আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জীবন্ত কিংবদন্তির মুখোমুখি

প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারী ২০১৫
জীবন্ত কিংবদন্তির মুখোমুখি

জনকণ্ঠের পক্ষ থেকে আপনাকে অগ্রিম জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

জনকণ্ঠ পরিবার এবং আমার সকল ভক্ত দর্শক, চলচ্চিত্র পরিবারসহ সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আমার জন্য সবাই দোয়া করবেন যেন সুস্থ থাকি, ভাল থাকি।

কোন বিশেষ পরিকল্পনা আছে কী এই দিনে?

গতকালই কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরেছি। জন্মদিনের আগেই সপরিবারের নিজের জন্মস্থান ঘুরে এলাম। তাই বেশ ভাললাগছে। এখন আসলে বয়স হয়েছে। সুস্থ থাকাটাই হচ্ছে এখন আসলে জরুরী। সবার কাছে দোয়া চাই যেন সুস্থ থাকি, ভাল থাকি। সবার জন্য আমারও শুভ কামনা থাকবে যেন সবাই সবসময় ভাল থাকেন। সেই সঙ্গে আমাদের দেশের ছবি যেন দেখেন। মাঝে যদিও কিছুটা খারাপ সময় গেছে। কিন্তু এখন পরিবেশ বদলে গেছে। এখন অনেক ভাল ভাল ছবি হচ্ছে। দর্শক যেন হলে গিয়ে ছবি দেখেন এটা আমার বিশেষ অনুরোধ থাকবে। দর্শক হলে গেলেই আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গন আবারও তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। এবারের জন্মদিনে তেমন কোন বিশেষ আয়োজন থাকছে না। একেবারেই ঘরোয়াভাবে দিনটি পার করব।

অনেকদিন নতুন কোন চলচ্চিত্রে আপনাকে দেখা যাচ্ছে না?

শরীরটা আসলে আগের মতো সায় দিচ্ছে না চলচ্চিত্রে কাজ করার। তাছাড়া ডাক্তারেরও নিষেধ আছে বেশি কষ্ট না করার। পরিবারের সদস্যরাও চাইছে না আগের মতো টানা কাজ করি। তাই এখন বলা যায় এক ধরনের বিশ্রামেই আছি। সর্বশেষ বাপ্পার নির্দেশনায় ‘কার্তুজ’ চলচ্চিত্রে কাজ করেছি। এতে আমার বন্ধু চাষী নজরুল ইসলামও অভিনয় করেছিলেন। চলচ্চিত্রটি আসছে মার্চ মাসে মুক্তি পাবে। সবাইকে দেখার আমন্ত্রণ রইল।

সর্বশেষ তো ‘আয়না কাহিনী’ নির্মাণ করেছিলেন?

হ্যাঁ, ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় আয়না কাহিনীই ছিল আমার নির্দেশনায় নির্মিত শেষ চলচ্চিত্র। এরপর আর নতুন কোন চলচ্চিত্র নির্মাণের কোন পরিকল্পনা নেই। তবে ভাল গল্পের চলচ্চিত্রে কাজ করার অফার পেলে অভিনয় করতে পারি। আসলে এখনকার চলচ্চিত্রের গল্পে মৌলিক বিষয়টি একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছে। মৌলিক গল্প লেখার কাহিনীকারের খুবই অভাব।

শুনেছি খেলাধুলার প্রতি ভীষণ ঝোক ছিল আপনার?

ছোট বেলায় খুব ডানপিঠে স্বভাবের ছিলাম আমি। সারা দিন দুষ্টুমি করে ঘুরে বেড়ানোই ছিল যেন আমার প্রধান কাজ। আর ফুটবল খেলা। এলাকায় গোলকিপার হিসেবে আমার বেশ সুনামও ছিল।

খেলোয়াড় থেকে অভিনেতা হওয়ার গল্পটা জানতে চাই

তখন কলকাতায় ফুটবলের দারুণ উন্মাদনা। ফুটবলাররা উত্তম কুমারের মতো জনপ্রিয়। আমার ধ্যানজ্ঞান ছিল ফুটবলকে ঘিরে। তখন গোলরক্ষক হিসেবে দেশের মধ্যে আমি খুব সম্ভাবনাময় বলে পরিচিতি পেয়েছি। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় আমার অভিনয় জীবনের মাহেন্দ্রক্ষণ আসে। আমি কলকাতার খানপুর হাইস্কুলে পড়তাম। প্রতি বছর সরস্বতী পূজার সময় নাটক মঞ্চস্থ হতো। স্কুলের নিজস্ব মঞ্চ ছিল। গেমটিচার রবীন্দ্র নাথ চক্রবর্তী আমাকে বেছে নেন নায়ক অর্থাৎ কেন্দ্রীয় চরিত্রে। শিশু কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক বিদ্রোহী। আমার চরিত্র ছিল নানারকম সামাজিক কর্মকা-ে শিশু-কিশোরদের নেতৃত্ব দেয়া গ্রামীণ কিশোর। এই নাটকে আমার অভিনয় প্রশংসিত হওয়ার পর ঝোঁক আসে অভিনয়ের প্রতি।

এরপর কি হলো?

বিদ্রোহী নাটকে কাজ করার পর আমার নাট্যগুরু পীযুষ তার শিশু রঙ্গসভায় আমাকে সদস্য করে নেন। তারপর শুরু হয় তার একের পর এক অভিনয় করে চলা।

খেলাধুলায় ইস্তফা দিলেন কবে?

খানপুর হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাস করার পর চারুচন্দ্র কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই আমি। খেলার পাশাপাশি অভিনয়েও ব্যস্ত হয়ে উঠি। পীযুষ বোসের বিভিন্ন নাটকে নিয়মিত অভিনয় শুরু করলাম। তাদের রঙ্গসভায় নিয়মিত নাট্যকর্মী হয়ে যাই আমি। চেহারা ভাল হওয়ায় বরাবর নায়কের চরিত্রে কাজ করার সুযোগ পেতাম আমি। অভিনয় আর পারিবারিক ব্যবসায় ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার কারণে খেলাধুলায় ইস্তফা দিতে হয় আমাকে।

চলচ্চিত্রের সঙ্গে আপনার সম্পৃক্ততা কিভাবে?

টালিগঞ্জের ফিল্মপাড়া আর আমাদের বাড়ি একই জায়গায়। ছোট বেলা থেকেই কানন দেবী, বসন্ত চৌধুরী, ছবি বিশ্বাসদের দেখে দেখে বড় হয়েছি আমি। তাদের জনপ্রিয়তায় মুগ্ধ হয়ে আমিও মনে মনে ভাবতাম ‘একদিন আমি তাদের মতো বড় অভিনেতা হবো।’ টালিগঞ্জের বড় বড় স্টুডিও ছিল আমাদেরই এলাকায়। সেখানে নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমার। সেখানে আড্ডাও দিতাম আমি। নাট্যগুরু পীযুষ বোস পরে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে বিখ্যাত হন। তার সঙ্গে আড্ডা দিতে টালিগঞ্জ স্টুডিওতে যেতাম। এভাবে যেতে যেতে ছবিতে ছোটখাটো কিছু চরিত্রে অভিনয়ও করে ফেললাম। বড় বড় অভিনেতাদের ভিড়ে তখন অভিনয়ে তেমন সুযোগ পাওয়া যেত না। কিন্তু মনে মনে আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, অভিনেতা আমাকে হতেই হবে। বোম্বে যাব, এমন কিছু ভাবছিলেন তখন। এদিকে আমার গুরুও না করলেন ছোটখাটো কোন চরিত্র অভিনয় করতে।

ঢাকায় আসার পর তো আপনি অনেক নাটকে অভিনয় করেছেন?

ঢাকায় আসার পরও অসংখ্য নাটকে অভিনয় করেছি আমি। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে তিনি ৫০টিরও বেশি নাটকে অভিনয় করেছি। আমারই বন্ধু জহিরুল হক, খান জয়নুল, খসরু, নোমান, আলী ইমাম, আলতাফ হোসেনের পরিচালনায় নাটকে অভিনয় করেছি। মজিবুর রহমান মজনু নামের আরেক বন্ধু ছিল আমার। তিনিও নাটক পরিচালনা করতেন। পরে অবশ্য আমারর অনুরোধে ছবি প্রযোজনায় আসেন। মানিকগঞ্জের আজহার নাটক পরিচালক হিসেবে বেশ মেধাবী ছিল।

নায়ক হিসেবে চলচ্চিত্রে আপনার অভিষেক হলো ‘বেহুলা’ ছবির মাধ্যমে?

জহির রায়হান তার দেয়া আশ্বাস অনুযায়ী তিনি আমাকে ‘বেহুলা’ ছবিতে সুচন্দার বিপরীতে নায়ক হিসেবে কাস্ট করেন। ছবির কাজ শেষ হলো। মুক্তিও পেল। ব্যবসা সফল হলো সে ছবি।

সেই সময়কার কথা মনে পড়ে?

সে কথা আজীবন মনে থাকবে। যেহেতু এটা ছিল আমার প্রথম ছবি। তাই টেনশনও ছিল। ভীষণ। মুক্তির দু’তিনদিন আগে থেকে আমার চোখে কোন ঘুমই ছিল না। ছবি মুক্তি পেল। আমি বাসায় বসে ভাবছি। এর মধ্যে খবর এলো, জহির রায়হান ডাকছেন। ছুটে গেলাম স্টার সিনেমা হলে। দেখলাম লক্ষীন্দর রূপী আমাকে দর্শক গ্রহণ করেছে।

তারপরও তো একটা ভয় থেকে যায়, সেই ভয়টা কোন ছবির পর কেটে গেল?

সুচন্দা চলচ্চিত্র প্রযোজিত ‘দুই ভাই’ ছবিটিতে আমি অভিনয় করেছিলাম। এই ছবিতে আমার বিপরীতে ছিলেন ববিতা। ছবিটিতে অভিনয় করেছি মন উজাড় করে। আমার বিশ্বাস ছিল এই ছবিই আমাকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। ছবি মুক্তি পেল। তখন জহির ভাই থাকতেন পুরান ঢাকার কায়েৎটুলি। তার সেই বাসায় গেলাম। ছবির রেজাল্ট শুনলাম। তিনি আমাকে আদর করে বললেন, ‘যাও তুমি পার পেয়ে গেলে। আর কেউ রুখতে পারবে না তোমায়।’ জহির ভাইয়ের সেই কথা আজও কানে ভাসে যখন মনে হয় সেসব দিনের কথা।

অনেকেই তো আপনার মাঝে উত্তম কুমারের সাদৃশ্য খুঁজে পান, আপনার কি অভিমত?

আমার চেহারার মাঝে তখন কেউ কেউ মিল খুঁজে পেয়েছেন উত্তম কুমারের কিন্তু আমি সচেতনভাবে কখনও তাকে অনুকরণ করেননি। যদিও আমি তার অসম্ভব রকমের ভক্ত। শ্রদ্ধাও করি তাঁকে ভীষণ। কিন্তু তাকে অনুকরণ করার চেষ্টা করিনি। আমি আমার নিজস্ব স্টাইলেই অভিনয় করে এসেছি সারাটি জীবন।

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আপনিই সর্বাধিক নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করেছেন?

আসলে তখন তো একজনই রোমান্টিক হিরো ছিল। নায়িকা ছিল অনেকেই যেমন শাবানা, কবরী, সুচন্দা, কবিতা, ববিতা, সুজাতা। তো সবার সঙ্গে আমাকেই ছবিতে অভিনয় করতে হতো। যে কারণে আমি টানা কাজ করলেও অনেক সময় নায়িকাকে আমার সঙ্গে ছবিতে অভিনয়ের জন্য বসে থাকতে হতো পরবর্তী ছবির সিডিউলের জন্য। আমিও চেষ্টা করেছি প্রত্যেক প্রযোজকের মন রক্ষা করে চলতে। কারণ তখন তারা যদি ছবি প্রযোজনা না করতেন তাহলে তো এদেশে ছবির বাজারই সৃষ্টি হতো না।

প্রকাশিত : ২২ জানুয়ারী ২০১৫

২২/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: