মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মেয়ে নয় সন্তান ভাবুন

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫
মেয়ে নয় সন্তান  ভাবুন
  • রায়হান ফরাজী

গল্পের আদলে লেখাটা শুরু করতে হচ্ছে। কারণ পূর্বের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই আমাদের পরবর্তী জীবনে প্রভাব ফেলে। যা আমরা বয়ে বেড়াই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি পারিবারিকভাবেই আলোকে বিয়ে করেন জামান। স্বল্পশিক্ষিত জামান এবং অপ্রাপ্ত বয়স্ক আলো সুখেই সংসার করতে থাকে। বছর ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম সন্তানের মুখ দেখতে পান তারা। কন্যা সন্তান। বংশের প্রদীপ পুত্র সন্তানের আশায় বুক বাঁধে তারা। এভাবে প্রদীপের আশায় একের পর এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়ে মায়ের পারিবারিক, সামাজিক অবস্থা বলার মতো না। শেষ মুহূর্তে এক পুত্র সন্তানের বাবা হতে পারেন জামান। সব মিলে পাঁচ মেয়ে এক পুত্র সন্তানের প্রদীপের আলোয় সংসার।

সন্তানের সংখ্যা বেশি বংশের প্রদীপ কম, এমন অবস্থায় সংসার চালানোর মতো প্রাচুর্যেরও অভাব দেখা দেয়। হিসাব করে দেখে সব সন্তান ত আর সন্তান না, ছেলে সন্তান আর মেয়ে সন্তান শুধুই মেয়ে। যা কিনা পরিবারে বোঝা। এই বোঝা যে আমদানি করেছে তার সঙ্গে একটা বোঝা পড়া না করলেই নয়। একদিকে এতগুলো সন্তানের মা, সংসার সামলানো, গ্রামের বাড়ির অজস্র কাজ যা কিনা বর্তমান সময়ের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। সেবা যতœহীন, অক্লান্ত পরিশ্রমের ভারে প্রায়ই অসুস্থ থাকে আলো।

বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে, জামাই শিক্ষিত, ভদ্র, সম্ভ্রান্ত পরিবারের ভাল সরকারী চাকরিজীবী। কিছুদিন যাওয়ার পর নতুন জামাই দেখতে পেল বৌ তার পরিবার ছাড়া স্বামীর পরিবারের মানুষের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে না। সময়ের আবর্তে সেই স্বামী অনেক কিছুই মেনে নিয়েছে। স্বামীর উপার্জিত সম্পদ থেকেই সেই স্ত্রী নিজ মা বোন, ভাইয়ের জন্য যতটুকু সাধ্য তার সবটাই সে করেছে। নিজের মা, ভাই-বোনের জন্য কিছু করা কোন স্ত্রীর জন্যই অন্যায় নয়, এটা তার অধিকার, কর্তব্য। কিন্তু এই কর্তব্যের জন্য যদি স্বামী, তার পরিবার বিব্রত হয়, সেই ক্ষেত্রে ন্যায় অন্যায়ের মানদ-ের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন।

বিবাহিত, শিক্ষিত, আধুনিক, রুচিশীল, সচেতন অনেক নারী দেখেছে নিজ নানীকে। যে কিনা শেষ বয়সে এসে চরম অবহেলায় ছিল, নিজ দাদা বাড়ির ব্যাপারে বাবা-মায়ের ধ্যান ধারণায় বড় হয়েছে। সেই সঙ্গে এখন আছে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের প্রলুব্ধ সিরিয়ালের শিক্ষা।

ইগল্যান্ড ও স্ট্রোফ শিশু মনোবিজ্ঞানী ১৯৮১ সালে বলেন, শিশুকালীন সময় অভিভাবকদের অবহেলা সেই শিশুর মনে পরিবার ও সমাজের প্রতি ঘৃণা নিয়ে বেড়ে উঠতে বাধ্য করে। ইংল্যান্ডের মনোবিজ্ঞানী ব্রোপি ও স্ট্রাউস ১৯৭৭ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তাদের এক দীর্ঘ মেয়াদী গবেষণায় বলেন, স্বল্প আত্মবিশ্বাস, ক্রোধ, অসামাজিক এবং শেষ হয় বড়মাপের অপরাধী পরিচয়ের মাধ্যমে, এরকম বেশির ভাগ মানুষ পারিবারিক দীনতায় তার শিশুকাল কাটিয়েছে।

একক পরিবারের সন্তান পারিবারিক অপূর্ণতা নিয়েই বেড়ে ওঠে। একক পরিবার যে ইস্যুতেই তৈরি হোক না কেন, বেশিরভাগ সন্তান মায়ের কাছেই থাকে এবং মায়ের কাছেই বেড়ে ওঠে। আমেরিকার তথ্য পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১২ সালের জরিপে উল্লেখ করে, একক পরিবারের সন্তানরা কম উপার্জনের জন্য ভাল শিক্ষাগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয় এবং তারা ব্যর্থ হয় জীবনের সফলতম সময়ে, সেই সঙ্গে একাডেমিক ও সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রেও।

প্রতিটি শিশুকে বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের পারিবারিকভাবে আত্মমর্যাদাপূর্ণ মানুষ করে গড়ে তোলার পিছনে মূল প্রতিষ্ঠান তার পরিবার। গোগ-মোরি, কোমিং এ্যান্ড প্যাপ ২০০৭ সালের গবেষণায় বলেন, যে সব পরিবারে ঝগড়া-বিবাদ অভিভাবকদের মাঝে লেগে থাকে সে পরিবারের সন্তান একটা পর্যায়ে বিপরীতমুখী আচরণ, স্বার্থপর ও মানসিক দুর্বলতা নিয়েই বড় হয়। সেই সঙ্গে পূর্ণ বয়সে নিজেও পরিবার ও সমাজে সেই সব অবিচার প্রয়োগ করতে থাকে, যা সে শিশু অবস্থায় পেয়েছিল। শিশু যে পরিবেশে, শিক্ষায়, আদর্শে, মনমানসিকতা বিশ্বাসে বড় হয়েছে প্রাপ্ত বয়সে সেই শিক্ষায় অবচেতনভাবে প্রয়োগ করে ফেলে, যা কিনা একটা পর্যায়ে সমাজে তথা রাষ্ট্রের বোঝা হয়ে যায়। তাই আমরা যদি শিশুর লিঙ্গ বিচার না করে পরিবারের সর্বোচ্চ মানবিকতায় ওদের সত্য মানুষ করতে পারি, তবে রেহাই পাবে আগামী প্রজন্মের পৃথিবী।

শিশুর ভাল ভবিষ্যতের জন্য গবেষকরা খুব সাধারণ অথচ কার্যকর কিছু পন্থা বাতলে দিয়েছেন, যেমন- শিশুকে অনুরোধ করা ও ধন্যবাদ বলা, যথা কোন একটি ছোট কাজ তাকে দিয়ে করানোর আগে অনুরোধের স্বরে বলা এবং কাজ শেষে ধন্যবাদ বলে বিদায় করা। এতে করে শিশুটি পরিবারে তার গুরুত্ব বোঝার সুযোগ পাবে এবং একটা নির্দিষ্ট সময়ে সে নিজেই এই আচরণে অভ্যস্ত হয়ে তার সঠিক প্রয়োগ করবে।

কোন খেলনা অন্যের সঙ্গে অংশীদার করে খেলার কথা বলতে হবে, আচরণের ত্রুটি ধরা পড়লে উক্ত আচরণের মূল্যায়ন উপমা দিয়ে শিশুকে বোঝাতে হবে। সময় বদলেছে, শিশুকে শিশু ভেবেই মানুষ করতে হবে। যোগ্য সন্তান ছেলে মেয়ে বিভেদে এখন আর ভাগ করা যায় না। এ গল্পটা আমরা আর সামনে এগিয়ে নিতে চাই না। এর ধারাবাহিকতা পারিবারিক দীনতাই প্রকাশ করে।

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫

২৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: