কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ছুটির দিনে বাণিজ্য মেলায় মানুষের ঢল

প্রকাশিত : ২৪ জানুয়ারী ২০১৫
ছুটির দিনে বাণিজ্য মেলায় মানুষের ঢল
  • বিক্রেতারা খুশি

রহিম শেখ ॥ টানা অবরোধের মধ্যেই ছুটির দিনে লাখো জনতার ঢল নামে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায়। চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় থমকে থাকা মেলা শুক্রবার ছিল বেশ জমজমাট। দুপুরের পর থেকে আশপাশের সব সড়ক দিয়ে মিছিলের মতো মানুষ এসেছে মেলায়। বিকেল হতে না হতেই বাণিজ্যমেলা প্রাঙ্গণ এবং আশপাশের এলাকায় ছিল মানুষের উপচেপড়া ভিড়। সন্ধ্যার পর রংবেরঙের আলোর ঝলকানিতে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ভিড় যেন জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দীর্ঘ সময় লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকেট কাটতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। মেলায় আসা দর্শনার্থীদের বাড়তি চাপে সড়কগুলোতে ছিল যানবাহনের জটলা। দিনভর ক্রেতারা এক স্টল থেকে অন্য স্টলে খুঁজেছেন নিজেদের পছন্দসই পণ্য। ক্রেতার চাপে বিক্রি বাড়ায় বিক্রেতারাও খুশি। টানা অবরোধের মধ্যেই বাণিজ্যমেলায় রাজধানীর আশপাশের জেলাগুলো থেকেও ক্রেতারা এসেছেন।

শুক্রবার ছিল মেলার ২৩তম দিন। বিএনপি’র ডাকা টানা অবরোধের মধ্যেই সকাল থেকেই মেলা প্রাঙ্গণ মানুষের ভিড়ে কানায় কানায় পূর্ণ ছিল। বিকেল হতে না হতেই মেলার সামনের প্রাঙ্গণও পূর্ণ হয়ে যায়। শেষ বিকেলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে প্রবেশ টিকেট কাটতে হয়েছে ক্রেতা-দর্শনার্থীদের। এদিকে সকাল থেকেই প্রচুর লোক সমাগম হওয়ায় মেলার আশপাশের সড়কে দিনভর যানজট লেগে ছিল। দর্শকদের উপস্থিতির কারণে এসময় মিরপুর-ফার্মগেট সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। অনেকেই মিরপুর, ফার্মগেট থেকে হেঁটে মেলায় আসেন। আর এ সড়ক থেকে মেলার প্রধান ফটক পর্যন্ত ছিল মানুষের ঢল। আগারগাঁওয়ের আইডিবি ভবন থেকে মেলার প্রবেশপথ পর্যন্ত ছিল দীর্ঘ লাইন। অন্যদিকে গণপরিবহনে যাওয়া মানুষ মেলা প্রাঙ্গণের কাছাকাছি নেমে হেঁটে যেতে পারলেও বেশি ভোগান্তি হয়েছে নিজস্ব বাহনে করে আসা দর্শনার্থীদের। লোক সমাগম বেশি হওয়ায় রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকদের বিরুদ্ধে ভাড়া বেশি নেয়ার অভিযোগ করেছেন অনেক ক্রেতা। এদিকে মেলার প্রবেশপথে ব্যাপক লোক সমাগমে হিমশিম খেতে হয় শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের। টিকেট কাউন্টারের সামনে তৈরি হয় লম্বা লাইন ও জটলা। পরিবার নিয়ে আসা অনেককে স্ত্রী-সন্তানদের পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে লাইনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

মেলায় এ্যালুমিনিয়ামের গৃহস্থালি, প্লাস্টিক পণ্যসামগ্রীর স্টলগুলোতে নারী ক্রেতা-দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। মূল্যছাড়সহ বিভিন্ন সুবিধা দেয়ায় ক্রেতারা আকৃষ্ট হচ্ছেন। এছাড়া ইমিটেশন গহনা, শাড়ি, থ্রিপিস, লেহেঙ্গা ও শার্ট-প্যান্টের স্টলে নারী ও তরুণ-তরুণীদের ভিড় ছিল বেশি। এছাড়া থাইল্যান্ড, ভারত ও পাকিস্তান স্টলে ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা বলেন, মেলার শেষ দিকে এসে শুক্রবার অন্যান্য দিনের চেয়ে বিক্রি-বাট্টা বাড়াতে তাঁরা সন্তুষ্ট। বিদেশী পণ্যের খোঁজে ক্রেতারা যেমন ছুটেছেন, তেমনি দেশী পণ্য কেনাকাটায়ও আগ্রহের কমতি দেখা যায়নি তাদের। এবার মেলার ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদা ছিল উল্লেখ করার মতো। ওয়ালটন, সনি, র‌্যাংগস, সিঙ্গার, ট্রান্সকম, ইলেক্ট্রা ও প্যানাসনিকসহ বিভিন্ন নামীদামী প্যাভিলিয়নে সারাদিনই ভিড় লেগেছিল। মেলায় অপেক্ষাকৃত কম দামে বিশেষ করে ফ্রিজ, টিভি, ওয়াশিং মেশিন, প্রেসার কুকার, ওভেন, আয়রন, রুম হিটার, হটপট ইত্যাদির চাহিদা ছিল বেশি। এসব পণ্য কিনতে অনেক প্যাভিলিয়নে দেখা গেছে ক্রেতাদের লাইন দিয়ে ঢুকতে। দেশীয় ইলেকট্রনিক্স প্রতিষ্ঠান ওয়ালটনে গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতারা রীতিমতো লাইন দিয়ে ঢুকছেন। ক্রেতার ভিড় সামলাতে বেগ পেতে হয় ওয়ালটন প্যাভিলিয়ন কর্মকর্তাদের। ওয়ালটন প্যাভিলিয়নের ইনচার্জ আক্তারুজ্জামান অপু জনকণ্ঠকে বলেন, এবারের মেলায় ৩৫৪ মডেলের পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করছে দেশের শীর্ষ ইলেকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। সরেজমিনে দেখা গেছে, স্মার্টফোন প্রেমীদের ব্যাপক ভিড় ওয়ালটন প্যাভিলিয়নে। মেলায় ওয়ালটনের ৩০ মডেলের আকর্ষণীয় কালারের ৪৮ ধরনের স্মার্টফোন ও ট্যাব প্রদর্শন করা হচ্ছে। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে উন্নত প্রযুক্তির স্মার্টফোন প্রিমো জেড ও ওয়ালপ্যাড-জি। সনি র‌্যাংগস প্যাভিলিয়নের ইনচার্জ সারোয়ার জাহান চৌধুরী জানান, মেলা উপলক্ষে সনি এক্সপ্রিয়াসহ সব ধরনের স্মার্ট মোবাইল সেটে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। আজকের মতো মেলার বাকি দিনগুলো (শুক্রবার) থাকলে মেলা থেকে লোকসানের যে আশা করা হচ্ছিল তা হয়ত কেটে যেতে পারে। দেশ ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে তিনি সকল রাজনৈতিক দলকে দেশে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানান। মেলায় এবার প্লাস্টিক পণ্যের প্যাভিলিয়নগুলোতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ক্রেতা দেখা গেছে। বেঙ্গল, আরএফএল, এনপলি, তানিন, গাজীসহ বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্যের স্টলে সারাদিনই ভিড় লেগেছিল। বাণিজ্যমেলায় প্লাস্টিকের বাটি, মগ, জগ, চেয়ার, টেবিল, টুল ও বাচ্চাদের তৈরি খেলনা সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে। আরএফএল প্যাভিলিয়ন প্লাস্টিকের সোফাসেট কিনতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। মেলায় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলো ছাড়াও বিভিন্ন দোকানে অন্য পণ্যের পাশাপাশি প্লাস্টিকের মগ, জগ, থালাবাটি, পানির পাত্র বিক্রি হচ্ছে। এসব দোকানে মূল্যছাড় দিয়ে ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা চলছে। থাইল্যান্ড, ভারত, মালয়েশিয়ার দোকানগুলোতেও সীমিত পরিসরে প্লাস্টিক পণ্য বিক্রি করতে দেখা গেছে।

ধানম-ি থেকে মেলায় আসা স্কুলশিক্ষিকা আবদুল মালিক জনকণ্ঠকে জানান, সারা মাসই চেষ্টা করেছি মেলায় আসতে; কিন্তু নানা প্রতিকূলতার জন্য আসা হয়নি। আজ মেলায় এসে অনেকটা বিপদেই পড়ে গেছি। ভিড় সামলে স্টলগুলোতে ঢোকা বেশ কষ্টকর হয়ে পড়েছে। বিক্রয়কর্মীরা ঠিকভাবে কথা বলছেন না। প্রতিবারই মেলায় আসি কিছু কেনাকাটা করতে। এবারও এসেছি কিছু কিনব বলে; কিন্তু এ অবস্থায় কী করব ভাবছি। মেলা প্রাঙ্গণে হকারদের ধাক্কাধাক্কিও বিরক্তিকর ঠেকছে। মিরপুর থেকে বিকেলে বেসরকারী ব্যাংক কর্মকর্তা নজির উদ্দিন সস্ত্রীক মেলায় এসেছেন। তাঁর হাতের ৪টি বড় ব্যাগ দেখে বোঝা যায় তিনি অনেক কেনাকাট করেছেন। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, সময়ের অভাবে এতদিন মেলায় আসতে পারেনি, তাই শেষ সময়ে পণ্যে ছাড় পাওয়ার আশায় মেলায় এসেছি। মেলায় আগতদের বেশিরভাগই শুধু ঘুরতে এসেছেন। তবে শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে মেলায় এসেছেন। বিভিন্ন কোম্পানির বিশেষ ছাড়ের সুযোগে অনেকে কিনেছেন পছন্দমতো পণ্য। তবে সন্ধ্যার পর যারা দল বেঁধে এসেছেন, তারা মেলার মাঠে বসেছেন আড্ডায়।

বাণিজ্যমেলায় বিভিন্ন ধরনের ছাড়ের সুবিধা দিয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। অনেকে আবার আগের সঙ্গে নতুন করে ‘বিশেষ ছাড়’ যোগ করেছে। এদিকে নারী ও তরুণীদের বেশি কেনাকাটা করতে দেখা গেছে মেলাতে। অন্যদিকে বিক্রি বাড়ায় বিক্রেতারাও অনেক খুশি। এজন্য স্টল মালিকরা অন্যান্য দিনের চেয়ে বিক্রয়কর্মী বাড়িয়েছেন স্টলগুলোতে। এর পরও অনেক স্টলে ক্রেতাদের সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে কর্মীদের। এদিকে প্রথম দিকে মেলায় হকারের উৎপাত চোখে না পড়লেও শুক্রবার প্রচুর মানুষের ভিড়ে অনেক হকারকে দেখা যায়। আলুর চিপস, মুড়িমাখাসহ বিভিন্ন পণ্য তারা মেলা কর্তৃপক্ষের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিক্রি করছে। প্রতিদিনের মতো এদিনও দর্শনীয় প্যাভিলিয়নগুলোর সামনে ছিল লক্ষণীয় ভিড়। কেনা-কাটার পাশাপাশি বিভিন্ন নান্দনিক ডিজাইনের প্যাভিলিয়ন ছাড়াও বিভিন্ন ফোয়ারা, সুন্দরবন ইকোপার্ক, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি প্যাভিলিয়নের সামনে দর্শনার্থীদের ছবি তুলতে দেখা যায়। এবার মেলায় যথেষ্ট খোলা-মেলা জায়গা রাখায় অনেকে সন্তোষ প্রকাশ করেন। মেলার ঠিক মাঝখানে বড় টাওয়ারের চারপাশে প্রচুর জায়গা ও বসার ব্যবস্থা থাকায় কেনাকাটার মাঝখানে বিশ্রাম নিতে দেখা যায় ক্রেতাদের।

প্রকাশিত : ২৪ জানুয়ারী ২০১৫

২৪/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: