মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

গল্প ॥ গেরিলা চাচি

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫
  • হারুনর রশীদ

ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার আগে তাকে বলা হয়েছিল, গেরিলা চাচির নাম বললেই যথেষ্ট। তার জন্যই কুরিপোল গ্রামটির নাম আজ মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু খুঁজে পেতে সেই গ্রামের এক পাড়ায় এসে সে দেখতে পায় শুধু একটি পতিত জায়গা। এখানে যে কোনদিন ঘর-বাড়ি ছিল তার কোন নাম-নিশানাই নেই। আছে শুধু হাঁটু সমান আগাছা। অগত্যা তারই এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে সে তার ডান হাতে চোখের সামনে ক্যামেরা ধরে ডান হাতেরই আঙুল দিয়ে ক্যামেরার বোতাম টিপে একের পর এক ছবি তুলতে থাকে। বয়স চল্লিশ বা আরও কিছু বেশি। মুখে চাপ দাড়ি। মাথায় ঝাঁকড়া চুল। সব যেন অযতেœ বেড়ে ওঠা। পরনে রং চটা জিনসের শার্ট-প্যান্ট। পায়ে কেডস। কাঁধে ব্যাগ। ফুলহাতা শার্টের বাঁ হাতটা নড়বড় করে দুলছে। মনে হয়, কনুইয়ের নিচে হাতের কিছুই অবশিষ্ট নেই। বাচ্চাদের কাছে সেটাই একটা আনন্দের খোরাক। কৌতূহলের বশে একজন দু’জন করে পাড়ার মানুষ তার চারপাশে ভিড় করতে থাকে। মহিলা এবং অল্প বয়সী ছেলেমেয়ের সংখ্যাই বেশি। তাকে এভাবে বিরান জায়গার ছবি তুলতে দেখে সবাই অবাক। একজন বয়স্ক মহিলা উৎসাহের সাথে বলে ফেলে,

দেইখেছো, হালিমা কুদ্দুসের বাড়ির ভিটার ফটো তুইলে ফেইললো।

পাশে থেকে অল্পবয়েসী আরেকজন তাকে বিড় বিড় করে জিজ্ঞেস করে,

সে আবার কিডা গো?

: চেন না? ওইযে, আলোর মা। আমাদের গেরিলা চাচি গো!

‘হালিমা কুদ্দুস’, ‘আলোর মা’Ñ এইসব কথা শুনে লোকটি তার চোখ থেকে ক্যামেরা নামিয়ে প্রচ- একটা ঝাঁকুনি খাওয়ার মতো দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকায়।

আবার একজনের প্রশ্ন, আর ইনি কিডা?

একটু দূরে দাঁড়ানো এক চতুর কিশোর মুখ টিপে হেসে জবাব দেয়, হাতকাটা সাংবাদিক।

বলেই সে ভয়ে আর লজ্জায় মুখ আড়াল করে। তার মতো আরেকটি ছেলে যোগ করে, এই ছবি খবরের কাগজে ছাপা হবি, তাই না?

বয়স্কা মহিলাটি এবার পরিষ্কার কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

তা এত বছর পর আইজ হঠাৎ হালিমা কুদ্দুসের খোঁজ পইড়লো যে? ব্যাপার কি গো ব্যাটা?

লোকটা বিনয়ের সাথে বলে, ওই ছেলেটা ঠিকই বলেছে। আমি ঢাকার এক পত্রিকার ফটো সাংবাদিক। গেরিলা চাচি সম্বন্ধে কিছু জানার জন্যে এসেছি। আপনাদের যা জানা আছে আমাকে বলতে পারেন।

মহিলার কণ্ঠে আক্ষেপের সুর,

বাবারে, আমরা হইলেম মুখখু-সুখখু মানুষ। তবে এইখেনেই তো তার বাড়িঘর ছিল গো। কিন্তু বেটারে, সে তো এখন পাগল হয়া ঘুইরে বেড়াচ্ছে। সব কপাল। এক সময় যার স্বামী-সন্তান, বাড়িঘর সব ছিল এখন তার কিছুই নেইগো। কী দুখ্খু!

সে শাড়ির আঁচল দিয়ে নাক মোছে। অল্প বয়েসী ছেলেটি এবার সাহস করে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। উৎসাহের সাথে বলে, রেল স্টেশনে থাকে। চলেন, আমি নিয়ে যাই। যাবেন?

: চলো।

হাঁটাপথে ওরা বাজার পেরিয়ে রেল লাইনের ব্রিজের নিচ দিয়ে গিয়ে রেল স্টেশনে পৌঁছায়। রেল স্টেশনটা সমতল থেকে বেশ উঁচুতে। সেখানে দাঁড়িয়ে নিচে চারপাশে তাকালে বেশ ভালো লাগে। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। ছেলেটি জানায়, জায়গাটার নাম মিরপুর। বাজারও মিরপুর। স্টেশনের নামও মিরপুর।

তারপর সে হাত উঁচু করে এক বৃদ্ধা পাগলিকে দেখিয়ে বলে, ঐ যে।

একটু দূরে স্টেশনের প্ল্যাটফরমের এক কোণে পোটলা-পুটলী নিয়ে বসে সে বিড় বিড় করছে। ছেলেটি যাবার আগে সতর্ক করে দিয়ে যায়,

সাবধান। কাছে গেলে আর কথা বলতে চাইলে পাগলি কিন্তু পাথর ছুঁড়ে মারে।

ফটো সাংবাদিক ভয়ে ভয়ে পাগলির কাছে এগিয়ে যায়। মনোযোগের সাথে তাকে দেখে। চোখদুটো থরথর করে ওঠে। আবেগে মথিত হয়। যাকে ঘিরে এ্যাসাইনমেন্ট তাকে সামনে পেয়ে যেন তার চোখমুখ আনন্দে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। আর ঠিক তখনই পাগলি একটা লাঠি হাতে রাগের সাথে উঠে দাঁড়ায়। সে ভয় পেয়ে দু’ পা পিছিয়ে যায়। মন খারাপ হয়। পাগলি এক সময় আবার বসে পড়ে। সুযোগ বুঝে সে তার একটা ছবি তুলে ফেলে। কিন্তু পাগলি এবার তার দিকে একটা পাথর ছুঁড়ে মারে। সে ত্বরিত মাথা নিচু করে রক্ষা পায়। তবুও তার অটল সিদ্ধান্ত, পাগলির সাথে ভালো করে কথা বলতে না পারা বা ভালো কিছু ছবি না তোলা পর্যন্ত সে তাকে আড়ালে আড়ালে অনুসরণ করে চলবে। তাই সে এই ছোট্ট রেল স্টেশনটির ওয়েটিং রুমে আস্তানা গেড়ে বসে। গেরিলা চাচি, যে নাকি আজ পাগল হয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছে তার সম্বন্ধে নানা উৎস থেকে অল্পবিস্তর যা তথ্য পায় দু’একদিন পরপরই তার ওপর প্রতিবেদন তৈরি করে ঢাকায় পাঠায়।

প্রথম কিস্তির প্রতিবেদনে সে জানায়, ‘মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগের কথা। গেরিলা চাচি ওরফে হালিমার পরিবার ঢাকায় থাকে। পুরনো শহরের এক ভাড়া বাড়িতে। তার স্বামী আবদুল কুদ্দুস ছোটখাটো সরকারী কর্মকর্তা। তাদের দুই সন্তানের মধ্যে বড় ছেলে জ্যোতি বছর দুয়েক আগে এম এ পাস করে অনেক চেষ্টা-চরিত্র করে মাত্র কয়েক মাস আগে একটা চাকরিতে ঢুকেছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে ছাত্র রাজনীতি করতো। আর ছোট ছেলে আলো সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। হালিমা বেতার টেলিভিশনের একজন তালিকাভুক্ত নজরুল সঙ্গীত শিল্পী। কিন্তু যারা রবীন্দ্র-নজরুলের গান গায় তাদের দুর্দিন। সহজে প্রোগ্রাম পায় না।

ওই বাড়িতে তাদের পাশাপাশি থাকে আরেকটা পরিবার। কর্তা জাহিদ আর কুদ্দুস চাকরি করেন একই অফিসে। জাহিদের ছেলে বীরু আলোর সমবয়েসী এবং দু’জন একই স্কুলে একই ক্লাসের ছাত্র। দু’জনের সাথে যেমন বন্ধুত্ব তেমনি দুই পরিবারের মধ্যেও খুবই মেলামেশা, খুবই ভালো সম্পর্ক। বীরু আলোর মাকে ‘বড়মা’ বলে ডাকে। বড়মাও বীরুকে আলোর সমান আদর-স্নেহ করেন। ছুটির দিনে কুদ্দুস আর জাহিদ বারান্দায় বসে আড্ডা দেন আর হালিমা বসে যান হারমোনিয়ম নিয়ে গান করতে। বীরুর মা কামরুন্নাহার সকলের জন্য চালভাজা আর চা নিয়ে এসে যোগ দেন আসরে।’

পাগলি আপন মনে একেক সময় একেক স্থানে হেঁটে বেড়ায়। কখনো কোথাও বসে ইনিয়ে-বিনিয়ে কাঁদে। কখনো আবার হাসে। কখনো রেল লাইনের ধারে চুপচাপ বসে থাকে। কখনো আবার দু’হাতে পাথর সরাতে থাকে। ফটো সাংবাদিক কোনোকিছুর আড়ালে দাঁড়িয়ে এসব দেখে। কিন্তু কোনোমতেই মুখোমুখি হতে সাহস পায় না। সুবিধামতো ছবিও তোলা হয় না।

পরের কিস্তির প্রতিবেদনে সে লেখে, ‘জ্যোতির বিয়ের কথা পাকাপাকি হয়ে গেছে। তারিখও ঠিক হয়েছে। দু’চার দিনের মধ্যে হবে গায়ে হলুদ। অথচ এরই মধ্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি হঠাৎই উত্তাল হয়ে ওঠে। যেখানে সেখানে যখন তখন মিটিং মিছিল। দেখতে দেখতে বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলন। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে চারদিকে মানুষের মুখে নানা কথা। আলোর মা-বাবার মনেও চাপা উৎকণ্ঠা। বিয়ের তারিখ পিছিয়ে দেবে কিনা তা নিয়েও নিজেদের মধ্যে শলা-পরামর্শ চলে। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন মাঝরাতে কামান দাগার বিকট শব্দে বাড়ির সকলের ঘুম ভেঙ্গে যায়। জানালা দিয়ে দেখা যায়, শব্দের সাথে সাথে আগুন ঝলসে উঠছে। কুদ্দুস বললেন,

শহীদ মিনার বুঝি গুঁড়িয়ে দিল।

বীরুরা সবাই ওদের ঘরে এসে আশ্রয় নেয়। সবারই চোখমুখ ভয়ে ফ্যাকাশে। তার উপর সকলের মনে উৎকণ্ঠা, জ্যোতি বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হলে তার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আর ফেরেনি।

ভোর হতে না হতে পাড়া-প্রতিবেশীরা ছুটে আসে। কেউ কেউ বুড়িগঙ্গার পানিতে অনেক লাশের সাথে জ্যোতির লাশও ভাসতে দেখেছে বলে জানায়। কিন্তু কারফিউর মধ্যে কে কোথায় দৌড়াবে! নানা শঙ্কার মধ্যে দিনটি পার হয়। রাত তো আরো বিভীষিকাময়। সমস্ত শহর নীরব-নিস্তব্ধ, যেন একটা প্রেতপুরী। মাঝে মাঝে শুধু দূরে দু’একটা কুকুরের মরা কান্নার ডাক, দু’একটা ঠুসঠাস গুলি অথবা ধারে কাছে কোথাও মিলিটারির পায়ের ভারী বুটের ঠকঠক শব্দ। শুনলে রক্ত হিম হয়ে আসে। মানুষ নিজের নিঃশ্বাসের শব্দেও হঠাৎ হঠাৎ চমকে উঠছে। কুদ্দুস সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, আগামীকাল ভোরেই শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যাবেন। ঠিক হয়, বীরুরাও তাদের সাথে বেরোবে।’

: আরে, আপনি এখনো আছেন?

স্টেশনের ওয়েটিং রুমের দরোজায় হঠাৎ একথা শুনে ফটো সাংবাদিক চোখ তুলে তাকায়। দরোজায় দাঁড়িয়ে শাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত এক লোক। মুখে কাঁচাপাকা মাঝারি সাইজের দাড়ি। নাদুশ-নুদুশ শরীর।

: আইসবো? আপনের ডিস্টার্ব হবি নেন তো? আপনেরা সাংবাদিক মানুষ। সব সময়ই কিছু না কিছ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

: আসুন, আসুন।

লোকটি এসে তার পাশে বসে পড়ে,

আমার নাম আজিবার রহমান। ছোটখাটো মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। যে গেরামে আপনি গেরিলা চাচির খবর সংগ্রহ করতি গিয়েছিলেন সেই গেরামেই আমার বাড়ি। সম্পর্কে উনি আমার চাচি। তা খোঁজখবর কতটুকু সংগ্রহ করতি পাইরলেন?

সাংবাদিক ডায়েরি নামিয়ে রেখে একটা শাদা প্যাড হাতে তুলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলে,

এই অল্প-স্বল্প কিছু।

আজিবার হঠাৎ সাপের মতো ফোঁস শব্দে একটা ভারি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে থাকে,

হায়রে দেশ! গেরামের পুরোন যারা তারা গিয়েছে ভুইলে। আর নতুন যারা তারা তো কিছু জানতেই চায় না। তবে ঐ হালিমা কুদ্দুস যে কতবড় মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন তা বোধহয় কিছুটা শুইনেছেন।

: কিন্তু গেরিলা হিসেবে উনি -

:শোনেন শোনেন, তাহলি কয়াই ফেলি।

আজিবারের বিবরণের উপর ভিত্তি করে ফটো সাংবাদিকের শেষ কিস্তির প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘কুদ্দুস ঢাকা থেকে হালিমা ও আলোকে নিয়ে কুরিপোল আসার পরপরই গ্রামের লোকজনকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য খুব জোরেসোরে সংগঠিত করতে থাকেন। আমবাগানে নিয়মিত গোপন মিটিং বসে। গেরিলা যুদ্ধের নিয়মকানুন শেখানো হয়, অস্ত্র পরিচালনার ট্রেনিং হয়, অপারেশনের স্থান রেকি করা, এ্যাডভান্স পার্টি, কভার পার্টি ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়। প্রশিক্ষণ দেন ইপিআর-এর কমান্ডার খলিল যাকে গ্রামের সবাই তার ডাকনামে ডাকে খুকু বলে। আলো আর হালিমাকে নিয়ে কুদ্দুস অত্যন্ত সাফল্যের সাথে সব ট্রেনিং শেষ করেন। তারপর ছদ্মবেশে দুএকটা প্রশংসনীয় কাজ সমাধা করার পর সবাই আলোকে ‘বিচ্ছু’ ও হালিমাকে ‘গেরিলা চাচি’ বলে ডাকা শুরু করে। ওদিকে কিছুদিনের মধ্যে একদল পাকি মিলিটারি মিরপুর বাজারে এসে ক্যাম্প করে। হারামজাদা দুলু মাতবর সুযোগ বুঝে তাদের সাথে যোগ দিয়ে কিছু লোক নিয়ে তৈরি করে শান্তি কমিটি। বাড়িতে বাড়িতে হানা দিয়ে আরম্ভ করে দেয় নানা রকম অত্যাচার। একদিন ওদেরই যোগসাজশে মিলিটারিরা কুদ্দুসকে সেই যে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেল তারপর আর তার কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। মুক্তিযোদ্ধারা তখন শপথ নিল, যেভাবেই হোক বাজারের মিলিটারি ক্যাম্প উড়িয়ে দিতে হবে। এরই মধ্যে খবর পাওয়া গেল, ১৩ তারিখ সন্ধ্যার একটু আগে দিয়ে সৈন্য বোঝাই একটি ট্রেন মিরপুর স্টেশনের উপর দিয়ে যাবে। দিন-তারিখ-সময় সবকিছু ঠিক করে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, মিলিটারি ক্যাম্প আক্রমণ এবং রেলওয়ে ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে সৈন্য বোঝাই ট্রেন ধ্বংস করার দুটো অপারেশন একই সাথে চালানো হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সে কী উত্তেজনা! গেরিলা চাচি দায়িত্ব পায় মিলিটারি ক্যাম্প অপারেশনে আর আলো রেলওয়ে ব্রিজে। নির্ধারিত দিনে সময় মতো যে যার কাজে লেগে যায়। রাজাকাররা ব্রিজ পাহারা দেয়। তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্রিজে এক্সপোসিভ বসাতে হবে। কচুরিপানা ভর্তি ডোবায় আলো এবং অন্যরা লুকিয়ে লুকিয়ে ডুব দিয়ে দিয়ে ক্রলিং করে সে কাজ সারে। আর ওদিকে আলোর মা থুড়থুড়ি বুড়ি ভিক্ষুক সেজে ভিক্ষার ঝুলিতে করে বাজারের মিলিটারি ক্যাম্পে গ্রেনেড ও অন্যান্য অস্ত্র-সরঞ্জাম বহন করতে থাকে।

সকলের বুদ্ধি, অসীম সাহস ও অক্লান্ত পরিশ্রমে সময়মতো দুটো অপারেশনই সফল হয়। মিলিটারি ক্যাম্পে দুলু মাতবরসহ অনেক রাজাকার-মিলিটারি মারা পড়ে। আর সৈন্য বোঝাই ট্রেনটি ব্রিজে ওঠামাত্র উড়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই আনন্দে আত্মহারা। অনেক অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ তাদের দখলে চলে আসে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তার একদিন পর যখন ফাইটার প্লেন এসে বম্বিং শুরু করে তখন আলো সেই বম্বিং-এর মধ্যে পড়ে প্রাণ হারায়।’

পাগলিকে গোপনে অনুসরণ করতে করতে ফটো সাংবাদিক আজ এসে দাঁড়ায় রেল স্টেশনের অদূরে জঙ্গলঘেরা একটা জায়গায়। জঙ্গলের মাঝখানে বেশ বড় রকমের একটি গর্ত। গর্তটি শুকনো। দিনে দিনে ভরাট হয়ে উঠেছে। জন্মেছে ঘাষ ও নানা আগাছা। পাগলি মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে গর্তের দিকে তাকিয়ে নাকি সুরে কাঁদছে। সে উল্টোদিকে ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পাগলি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাঁটু ভেঙ্গে মাথায় হাত দিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। দৃষ্টি তার গর্তের দিকে স্থির। সাংবাদিক আজ তার সব ভঙ্গির ছবি নিশ্চিন্তে তুলতে পেরে খুব খুশি। ঝোপের মধ্যে এক জায়গায় একটি মাঝারি সাইজের কংক্রিটের স্তম্ভ। তার গায়ে লেখা ‘১৯৭১ সনে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর বধ্যভূমি।’ অবাক হয়ে সে তাকিয়ে থাকে। এমন সময় পেছন থেকে তার কাঁধে কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে চমকে ফিরে তাকায়। পেছনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘদেহী এক পৌঢ়। ভগ্নস্বাস্থ্য। চোখে ভারি কাঁচের চশমা। লোকটি সাংবাদিকের কাঁধ থেকে হাত নামিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করে, সারা বাংলাদেশে এমন বধ্যভূমির সংখ্যা কতো জানেন? হঠাৎ এমন প্রশ্নে ফটো সাংবাদিক ভড়কে যায়। লোকটি মিটিমিটি হেসে বলে, জানতাম, বইলতে পাইরবেন না। দেশের মানুষের কাছে মুক্তিযুদ্ধ আইজ শুধু একটা কাহিনী মাত্র। জানেন, স্বাধীনতার পর এই বধ্যভূমির সন্ধান পায়া আমি নিজেই কষ্টেসিষ্টে এইডি বানায়ে রেইখেছি। স্তম্ভটি দেখিয়ে সে বলে চলে, থাকুক স্মৃতি হয়া, ইতিহাস হয়া। আমাদের ছেইলেপুলেরা তো অন্তত জানতে পাইরবে। নাকি?

ফটো সাংবাদিককে বোবার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে সে বলে, আজিবারের কাছে আপনার কথা শুনলাম। আমার নাম খলিল আহমেদ। গেরামের লোক খুকু বইললেই চেনে।

সাংবাদিক পেছন ফিরে পাগলির দিকে তাকায়।

: কাকে খুঁইজছেন? গেরিলা চাচিকে? নেই। চইলে গিয়েছে। তবে হ্যাঁ, আবার আইসবেন। উনি রোজই আসেন এখানে। উনার স্বামী-সন্তানের হাড়গোড় যে এই গর্তেই ছিল।

সাংবাদিকের চোখেমুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। খুকুরও গলা ধরে আসে। সে দৃঢ়তার সাথে বলে,

আপনেরা তো খবরের মানুষ। খবরের পেছনে ঘোরেন। কিন্তু যিডা জানেন না সিডা আমার কাছে শোনেন। দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা এই হালিমা কুদ্দুস কিন্তু তার স্বামী আর সন্তানের শোকে পাগল হওয়ার মানুষ নয়।

: তবে?

: পাগল হইয়েছে অন্য কারণে।

: কি কারণ, প্লিজ বলুন।

: নিজের অজান্তে এক রাজাকার আল বদরকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে।

: বলেন কি?

: হ্যাঁ। মনেপ্রাণে একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্যে ইডা সত্যি এক বিরাট হতাশার কারণ।

: সবকিছু একটু খোলাসা করে বলবেন প্লিজ?

: শোনেন তাহলি। আসলে সে পাগল হইয়েছে ঐ হাশেম রাজাকার-আলবদরের জন্যি।

: মানে?

: দেশ স্বাধীন হওয়ার সপ্তা খানেকের মধ্যি তার সেজো বোনের ছেইলে হাশেম বেড়াতে আসার নাম কইরে তার কাছে এসে ওঠে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। পড়াশুনায় খুব নাম। খালাও তাকে স্নেহ করেন খুব। ছোটবেলা থিকিই সে খালার কাছে আসা যাওয়া করতো। কিন্তু এবার তো আর তার বেড়ানো শেষ হয় না। হালিমা চাচি মুখ ফুইটে কিছু বলতিও পারে না। গেরামের সবাই জানে, তার খুব দয়ার শরীর। আপন-পর সকলের জন্যি সে যখন যা পারে করে। নিজে না খায়া অন্যকে খাওয়ায়ে সে খুশি হয়। এমন সময় ঢাকা থিকি একদল মানুষ আইসে হাজির। তাদের অভিযোগ, হাশেম আল বদরের সদস্য এবং সে যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকা-ের সাথে সরাসরি জড়িত তার বিস্তর প্রমাণ তাদের হাতে আছে। ব্যস আর কী। হাশেমকে তুইলে নিয়ে যাওয়ার সময় হালিমা চাচিকে তারা শাসিয়ে গেল এই বইলে, ‘ছিঃ ছিঃ আপনি না এত বীরত্বের সাথে মুক্তিযুদ্ধ কইরেছেন। আপনি না মুক্তিযুদ্ধে স্বামী-সন্তান সবকিছু হারায়েছেন। আর শেষে কিনা এই আলবদরকে আশ্রয় দিয়ে রেইখেছেন?’ এইসব কথা শুইনে হালিমা চাচির মুখ তো হা। তার স্নেহের হাশেম যে এই জিনিস তা সে স্বপ্নেও ধারণা কইরতে পারেনি। আর জানেন, সেই থিকি গেরিলা চাচির মাথাডা খারাপ হতি শুরু কইরলো। আর এখনকার অবস্থা তো নিজের চোখেই দেখতি পাচ্ছেন।

খুকুর মুখে এসব কথা শুনতে শুনতে সাংবাদিক যন্ত্রণাকাতর চোখে মাটির দিকে তাকায়। খুকু তাকে জিজ্ঞেস করে,

তা আপনার বাঁ হাতের এ অবস্থা ক্যান?

সাংবাদিক সম্বিৎ ফিরে পায়। কিছুক্ষণ খুকুর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলে,

সেই ছোটবেলায় আমিও আপনাদের মতো মুক্তিযুদ্ধের কাজ করতে গিয়েছিলাম। আমাদের বাড়িতে মিলিটারির আক্রমণ হয়। গোলাগুলিতে আমার মা-বাবা দু’জনই মারা যান। আমি কোনোমতে প্রাণে বেঁচে গেলেও গুলি লেগে এই হাতটা -

খুকু হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,

ব্যস ব্যস বুইঝেছি। একই পথের পথিক। দেইখছেন না আমার চোখটার কি অবস্থা? মর্টারের স্প্রিন্টার, বুইঝলেন।

একসময় ঝোপের ভেতর থেকে দু’জন বেরিয়ে যায়।

বুধবারের ঘটনা। সাপ্তাহিক হাটের দিন। উৎসুক হাটুরেরা রেলস্টেশনের ডেরায় পাগলিকে দেখার জন্যে দূরে ভিড় জমিয়েছে। পাগলি তার পোটলার জিনিসপত্র একটা একটা করে বের করে চোখের সামনে ধরে তন্ময় হয়ে দেখছে। সাংবাদিক চুপিচুপি একপা দুপা করে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যায়। পাগলি এটা সেটার পরে বের করে এক কিশোরের শার্ট, প্যান্ট, জুতা। শার্টটা মাটিতে বিছিয়ে ইস্ত্রী করার মতো করে তার ওপর পাথর ঘষতে থাকে। সাংবাদিকের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। এই শার্ট প্যান্ট জুতো কার? তারই ছেলে আলোর? একদিন বীরুর শার্ট-প্যান্টও তো তার বড়মা এইভাবে ইস্ত্রী করে দিতো। ভয়ের দেয়াল ভেঙ্গে যায়। সে অস্ফুট কণ্ঠে ডাক দিয়ে বসে,

বড় মা।

হালিমা কুদ্দুস মুখ তুলে চোখ বড় করে এদিক ওদিক তাকায়। সাংবাদিক এবার আরও জোরে ডাক দেয়,

বড় মা।

হালিমা কুদ্দুস তার উপর চোখ রেখে বিড় বিড় করে,

বড় মা!

সাংবাদিক বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে,

বড়মা, আমি বীরু। আমি তোমার বীরু, বড়মা। সে হু হু করে কাঁদতে থাকে।

বীরুর বড়মা এবার দু’হাতে বীরুকে বুকে টেনে নিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,

বীরুরে! ওরে বীরু, তোরা আজ কোথায়?

বীরু কোনো উত্তর দিতে পারে না। শুধু দু’জন দু’জনকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কাঁদতে থাকে।

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫

২৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: