কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রত্ন এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে ॥ বিনোদন ও অবকাশ কেন্দ্র

প্রকাশিত : ২৪ জানুয়ারী ২০১৫
  • মহাস্থানগড় ও জগদ্দল বিহারসহ দেশের ৭টি স্থান ওয়ার্ল্ডস হেরিটেজে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব

সমুদ্র হক, বগুড়া থেকে ॥ প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের সহযোগিতায় পর্যটন শিল্পকে সমৃদ্ধ করতে দেশের প্রাচীন ইতিহাসখ্যাত স্থানগুলোতে পর্যটন ও অবকাশ কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। এমন উদ্যোগ দেশে এই প্রথম। বগুড়ার মহাস্থানগড়সহ চারটি প্রতœতাত্ত্বিক স্থানে অবকাঠমো স্থাপনা কাজ শুরু হয়েছে। এতে সহযোগিতা দিচ্ছে সাউথ এশিয়া ট্যুরিজম ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট। প্রথম পর্যায়ে বগুড়ার মহাস্থানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির ও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ এলাকায় পর্যটকদের জন্য অবকাশ কেন্দ্র হোটেল বাংলো কটেজ রেস্তোরাঁ রাস্তাঘাটসহ প্রতœসম্পদ প্রদর্শনের নানা ব্যবস্থা থাকবে। এদিকে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানিয়েছেন, মহাস্থানগড়, জগদ্দল বিহারসহ দেশের ৭টি স্থানকে ইউনেস্কোর ওযার্ল্ড হেরিটেজে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে শীঘ্রই প্রস্তাবটি বিবেচনায় এনে স্থানগুলো বিশ্ব সম্পদের স্বীকৃতি পাবে। উল্লেখ্য, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সুন্দরবন, পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার ও বাগেররহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ বিশ্ব সম্পদের স্বীকৃতি পেয়েছে। প্র্রতœতাত্ত্বিক স্থানগুলোতে পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের প্রাথমিক উদ্যোগ নেয়া হয় দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের এক বৈঠকে। সেখানে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল, বাংলাদেশ ও নেপালের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন স্থাপত্য শিল্প, প্রতœতাত্ত্বিক স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প বিকাশে হেরিটেজ হাইওয়ে গড়ে তোলার প্রস্তাবনার পর তা সিদ্ধান্তে রূপান্তর হয়। মানুষে মানুষে মিলন বন্ধনের পর্যটন শিল্পের অগ্রযাত্রায় শরিক হয় প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর। প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে সাউথ এশিয়া ট্যুরিজম ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট। সূত্র জানায়, ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। উন্নয়ন ব্যাংক ১২ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে রাজি হয়েছে। বাকি ৩ মিলিয়ন ডলার দেবে সরকার। গেল বছর এপ্রিল মাসে এই কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বরেণ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর। এরই মধ্যে বগুড়ার মহাস্থানগড় ও নওগাঁর জগদ্দল বিহরের খনন কাজে নতুন প্রতœ ইতিহাস উদঘাটিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো, মহাস্থানগড়ে প্রায় হাজার বছর ধরে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা পরশুরাম প্যালেসের অস্তিত্ব। এই প্যালেসটি কোথায় ছিল এতকাল তা খোঁজা হয়েছে। প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন ভুক্তির রাজধানী পুন্ড্রনগর খ্যাত মহাস্থানগড়ে এর আগে ব্রাহ্মি হরফ ও এ্যাঙ্কর মিলেছে যা বানারসী বিলের সাক্ষ্য দেয়। মৌর্য সুঙ্গ গুপ্ত পাল সেন শশাঙ্ক মুসলিম মুঘল ব্রিটিশ সভ্যতার বহু চিহ্ন উঁকি দিয়ে আছে মহাস্থানগড়ে। এদিকে পাল সম্রাট রামপালের হারিয়ে যাওয়া সেই রামাবতী নগরী যে উত্তরাঞ্চলের নওগাঁর জগদ্দল বিহার, এমনটি মনে করছেন প্রতœতাত্ত্বিকগণ। যার অনুকূলে অনেক প্রমাণও মিলছে বর্তমানের খনন কাজে। সাধারণত প্রতœ খননে প্রাচীন অবকাঠামোর ছাদ খুঁজে পাওয়া যায় না। জগদ্দল বিহারে ছাদের অংশ বিশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। নিউলিথিক যুগের (ইতিহাস পূর্ব) চিহ্ন মিলেছে। বিহারে সাজানো পোড়ামাটির ফলক (টেরাকোটা)সহ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ৩৩টি কক্ষ আগেই পাওয়া গেছে। নওগাঁর জেলা প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর জগদ্দল বিহারে যাতায়াত ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে কাজ করে যাচ্ছে। পাহাড়পুর বিহার (সোমপুর বিহার নামেও পরিচিত) ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার। অষ্টম অথবা নবম শতকে পাল বংশের রাজা শ্রী ধর্মপাল দেব এই বিহার নির্মাণ করেন। ১০ হেক্টর ভূমির ওপর এই পুরাকীর্তি চতুর্ভুজ আকৃতির। পাহাড়পুর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পেয়েছে। দিনাজপুরের কান্তজীউ বা কান্তনগর মন্দির নবরতœ মন্দির নামেও পরিচিত। তিন তলা এই মন্দিরে ছিল নয়টি চূড়া। মহারাজা প্রাণনাথ রায় শেষ বয়সে মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তাঁর মৃত্যুর পর মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ সালে মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। ৫০ ফুট উচ্চতার বর্গাকার দৃষ্টিনন্দন এই মন্দিরে টেরাকোটা আছে প্রায় ২২ হাজার। বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদের স্থাপত্যশৈলী দেখে প্রতœতাত্ত্বিকগণ মনে করেন এটি খান-ই-জাহান আলী নির্মাণ করেন ১৫ শতকে। এতে তুঘলকি নির্মাণ শৈলী বোঝা যায়। ষাটগম্বুজ মসজিদকে ঘিরে ইউনেস্কো পুরো শহরকেই বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দিয়েছে। বগুড়ার মহাস্থানগড়ে গেল বছর সর্বশেষ খনন কাজে উত্তরে বৈরাগীর ভিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে জিয়ত কূপের অল্প দূরে একটি পাত কুয়া ও লম্বা দেয়ালের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, মৌর্য সুঙ্গ গুপ্ত পাল শশাঙ্ক সেন ডাইনাস্টির কোন এক সময়ে পানীয় জলের অভাবে পাত কুয়ার ব্যবহার শুরু হয়। মাটি খুঁড়ে প্রাচীন ইতিহাস উদ্ধারে মহাস্থানগড়ে বাংলাদেশ- ফ্রান্স যৌথ প্রতœতাত্ত্বি¡ক খনন কাজ শুরু হয় ১৯৯৩ সালে। ওই সময় থেকেই ফ্রান্সের পক্ষে প্রতœতাত্ত্বি¡ক জাঁ ফ্রাঁসোয়া সালের নেতৃত্বে ৩ থেকে ৫ সদস্যের টিম এবং বাংলাদেশের পক্ষে একই সংখ্যত প্রতœতাত্ত্বিক টিম যৌথভাবে খনন কাজ করছে। এবারও মাসব্যাপী খনন কাজে ফ্রান্সের পক্ষে ৫ সদস্যের টিমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফ্রাঁসোয়া সাল। খনন কাজের সংজ্ঞা অনুযায়ী নির্দিষ্ট জায়গায় জ্যামিতিক নকশায় সাবধানে মাটি খোঁড়া হয়। যাতে নিদর্শন ভেঙ্গে না যায়। এভাবেই এই এলাকায় চতুর্থ ও পঞ্চম শতকের মকরা, গুপ্ত সেন আমলের অবকাঠামো, পাথর খ-, মন্দির দুর্গ প্রাচীর, বৌদ্ধ মন্দিরের কাঠামো, বেলে পাথর, সূর্য মূর্তির টেরাকোটা, একটি এ্যাংকর, যা ধারণা দেয় বানারসী বিলের, ব্রাহ্মি হরফের শিলালিপি ইত্যাদি পাওয়া গেছে। যা উভয় দেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ইতিহাসের পাতা মেলে ধরা হচ্ছে। একজন ইতিহাসবিদ জানালেন মৌর্যদের আগে পুন্ড্রনগর সম্পর্কে নির্দিষ্টভাবে কেউ জানত না। খনন কাজে তার সবই বের হয়ে আসছে। প্রতœতাত্ত্বিকগণ আশা করছেন আড়াই হাজার বছর আগে এই অঞ্চলের মাটির নিচে দেবে যাওয়া সভ্যতার ক্রম বিকাশের অনেক কিছুই উদঘাটিত হবে ধারাবাহিক খনন কাজে। এই এলাকাগুলোতে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে দেশে দেশে মানুষে মানুষে মিলন বন্ধন তৈরি হয়ে বিশ্ব বন্ধুত্বের অপার দুয়ার খুলে যাবে।

প্রকাশিত : ২৪ জানুয়ারী ২০১৫

২৪/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: