আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিশ্বের ঝুঁকিপূর্ণ সাত সড়ক

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫

পথ পথিক সৃষ্টি করে না, বরং পথিকই পথের সৃষ্টি করে। এই লাইনটি কে-কখন-কোথায় বলেছিলেন, তা আদৌ কেউ জানে বলে মনে হয় না। কিন্তু কথাটা যে খুবই সত্যি, সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। পথিক হেঁটে যাওয়ার ফলেই পথের সৃষ্টি হয় এবং সেই পথ ধরেই নতুন পথের দিশা মেলে আরও অগনিত পথিকের। ভাস্কো দা গামা, ইবনে বতুতা, ফা হিয়েনের মতো মানুষেরা অন্ধকার সরিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল বলেই গোটা বিশ্বজুড়ে এক অভিন্ন পথের সৃষ্টি হয়েছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান-সমাজ-সভ্যতা হাতে হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে অনেকটা দূর। তবুও এখনও অনেক সড়কপথ আছে যা প্রচণ্ড ঝুঁকি আর দুর্ঘটনায় ভরপুর। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয় কিছু সড়কে। আসুন জেনে নেই বিস্তারিত।

ন্যাশনাল রোড ৫, মাদাগাস্কার

মাদাগাস্কারের উত্তর-দক্ষিণের শহর মারোয়ানসেত্রা এবং সোয়ানিয়েরানার মধ্য দিয়ে চলে গেছে ন্যাশনাল রোড ৫। ওখান থেকে ঘুরে আসা এক পর্যটকের বক্তব্য হলো, যদি আপনি ওখানে গাড়ি নিয়ে ঘুরতে যান তাহলে অবশ্যই আপনাকে একজন ড্রাইভার ও মেকানিক নিয়ে যেতে হবে। প্রচণ্ড এবড়োথেবড়ো রাস্তা আর অবিন্যস্ত পাথরের কারণে হাঁটা এবং গাড়ি চালানো দুটোই মুশকিলের কাজ। মোট দুই শ’ কিলোমিটারের এই রাস্তায় অতিক্রম করতে গাড়িতে নিদেনপক্ষে চব্বিশ ঘণ্টাতো লাগবেই। আর যদি ভাগ্য ভাল না হয় তাহলে দুদিনও লেগে যেতে পারে। তবে বছরের ডিসেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বর্ষাকালীন সময়ে এই পুরো সড়কটি হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ। পানির কারণে পাথর সরে যাওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। তবে একবার যদি এই দীর্ঘ ভীতিকর সড়কটি উতরে যাওয়া যায়, তাহলে সামনেই দেখতে পাবেন সাদা বালুর চাদর, গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘ পামগাছের সারি। আর সেই চাদরে আছড়ে পড়ছে ভারত মহাসাগরের নোনা পানি।

রোটাঙ পাস, ভারত

ভারতের স্থানীয় ভাষায় রোটাঙ মানে হলো ‘শবদেহের স্তূপ’। যে সড়কের নামই এমন ভয়ঙ্কর তার চেহারা কতটা ভয়ঙ্কর হবে তা সহজেই অনুমান করে নেয়া যায়। পূর্ব হিমালয়ের চার হাজার মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই রাস্তায় ধস খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। আর আবহাওয়ার কথা না বললেই নয়। সকালে যদি রোদ ঝলমল আবহাওয়া দেখা যায়, দুপুরে সেই একই স্থানে তুষার পড়তেও দেখা যায়। প্রতিবছরই সড়ক বিভাগের কর্মীরা জিপিএস সিস্টেম ব্যবহার করে কাদা আর তুষারের তলা থেকে এই রাস্তাটিকে খনন করে বের করে। তবে বছরের মে মাস থেকে নবেম্বর মাস পর্যন্ত আবহাওয়া ততটা বৈরি না থাকায়, ভারত সরকার সে সময় সড়কটিকে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়। ২০১০ সালে প্রায় ৩০০ পর্যটক এই সড়কটিতে আটকে পড়েছিল। সড়কটির ঠিক নিচেই আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে একটা সুড়ঙ্গ আছে যেখানে প্রয়োজনে আশ্রয় নেয়া যায়। তবে যারা সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য সড়কটি বেশ রহস্যময়। কারণ কুলু, লাহুয়াল এবং স্পিটি ভ্যালিতে যেতে হলে এই দীর্ঘ সড়কটি ডিঙ্গানো ছাড়া উপায় নেই। আর তবেই আপনি দেখতে পাবেন পাহাড়ের নৈসর্গিক সৌন্দর্য।

ট্রান্সফার্গাসন রোড, রুমানিয়া

একটা সড়ক যে কতবার বাঁক নিতে পারে, তা রুমানিয়ার এই সড়কটি না দেখলে বোঝা যায় না। মানুষের মাথার চুলের মতো আঁকাবাঁকা হয়ে ছুটে চলেছে ট্রান্সফার্গাসন রোড। কয়েক বছর আগে এক জরিপে দেখা যায়, বিশ্বের অদ্ভুত দর্শন সড়কগুলোর মধ্যে এই ৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে রাস্তাটি হয়েছে অন্যতম। ১৯৭০ সালের দিকে রুমানিয়ায় ব্রিটিশ বাহিনীর আগ্রাসনের সময় এই সড়কটি তৈরি করা হয়েছিল। দক্ষিণ কার্পেথিয়ানের বিখ্যাত দুই পাহাড় মলদেভানো এবং নেগুই’র সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে আছে এই সড়ক। কিছু পর্যটকের মতে, এই সড়কে গাড়ি চালানোর বদলে হেঁটে যাওয়াই ভাল। কারণ প্রতি তিন-চার সেকেন্ড পরপর যদি গাড়ি গিয়ার পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে কার ভাল লাগবে এখানে গাড়ি চালাতে।

ইয়েরে হাইওয়ে, অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণের এই ৬৮৪ মাইল দীর্ঘ সড়কটি দেখতে খুব একটা প্যাঁচালো নয়। কিন্তু একবার সড়কে নামলে বোঝা যায় ঠিক কতটা রোমাঞ্চ অপেক্ষা করে আছে সড়কটির বাঁকে বাঁকে। ক্যাঙ্গারু আর ইমুদের সঙ্গে তো হরহামেশা দেখা হয়ে যাবে আপনার। ভাগ্য যদি কিঞ্চিত ভাল হয়, তবে উটের দেখাও মিলবে। সড়কের যত্রতত্র প্রাণীরা চলাচল করার কারণেও রাস্তাটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। যদি কোন ক্ষ্যাপাটে পর্যটক বা চালক রাতে এই সড়কে গাড়ি চালান, তবে তার অভিজ্ঞতা হবে ভয়াবহ। আর সেই অভিজ্ঞতা না পড়ে নিজের চোখে দেখাই ভাল নয় কি!

পৃথিবী হাইওয়ে, নেপাল

নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে পোখারার দূরত্ব ১৭৪ কিলোমিটার। এই সড়কের মাঝে অন্তত দশটি পাহাড়ের চূড়া আছে, যা দেখতে দেখতে পোখারা পৌঁছানো যাবে। তাই বলে যদি ভেবে থাকেন পুরোটা পথ আপনি স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে গাড়ি চালিয়ে পাহাড়ের চূড়া দেখতে দেখতে চলে যাবেন, তাহলে কিঞ্চিত নয় পুরোটাই ভুল ভাবছেন। চশমাশ নদী পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার পর নৌকার করে নদী পাড়ি দিতে হবে। আর এরপর শুধু হাঁটা আর হাঁটা। তবে বছরের কিছু সময় সড়কটিতে গাড়ি চলে। পৃথিবী হাইওয়ে নেপালের ধর্মীয় বিশ্বাসীদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই সড়কেই বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উপাসনালয় রয়েছে, যাদের মধ্যে অন্যতম হলো মনোকামনা মন্দির।

কলিমা হাইওয়ে, সাইবেরিয়া

সাইবেরিয়ার নাম শুনলেই গায়ে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। এমনিতেই প্রতিকূল আবহাওয়া, তার ওপর যদি প্রতিকূল সড়ক হয়, তাহলে তো কথাই নেই। রাশিয়ার এই হাইওয়েটিকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। কিন্তু স্থানীয়দের ভাষায় এই সড়কটির নাম ‘হাড়ের সড়ক’। এর অবশ্য কারণও আছে। এই রাস্তাটি নির্মাণ করা হয় ১৯৩০-১৯৫০ সালের মধ্যবর্তীকালীন সরকারের সময়। সে সময় কয়েক হাজার রাজবন্দীকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। মাইনাস সত্তর ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রার মাঝে এই বন্দীদের দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এই সড়কটি। বন্দীদের মধ্যে যারা কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ত তাদের এই সড়কের উপরই গুলি করে হত্যা করা হতো। এই সড়কটির নিচে হাজারো মানুষের কবর রচিত আছে, যাদের পরিচয় হয়ত আর কোনদিন মানুষ জানতে পারবে না।

গোলিয়াং টানেল, চীন

চীন আজও রহস্যে ঘেরা বাকি দুনিয়ার মানুষের কাছে। সেই চীনের মানুষের কাছেই আবার তাদের দেশের একাংশের মানুষ ছিল দীর্ঘদিন অচেনা। আর এর অন্যতম কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থার অনগ্রসরতা। পূর্ব চীনের তাইহাঙ পাহাড়ের ওপরে গোলিয়াং গ্রামে কয়েক শত বছর ধরে একদল মানুষ বসবাস করত। তাদের কাছে তারাই ছিল পৃথিবীর একমাত্র মানবগোষ্ঠী। গোটাবিশ্বে যখন যন্ত্র সভ্যতা বিপুল উৎকর্ষতা অর্জন করেছে তখন ওই গ্রামে মানুষ পাথর ছাড়া শক্ত কোন বস্তুর অস্তিত্ব সম্পর্কেই জানত না। তবে শেষমেষ ১৯৭২ সালে ভারি বিস্ফোরণে কেঁপে উঠে তাইহাঙ পাহাড়। চীনের সরকার তার প্রকৌশলীদের কাজে লাগিয়ে দুটি প্রদেশের মধ্যকার সংযোগ সড়ক তৈরির লক্ষ্যে প্রায় দেড় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে একটি সুড়ঙ্গ খোঁড়ে তাইহাঙ পাহাড়ে। এই সুড়ঙ্গ খনন করতে গিয়ে অনেকেই মারা যায়। সড়কটির প্রস্থ মাত্র চার মিটার হওয়ায় গাড়ি চালানো খুবই কঠিন। বর্ষাকালে এই রাস্তায় গাড়ি চালানো তো দূরের কথা, হেঁটে চলাই মুশকিল।

বাংলা মেইল

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫

২৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: