মূলত রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৭.৮ °C
 
২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

জানা-অজানা ॥ ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫
  • হাসান ইমাম সাগর

বাংলাদেশের প্রাচীনতম যানবাহন ঐতিহ্যবাহী ঘোড়া গাড়ি। ঘোড়া গাড়িতে শুধু ঢাকার রাজকীয় ঐতিহ্য ঘেরাই নয়। রূপকথার গল্পতেও উল্লেখ আছে এর কথা। ঢাকাসহ দেশের বেশকয়েকটি এলাকায় এই গাড়িটি টমটম নামে বেশ পরিচিত। একসময়ে এই গাড়িটি ছিল জমিদার, রাজা-বাদশা, ধনাঢ্যব্যক্তি এবং রাজ পরিবারের সদস্যদের পরিবহনের প্রধান বাহন। রণাঙ্গনের রসদ সরবরাহের অন্যতম মাধ্যম। সেই যুগ পেরিয়ে এখন অধুনিক যুগ। এ যুগেও হারিয়ে যায়নি সেই জীবচালিত বিশেষ যান-ঘোড়ার গাড়ি। এখনও ঢাকা শহরের রাজপথে চলে এ গাড়ি। যন্ত্রযানের বিকট শব্দের মাঝে ভেসে আসে ঘোড়ার খুরের ঠক ঠক আওয়াজ। পিচঢালা রাস্তায় রিক্সা, বাস, ট্রাক, ভ্যান আর মটরসাইকেলের সঙ্গে মিশে যেন যন্ত্রযানের মতোই এক বিশেষ যানের চলাচল।

ঘোড়া গাড়ির যখন প্রচলন হয় তখন ভারতবর্ষে চলে ইংরেজ শাসন। ঢাকায়ও ঘোড়া গাড়ি আসে সে সময় থেকেই। এই ঘোড়া গাড়ির ঢাকা শহরে চলাচলের সুবিধার্থে রাস্তা-ঘাটের সংস্কার করা হয়। প্রথমে ইট-সুরকি, সিমেন্ট-বালু পরবর্তীতে পিচ ঢালা ইট পাথর দিয়ে রাস্তা সংস্কারের কাজ করা হয়েছিল। সর্বপ্রথম এই গাড়ির ব্যবহার ইংরেজরা শুরু করলেও স্থানীয় অভিজাত শ্রেণির মানুষরাও এর সুবিধা নেয়। এক সময় তা চলে আসে সাধারণ মানুষের মধ্যে। এদেশের ইতিহাস ঐতিহ্য বেয়ে দেড়শত বছরেরও অধিক সময় পার করেছে রাজকীয় বাহন ঘোড়ার গাড়ি।

বর্তমানে ঢাকা শহরে ৩০-৩৪টি গাড়ি চলাচল করতে দেখা যায়। সদরঘাট, ফুলবাড়িয়া গুলিস্তান, গোলাপশাহ মাজার, বঙ্গবাজার, বকশীবাজার ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় গাড়িগুলো চলাচল করে। একটি ঘোড়া গাড়িতে ১২-১৪ জন যাত্রী বহন করা হয়, যা ঘোড়ার সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। ভাড়া টাকা বেশি পাওয়ার লোভে বোঝায় করা হয় অতিরিক্ত যাত্রী। এতে অসহনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয় নিরীহ প্রাণীগুলোর।

খোজ নিয়ে জানা যায়, যাত্রী পরিবহন ছাড়াও ঘোড়ার গাড়ি পুরান ঢাকার বিভিন্ন উৎসব, বিয়ে, জন্মদিন, চলচ্চিত্রের শূটিং, র‌্যালিতে ব্যবহার করা হয়। তবে অনেকে শখেরবশে ঘোড়া গাড়িতে চড়েন। অনুষ্ঠানে ঘোড়া গাড়িকে ফুল দিয়ে সুসজ্জিত করে সাজানো হয়। কোচোয়ান ও হেলপারের জন্যও রয়েছে বিশেষ পোশাক। পুরান ঢাকার বিশেষ করে বিয়ে, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে ঘোড়ার গাড়ি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিয়ে উপলক্ষে ঘোড়া গাড়িগুলো রঙিন করে সাজানো হয়। ফুলের মালা দিয়ে আর রঙিন কাগজ কেটে নকশা বানিয়ে সাজানো হয় ঘোড়া আর গাড়ি দুটোকেই। পৈত্রিকভাবে প্রাপ্ত অনেকেই ঘোড়া গাড়ির গাড়োয়ানি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই গাড়ি থেকে দৈনিক দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় হয় বলে জানা গেছে।

ঐতিহ্যবাহী ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো এই ঘোড়া গাড়ি। যা শত বছর পার করে দিয়ে যাত্রীদের আজও রাজা-বাদশাদের ভ্রমণের আবহ উপভোগ করার সুযোগ করে দেয়। তাইতো আজও শত যান্ত্রিক আর দ্রুতগামী যানের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াইয়ে আছে রাজা-জমিদারের সেই বাহন। মানুষ আজও নতুন প্রজন্মকে ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে ছুটে আসেন ঘোড়া গাড়ির কাছে। আমাদের সাহিত্যে-সংস্কৃতিতে এই ঘোড়া গাড়িকে দেখা হয় আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৩০ সালে ঢাকায় সর্বপ্রথম ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। তখন আর্মেনীয়রা ছিল এদেশের জমিদার বংশ। তাদের বসবাস ছিল পুরান ঢাকায়। ব্যবসার উদ্দেশ্যে তারা সে সময় ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দোকান খুলেছিল। তার মধ্যে শাঁখারীবাজারের ‘সিরকো অ্যান্ড সন্স’ অন্যতম। এ দোকানে বিভিন্ন ইউরোপীয় জিনিসপত্র বিক্রি হতো। ১৮৫৬ সালে সিরকোই প্রথম ঢাকায় ঘোড়া গাড়ির প্রচলন করেন যা তখন- ঠিকা গাড়ি নামে পরিচিল ছিল। পরবর্তীতে তা অন্যতম প্রধান যানবাহনে পরিণত হয়। আগেকার দিনে দেশের বড় শহর থেকে মফস্বল শহরের জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির মানুষজন ঘোড়া গাড়িকে প্রধান বাহন হিসেবে ব্যবহার করত।

প্রতিদিন পুরান ঢাকার রাস্তায় চলাচলের পাশাপাশি এই গাড়িগুলো ঈদ, পয়লা বৈশাখ, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে আজও কদর পায় জানিয়ে কোচয়ান বাতশা বলেন, এই কদরের জোরেই বেঁচে আছে কয়েক পুরুষ ধরে চালিয়ে যাওয়া টমটমের ব্যবসা। দৈনিক দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা আয় হয় গাড়ি চালিয়ে। এর থেকে তিনি পান তিন শত টাকা ।

সূত্র থেকে জানা যায়, ১৮৪৪ সালের ক্যালকাটা রিভিউতে উল্লেখ আছে নানা ধরনের ঘোড়া গাড়ির কথা। ঢাকায় যেসব ঘোড়া গাড়ি দেখা যায়- সেগুলোর নাম ক্রাহাঞ্চি বা ক্রাঞ্চি গাড়ি। এগুলোকে ‘কারাচি গাড়ি’ও বলা হতো। প্রতিদিনের কাজের সময় কানে ফুল, মাথায় মুকুট পরিয়ে ঘোড়াকে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাস্তায় বের করা হতো। আজও এই সকল টমটমের চাহিদা বেশি থাকে বিয়ে বাড়িতে। রাজকীয় বিয়ের আবহ চায় পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও ডাক পান তারা। জায়গা ও সময়ভেদে তিন থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকাও ভাড়া পান। একটি গাড়ি দিয়ে সারাদিনে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় হয় বলে জানান কামরাঙ্গীর চরের ইমন ও রামিয়া টমটমের মালিক মোঃ মামুন মিয়া।

ঘোড়া গাড়ির মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মানিক মিয়া জনকণ্ঠকে বলেন, সমস্ত খরচ বাদে একটি ঘোড়া গড়ি থেকে প্রতিদিন ছয়-সাত’শ টাকা থাকে। তবে বিশেষ কোন অনুষ্ঠানে গেলে সে দিনের হিসাব আলাদা। তাছাড়া ঘোড়ার পেছনে খরচ বেড়েছে কয়েকগুণ। বিশেষ করে ছোলা, গম ও ভূষি বুটের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেড়ে গেছে। ভূষি আর ঘাষ দিয়ে এক জোড়া ঘোড়ার পিছনে তাদের খরচ হয় প্রায় সাত’শ টাকা। তাই লাভ আগের মতো হয় না। তিনি আরও জানান, একটা গাড়ি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ছয় বার সদরঘাট-গুলিস্থান আসা-যাওয়া করতে পারে। ১৫ বছর আগেও এই রুটে প্রায় একশ মতো টমটম চলাচল করতো। তখন যাত্রীর সংখ্যাও ছিল অনেক বেশি। ঘোড়া আমদানি সম্পর্কে তিনি বলেন, আমরা ঘোড়াগুলো আমদানি করি বিক্রমপুর, মানিকগঞ্জ, সিলেট, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে। ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত হয় একটি ঘোড়ার দাম। আর গাড়িগুলো তৈরি করা হয় বঙ্গবাজার ঘোড়া পট্টিতে। লোহার ও স্টিলের দুই ধরনের টমটম তৈরি করা হয়। এক জোড়া ঘোড়াসহ একটি গাড়ির দাম দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত হয়।

তবে ঐতিহ্যবাহী এই ঘোড়া গাড়ি টিকিয়ে রাখার বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ সাইফুল ইসলাম বলেন, দৈনিক একটি ঘোড়াকে তার ওজনের ৬-৮ শতাংশ প্রোটিন যেমনÑ ছোলা, ভুট্টা, গম, যব জাতীয় খাবার দেয়া উচিত। প্রতি ১৫ দিন অন্তর চিকিৎসাসেবা দেয়া আবশ্যক। এছাড়া ঘোড়ার খাবারের দাম কমানো এবং বিশ্ব পশু আইন অনুসারে আমাদের দেশেও পশু আইন কর্যকর করলে এই প্রাণীগুলো টিকিয়ে রাখা সম্ভব। আর তাহলেই ঘোড়া গাড়ি টিকে থাকবে।

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫

২৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: