রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এসএসসি শিক্ষাজীবনের পরবর্তী দ্বার উন্মোচন করে

প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারী ২০১৫
  • অধ্যাপক আনিসুজ্জামান
  • শিক্ষাবিদ, গবেষক

আমি সব সময় স্মৃতিকাতর। যে কোন সুখময় স্মৃতি কিংবা দুঃখের স্মৃতি দ্বারা আমি তাড়িত হই। স্মৃতি যেমন মানুষকে বেদনাহত করে তেমনি আবার এই স্মৃতিই কখনও কখনও মানুষকে প্রবলভাবে উদ্দীপিত করে তোলে। তবে ছোটবেলার স্মৃতি এখনও আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। বিশেষ করে স্কুল জীবনের স্মৃতি কখনও ভোলার নয়। আমি মনে করি, ছোটবেলার যে কোন স্মৃতিই মানুষকে নতুন স্বপ্নে মানে নতুন করে বেঁচে উঠবার প্রেরণা যোগায়। স্কুলজীবন আমার শ্রেষ্ঠ সময়। স্কুলের বন্ধুদের মুখ এখনও স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে- আর তখন আপনাআপনি ফিরে যাই ছোট্ট বেলায়।

আমাদের ছোট্টবেলায় পড়াশোনার বিষয়টি ছিল খুব শাসনের মধ্যে। বাড়ির বড়রা খুব যে শাসন করত তা নয় তবে পড়ার সময় ফাঁকি দিলে বড়দের শাসনের বেড়াজালে আটকে যেতে হতো। আমাদের সময় পড়াশোনার বিষয়ে আজকের দিনের মতো এত গাদা গাদা বই-পত্তর ছিল না, ছিল না কোচিং, ছিল না গাইড বইয়ের বিস্তর ছড়াছড়ি। স্কুলে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকদের পড়ানোটাই ছিল আসল। একটা পড়া একবার না পারলে কিংবা না বুঝলে শিক্ষকরা সেটা বার বার বিভিন্ন কায়দায় সহজ করে আমাদের শিখিয়ে দিতেন, বুঝিয়ে দিতেন। শ্রেণীকক্ষের বাইরে ঘরে কিছুটা সময় পড়াশোনা করলেই মিলত কাক্সিক্ষত ফলাফল। আর কাক্সিক্ষত ফলাফল পেলে মা-বাবা অভিভাবকদের হাসিমাখা মুখ তৃপ্তির ষোলো আনায় পরিপূর্ণ মুখ দেখা যেত। পরীক্ষায় সন্তানের ভাল ফলাফলে মা-বাবার চেয়ে কে বেশি খুশি হয় এই দুনিয়ায়!

সময়ের পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক গুণগত পরিবর্তন এসেছে। বিশ্ব পরিস্থিতিও এই পরিবর্তনের জন্য ঈষৎ দায়ী। তবে শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন সময়ের দাবি এটাকে মেনে নিয়েই আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমানে শিক্ষার যে গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তা মেধাবিকাশে যথাযথ ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্বাস করি। মুখস্থ বিদ্যার প্রতি ভয়ানকভাবে অভ্যস্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা থেকে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের বের করে আনা এবং সমসাময়িক পৃথিবীর বিবিধ বিষয়ের প্রতি তার আগ্রহ ও জানার পরিধিকে বিস্তৃত করতে নানা পদ্ধতির প্রয়োগ হচ্ছেÑ এটা বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে। আজকের শিশু কিশোরদের আগামী দিনের নেতৃত্ব দিতে হবে। আর এই নেতৃত্ব দেয়ার বিষয়টি তখনই কার্যকর হবে, যখন সে সঠিকভাবে মানে সঠিক জ্ঞানে, বুদ্ধিতে, মেধায় বড় হয়ে উঠবে।

স্বাধীনতার পর আমরা যে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম, তা নানা কারণে নানা ষড়যন্ত্রে থমকে গিয়েছিল। বিশেষ করে পঁচাত্তরে জাতির জনককে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে দেশকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল উল্টোপথে। পঁচাত্তরের ষড়যন্ত্রকারীরা একাত্তরের পরাজিত শক্তির আদর্শ ও চেতনাকে বাংলার মাটিতে পুনরুজ্জীবিত করার হীন প্রচেষ্টায় মেতে উঠেছিল। তারা ইতিহাসকে বিকৃত করে সংবিধানের মূল চেতনা থেকে সরিয়ে জাতিকে এক অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের সামনে বিকৃত তথ্য সংবলিত শিক্ষার উপকরণ তুলে দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্তির আঁচলে নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মমÑ সত্য বড় কঠিন। সত্যের জয় হবেই বিলম্বে হলেও জাতি ইতিহাস বিকৃতিকারীদের হাত থেকে রেহাই পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের বিপুল বিজয় বিকৃত তথ্যের হাত থেকে দেশকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির এ সরকার শিক্ষাব্যবস্থার যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে তুলে দিয়েছে প্রকৃত সত্য। বিশেষ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের শুরুতেই বিনামূল্যে সঠিক ইতিহাস সংবলিত বই তুলে দিয়ে তাদের শিক্ষাকে নিশ্চিত করেছে। এ বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে প্রায় ৩২ কোটি বই তুলে দিয়ে এ সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে পৃথিবীতে অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন পদ্ধতি স্থাপন করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক নতুন ধরনের প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এ সরকার। একজন শিক্ষার্থীকে পরিপূর্ণ মনোযোগের সঙ্গে পিএসসি, জেএসসির পর ক্রমান্বয়ে তাকে এসএসসির মুখোমুখি হতে হবে। এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার আগে একজন শিক্ষার্থীকে প্রাক প্রস্তুতি দিতে হবে। আর এ জন্যই তাকে বিশেষভাবে পিএসসি ও জেএসসিতে ছাত্রত্ব দেখাতে হবে, অর্থাৎ এসএসসি পরীক্ষায় যাওয়ার আগে শিক্ষার্থীকে ভাল করে তৈরি করিয়ে দিতেই এই ব্যবস্থা। আমি মনে করি এটা নিঃসন্দেহে ভাল উদ্যোগ।

এ বছর যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে, তাদের ওপর আমার অনেক ভরসা, অনেক আশা। সঠিকভাবে নিজেদের জীবনকে সাজাতে হলে এই পরীক্ষার কোন তুলনা নেই। একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত জীবনের শুরুই হয় এই পরীক্ষার মাধ্যমে। আমি বিষয়টিকে এভাবে দেখার প্রয়াস পাই, একজন শিক্ষার্থী ভালভাবে এসএসসি পরীক্ষার মাধ্যমে তার পরবর্তী শিক্ষা জীবনের ধাপগুলো অতিক্রম করে। অন্যভাবে বললে বলা যায়, এসএসসি একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অপরাপর সাফল্যের দ্বারকে উন্মোচন করে। তবে একটি কথা, সবাই যে এসএসসি পরীক্ষায় চোখ ধাঁধানো সাফল্য দেখাতে সমর্থ হবে, এটা নাও হতে পারে। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য আমার পরামর্শ হলো, এ পরীক্ষায় কেউ হয়ত সাফল্যের শতভাগ ঘরে তুলবে, আবার কেউ হয়ত তা নাও পেতে পারে। তাই বলে হাল ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না। জীবনে সাফল্য নির্ভর করে দেশপ্রেম, পড়াশোনা, নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায় আর সততার ওপর। তোমরা তোমাদের জীবনে এ সবের প্রাধান্য দিলে আমি নিশ্চিত, তোমাদের জীবনে সাফল্য ধরা দেবেই।

তোমাদের জন্য আমার আর একটি কথা, স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে কখনও কোন বিষয়ে আপোস করবে না। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু- এই তিন বিষয়ে কখনও প্রকৃত সত্য থেকে বিচ্যুত হবে না। এই তিন সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে মিথ্যেকে গ্রহণ করা। আর মিথ্যে তথ্য, মিথ্যে ইতিহাস গ্রহণ করে কেউ কখনও কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। তোমরা আগামী দিনে সত্য ইতিহাস বুকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাও- এই আমার প্রত্যাশা।

প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারী ২০১৫

২২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: