কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

একজন রাজনৈতিক নেতার মেনিফেস্টো

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫
  • মুহাম্মদ সামাদ

[কবি মুহাম্মদ সামাদ-এর একজন রাজনৈতিক নেতার মেনিফেন্টো কবিতাটি ১৯৭৯-১৯৮০ সালে সামরিক শাসক জেনারেল জিয়ার শাসনামল বিবৃত করে রচিত হয়েছিল। কবিতাটি হিন্দী-ইংরেজী ছাড়াও ২০১৩ সালে গোথেনবার্গ বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত বাংলা ভাষার কবিদের কবিতা সঙ্কলনে সুইডিশ ভাষায় অনুদিত হয়েছে। বর্তমানের কুৎসিৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কবিতাটির প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে দৈনিক জনকণ্ঠ-এ মুদ্রিত হলো]

না

মার্কস

লেনিন

মাও

গান্ধী

ভাসানী

বঙ্গবন্ধু’র মতো নয়

তাঁরা তো মানুষের জন্য রাজনীতি করতেন।

দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা

আকাশ পাতাল সামাজিক বৈষম্য

দেউলিয়া অর্থনীতি

কপর্দকহীন রাজকোষ

অপসংস্কৃতির বাঁধভাঙা ঢল

নৈতিক অবক্ষয়ের গড্ডলিকা প্রবাহ

যার সঙ্গে আপনারা ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ত, যেমন

বাষ্প কিংবা মেঘের মধ্যে জল।

এসব নিয়ে দারুণ উৎকণ্ঠায় কাটছে দিন আমার;

আমি আপনাদের একজন জনদরদী মহান নেতা

আপনাদের হাততালি

জিন্দাবাদ

প্রাণঢালা ভালোবাসা

এবং রক্তিম অভিনন্দন থেকে

একবিন্দুও বঞ্চিত হতে চাই না।

কারণ, বঞ্চিত জনগণই আমার রাজনীতির মূল অনুপ্রেরণা

এবং ক্ষমতার উৎস।

অন্যেরাও বলবে একই কথা জানি।

তাছাড়া কিছু বেজন্মা বুদ্ধিজীবী বেশ্যা, শহরের সেরা

কিছু পেশাদার পাণ্ডা আর গ্রাম্য টাউটের হাতে

টাকার বান্ডিল ছুড়ে দিলে

একমাত্র আপনারাই আমার নামে আজীবন জিন্দাবাদ দেবেন;

আজন্ম সংগ্রামী জননেতা শিরোনামে

ছাপা হবে পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় আমার বিপ্লবী ছবি-

এর চেয়ে একজন নেতার জীবনের কিইবা

বেশি প্রত্যাশা থাকতে পারে বলুন?

সমবেত সংগ্রামী সাথী ও বন্ধুরা

তবুÑ

ঘাতকের নির্মম বুলেটে বজ্রকণ্ঠ স্তব্ধ হোক

সবংশে নিশ্চিহ্ন হোক স্বাধীনতার মহান স্থপতি

শান্তিপূর্ণ মিছিলে অবৈধ অস্ত্রের ব্যারেল থেকে ঝরুক বুলেটের ঝাঁক

দুখিনীর বুকের মানিক ঢলে পড়ুক কালো রাজপথে

আইনের অন্যায় ষড়যন্ত্রে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুদণ্ড হোক

পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান জেলের অভ্যন্তরে

নৃশংস হত্যা হোক রাজবন্দীদের।

অনশন চলুকÑ কারাগার হোক বিক্ষোভের জ্বলন্ত অগ্নিগিরি

গর্জে উঠুক পুলিশের রাইফেল

নির্বিচারে নিরীহ বন্দীরা নেতিয়ে পড়ুক চিরতরে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উস্কানির আখড়া হোক

জনসভায় বোমা মেরে কল্যাণের রাজনীতি শুরু হোক নতুন স্টাইলে

কালনাগিনীরা বিষাক্ত ফণা তুলে উঠে আসুক রাজনৈতিক মঞ্চে

সৈনিকের সক্রিয় রাজনীতির খায়েশ দৃঢ়মূল হোক

ঘন ঘন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটুক

প্রয়াত প্রেসিডেন্টের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে যাক।

দেশের সমস্ত শিল্প-প্রতিষ্ঠান আর্তচিৎকারে ফিরে যাক

কসাই মালিকের ঘরে

শ্রমিকেরা বিক্ষুব্ধ হোক

উৎপাদন ব্যাহত হোক জরুরী পণ্যের।

হাসপাতালে হ্যারিকেন জ্বেলে অস্ত্রোপচার চলুক মুমূর্ষু রোগীর

ডাক্তাররা ধর্মঘটে যাক

নার্সরা সেবার হাত গুটিয়ে নিক

বসন্তের কোকিলের কণ্ঠ কর্কশ হোক।

প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যাক টাকার প্রয়োজনে

সম্মানিত অধ্যাপক লাঞ্ছিত হোক ছাত্রের হাতে

অভিভাবকের নির্মম প্রহারে অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু হোক

নিরীহ শিক্ষকের;

হল-হোস্টেলগুলো অবৈধ অস্ত্রের ভাণ্ডার হোক

সন্ত্রাসের রাজত্ব হোক রাজনীতির নাম।

স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চিরতরে ঝুলে যাক

সিলমারা প্রকাণ্ড তালা।

চোরাপথে অজস্র সম্পদ পাচার হোক

দক্ষ জনশক্তি দেদার চালান হোক বিদেশে

সরকারের পররাষ্ট্র নীতি আরও নতজানু হোকÑ

আমাদের প্রতিনিধিদল কিছুটা সময় নগ্ন যুবতীর দেহে

রৌদ্রস্নানে কাটিয়ে আসুক বিদেশী সাগর সৈকতে।

প্রচার মাশ্যমগুলো ক্ষমতাসীনদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হোক

রাতারাতি অগ্রগতির বানোয়াট পরিসংখ্যানে ছেয়ে যাক দৈনিকের পাতা।

এক টুকরো কাগজ আর কলমে সম্পদশালী

সাহসী সাংবাদিকের বুক ঝাঁজরা হোক আততায়ীর ব্রাশ ফায়ারে

বৃদ্ধিজীবীরা বুদ্ধির মাথা খেয়ে নির্বোধ হোক

আতঙ্কে থেমে যাক লেখকের প্রতিবাদী কলম

শিল্পীরা ‘মানুষ’ -এর ছবি বদলে রমণীর নগ্ন-শরীরে

দিক তুলির উত্তপ্ত আঁচড়।

আধুনিক ছ্যাঁচড়া কবি গাঁগায় টান দিয়ে

রঙিন স্বপ্নে বিভোর হোক

সাহিত্যে অশ্লীল শব্দের অবাধ আমদানি শুল্কমুক্ত হোক।

লালফিতার একটানা দৌরাত্ম্যে প্রশাসন শিথিল হোক

কর্মচারীরা বেপরোয়া ঘুষখোর দুর্নীতিবাজ হোক

প্রকৌশলীরা অসৎ হোক

অট্টালিকা দালানকোঠা স্বল্পায়ু হোক

ব্রিজ-সেতু দরদর ভেঙে যাক

আইন ব্যবসার নামে অর্থলোভে

উকিল-ম্যাজিস্ট্রেটের মধ্যে অন্যায় চুক্তি হোক-

আমার গরিব বাবা ভিটেমাটি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হোক।

দেশের সমস্ত নদ-নদী ভরাট হোক

বন্যায় তলিয়ে যাক ভিটে

সবুজ শস্যের সমারোহ বিলীন হোক ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাসে।

নরনারী বিবস্ত্র হোক

কৃষকের গোয়াল শূন্য হোক

পুকুর শুকিয়ে চৌচির হোক

দীর্ঘস্থায়ী খরায় শ্যামল শস্যের মাঠ

পুড়ে ছারখার হয়ে যাক।

অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে শীতল মৃত্যুর মুখোমুখি হোক

গ্রামের সরল মানুষ

অপুষ্টিতে হাজারো নিষ্পাপ শিশুর অপমৃত্যু হোকÑ

অর্থাৎ

প্রভু যিশু ক্রুশবিদ্ধ হোক না-ফরাতে সাধ।

যৌতুকের যাঁতাকলে সুন্দরী গৃহবধূ গলাকাটা লাশ হোক।

ক্ষমাহীন ক্ষুধার তাড়নায় অবগুণ্ঠিতা বোন বেশ্যা হোক

কন্যাদায়গ্রস্ত আমার হতাশ পিতা ফাঁসিতে ঝুলুক।

লাগামহীন কাগজীনোটের প্রচলনে

বাজারে মুদ্রাস্ফীতি আসুক

দ্রব্যমূল্যের লেলিহান শিখায় দাউদাউ জ্বলে যাক

বৃদ্ধ বাবার পেনশনের ফান্ড।

বিয়ের স্মৃতিমাখা মায়ের গহনা বন্ধক থাকুক

টাউট মহাজনের হাতে।

বেকার যুবক ডাকাত হোক

ছিনতাই হাইজ্যাক হোক সদাই নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার,

যানবাহন দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মাথামু-ু থেঁতলে যাক

মর্মান্তিক সলিল সমাধি হোক অসংখ্য মানুষের।

অফিসার্স ক্লাবে বউ বদ্লাবদ্লি করে মনোরম নিশি ভোর হোক

বিদেশী মদের মদির সুবাসে নূহের প্লাবনের মতো ভরে যাক

সারাটা শহর।

হোটেলের আলো ঝলমল রঙিন ক্যাবারে

নাচুক উদোম উর্বশী।

অভিজাত গৃহিণীর রতিক্রিয়া শুরু হোক চাকরের সাথে।

বিভিন্ন শহরের তথাকথিত অভিজাত এলাকায়

রাতারাতি গজিয়ে উঠুক বিলাসবহুল একতলা বাড়ি

ধনীর দুলালীর মুখ সৌন্দর্যে রাঙা হোক গরিবের রক্তে।

বিদেশী ক্রাইমছবি পর্নোগ্রাফি ভিসিআর ব্লু-ফিল্মে

চুমু খাক অপ্রাপ্ত কিশোর-কিশোরী।

বিকিনি পরে কলকল জলে গোলাপী নরম বুক

ঘন কুয়াশার মতো প্রশস্ত মসৃণ গ্রীবা এবং নদীর মতোন

পেলব উরু সুইমিং শিখুক।

দেশের মূর্খ মন্ত্রীরা

অনাহারী মানুষের মুখে প্রস্রাব করে দিয়ে

মহাসমারোহে

জাতীয় কুকুর প্রদর্শনীর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করুক।

প্রতিটি পদক্ষেপেরই তীব্র নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছি

একটি ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের কথা বহুবার বলেছি

আপনারা বিশ্বাস করুন

এইসব গর্হিত সামাজিক কর্মকাণ্ড

অনাচার অত্যাচারের বিরুদ্ধে মৃত্যুপণ আজন্ম লালিত

আমার সংগ্রাম।

তবে, আমি চাইÑ

আমার সন্তানেরা কিন্ডারগার্টেনে পড়বে

আমার লোকেরা মঞ্চ তৈরি করবেÑ

আপনারা যাদের চাম্চা বলেন;

আমি গাড়ি করে গিয়ে সরকার উৎখাতের

জ্বালাময়ী বক্তৃতায় উপস্থিত জনতার

সব হাততালি কুড়াবো একাই।

মফস্বলে সাংগঠনিক সফরে গেলে

রিজার্ভেশন কিংবা বিমানই আরামদায়ক জার্নি;

খাবারের মেনুটা অবশ্যই এলাকার নেতার কাছে

জানিয়ে দেবে আমার ব্যক্তিগত বাবুর্চি আব্দুল।

আমার নামে সেøাগান উঠবে

... তুমি এগিয়ে চলো ... আমরা আছি ...

কতোটুকু এগোবোÑ সীমারেখা সম্পর্কেও আমি অত্যন্ত সতর্ক

কারণ,

গান্ধী আলেন্দে লুমুম্বা বঙ্গবন্দু’র বুকে

বুলেট বিস্ফোরণের ভয়ঙ্কর শব্দে

আমি আজও আতঙ্কে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ি।

দেশ ও জাতির এই দুর্যোগময় মুহূর্তে

আমি আপনাদের শুধু মিষ্টি কথার জোর আশ্বাসের ফুলঝুরি

এবং

জ্বালাময়ী বক্তৃতার ফেনায়িত সমুদ্র উপহার দিতে পারি।

পঙ্গু দুর্বল কাতর অনাহারী জীর্ণশীর্ণ বুঝি না

সমবেত সংগ্রামী সাথী ও বন্ধুরা

আমি আপনাদের সকলের সক্রিয় সহযোগিতা, জিন্দাবাদ

এবং তুমু-উ-ল হাততালি চাই।

আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ

বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

প্রকাশিত : ২৩ জানুয়ারী ২০১৫

২৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: