে সাদা, লাল ও বেগুনী রং-এর চিনামাটি (সাদামাটি)। বিজয়পুরের এ খনিজসম্পদ দেশের সিরামিক শিল্পে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশাল এলাকাজুড়ে এই চিনামাটি আহরণের প্রক্রিয়াও মনোমুগ্ধকর, কাছে গেলে দর্শনার্থীরা চোখ এড়াতে পারেন না। এছাড়া পাহাড় থেকে নেমে আসা সোমেশ্বরী নদীও এক বিচিত্র ঝর্ণাধারা। পাহাড়-নদীর অপরূপ মেলবন্ধন সেখানে। বর্ষায় এ নদী রাক্ষুসী রূপ নেয়। ভাসিয়ে দেয় বিস্তীর্ণ জনপদ-ফসল। শুকনো মৌসুমে নদীর বুকজুড়ে থাকে কয়লা ও বিশাল বালিরাশি। সিলিকা নামের এই বালিও নির্মাণ শিল্পে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সোমেশ্বরীর দিগন্তজোড়া বালিরাশি দেখেও মনে হয়Ñ এ যেন সমুদ্র সৈকত।

ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির নানা উপাদান ছড়িয়ে আছে দুর্গাপুরে। সুসং রাজবাড়ি, কমরেড মণি সিংহের বাড়ি, টঙ্ক আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত টঙ্ক স্মৃতিসৌধ, বহেরাতলি গ্রামের রাশিমণি স্মৃতিসৌধ, কমল রানীর দীঘি, রানীখং মিশনসহ অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শনের সমাহার এই জনপদ। এখানকার ক্ষুদ্র ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতিÑ যা পরিচয় করিয়ে দেয় ব্যতিক্রম জীবনধারার সঙ্গে। তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও চর্চার কেন্দ্র হিসেবে দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে রয়েছে সুদৃশ্য কালচারাল একাডেমি। এ ছাড়াও আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে রয়েছে- কারুকার্যম-িত ধর্মীয় মন্দির, গীর্জা ও উপাসনালয়। বিজয়পুর সীমান্তে গড়ে উঠেছে ভারত-বাংলাদেশের যৌথ স্থল শুল্ক বন্দর। ভারতের কিছু এলাকারও দেখা মিলবে দুর্গাপুর ওই সীমান্তে দাঁড়ালে।

দুর্গাপুরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য সারাবছরই দর্শনার্থীদের হৃদয় কাড়ে। তবে পিকনিকের স্পট হিসেবে শীত মৌসুমে সেখানে ভ্রমণবিলাসীদের ভিড় উপচে পড়ে। শীত এলেই পাহাড় কন্যা দুর্গাপুর খুঁজে পায় পুরনো অতিথিদের সঙ্গে নতুন নতুন মুখ। অনেক বিখ্যাত পর্যটকরাও উপভোগ করে গেছেন দুর্গাপুরের সৌন্দর্য। দৃশ্যবন্দী করেছেন দেশ-বিদেশের চিত্র নির্মাতারা। একটু কাছে গেলেই এর প্রকৃতি হাতছানি দিয়ে ডাকে আগন্তুকদের। ভাবিয়ে তোলে ভ্রমণবিলাসী, প্রকৃতিপ্রেমিক, কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের। কিন্তু বলাবাহুল্য, উন্নত যোগাযোগ আর সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে দুর্গাপুর এখনও এক উপেক্ষিত জনপদ।

প্রকাশিত : ২৪ জানুয়ারী ২০১৫

২৪/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: