মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘এক রুপী আয় ছিল অতি আনন্দের’

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫
  • এই আয়ের তীব্র আকাক্সক্ষাই ক্রিকেট দক্ষতা বাড়িয়েছিল

মোঃ মামুন রশীদ ॥ স্কুলপড়ুয়া কোন বালকের জন্য সবচেয়ে লোভনীয় কিছু কি হতে পারে? চকোলেট, মিষ্টি, ফাস্ট ফুড কিংবা কোন ফলের সুমিষ্ট পানীয়? হয়ত সবই। এজন্য শুধু দাবি করলেই চলে। বাবা-মা প্রস্তুত থাকেন ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় আগ্রহটা ধরে রাখার জন্য এ ছোটখাটো আবদার পূরণে। সেই সঙ্গে আনন্দের জন্য খেলনার দাবি পূরণেও। তবে শৈশবে শচীন টেন্ডুলকর কোন খেলনার দাবি করেননি, করেননি চকোলেট কিংবা ফাস্ট ফুড খেতে চাওয়ার দাবি। তবে দাবি ছিল খেলার এবং বাসনা ছিল কোমল পানীয় খাওয়ার। সেটাও কি ক্রিকেট খেলার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হওয়ার পর সম্ভব হতো ‘লিটল মাস্টার’ ও ভারতীয়দের চোখে ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ বনে যাওয়া শচীন রমেশ টেন্ডুলকরের? এ কারণেই বালক বয়সে যখন এক রুপী অর্জন করতেন তখন অপরিমেয় আনন্দ পেতেন। অথচ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরুর পর দেশ-বিদেশ থেকে অজস্র অর্থ কামিয়েছেন। সেটা একদিনে সম্ভব হয়নি। নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে ঘাম ঝরাতে হয়েছে, সইতে হয়েছে অনেক কষ্ট। দিনে দিনে কঠোর শ্রম দিয়ে সেই যোগ্যতা অর্জন করেছেন শচীন। সেই এক রুপী কামানোর তীব্র আকাক্সক্ষাই ক্রিকেট দক্ষতা বাড়িয়েছিল শচীনের। এর পেছনে আছে দারুণ এক চমকপ্রদ ঘটনা। শচীনের আত্মজীবনী থেকেই উঠে এসেছে সেই ঘটনা।

জীবনের প্রথম পরীক্ষাতেই ব্যর্থ শচীন। কারণ যে গুরুর কাছে পরীক্ষা সেই রমাকা- আচরেকার যমদূতের মতো খুব নিকটেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আচরেকার ছিলেন শারদাশ্রম বিদ্যামন্দির স্কুলের কোচ। মুম্বাইয়ের সবচেয়ে সফল আর ভাল কোচ হিসেবে বিবেচিত ছিলেন আচরেকার। তাঁর কোচিং স্কুলের ছাত্র বনে যাওয়া সহজ ছিল না। বড় ভাই অজিত টেন্ডুলকর তাঁর কাছেই নিয়ে যান শচীনকে। শারদাশ্রম বিদ্যামন্দির ক্রিকেট চর্চার জন্য ছিল মন্দিরতুল্য। শিবাজি পার্কে আচরেকার দুটি বয়সভিত্তিক গ্রুপে বিভক্ত করে অনুশীলন ক্যাম্প করাতেন। তেমনই এক গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে শচীনকে নিয়ে যান অজিত। দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে যে কেউ ক্রিকেট দক্ষতার পরীক্ষা দিতে পারতেন। আচরেকারই পরখ করে সিদ্ধান্ত নিতেন ক্যাম্পে কাকে নেয়া হবে। শচীনের ব্যাটিং সেশনটা একেবারে লেজেগোবরে ছিল। অজিতকে একাকী ডেকে আচরেকার বললেন, ‘আমার মনে হয় ওর বয়স অল্প। এ ক্যাম্পে আসার বয়সটা এখনও হয়নি তাঁর। আরও কিছুদিন পরে আনলেই ভাল হয়।’ হয়তো অঙ্কুরেই শেষ হয়ে যেত ক্রিকেট ইতিহাসে ভবিষ্যতের সর্বাধিক সেঞ্চুরিয়ানের ক্রিকেট স্বপ্ন! কিন্তু অজিত হাল ছাড়েননি, তিনি আচরেকারকে অনুরোধ করেন আরেকবার পরীক্ষা নিতে শচীনের। তিনি বলেছিলেন আচরেকার কাছাকাছি থাকার কারণেই অস্বস্তিতে ভাল করতে পারেননি শচীন। একটু দূরে দাঁড়ালেই যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবেন তিনি। দীর্ঘক্ষণ পর আরেকবার সুযোগটা দিলেন আচরেকার। এবার শচীন সন্তুষ্ট করতে পেরেছিলেন আচরেকারকে। তাঁকে গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে যোগ দেয়ার সুযোগ দিলেন।

শুরুটা এখান থেকেই। ৬৫ রুপী দিয়ে ভর্তির পর মাসে মাত্র ১০ রুপী করে দেয়া লাগত। সকাল ৭টা ৩০ থেকে ১০টা ৩০ পর্যন্ত প্রথম সেশনে অনুশীলন চলত। এরপর দুপুরের খাবার খেতে বাড়ি এসে নিজেই ধুয়ে ফেলতেন একমাত্র ক্রিকেট খেলার পোশাকটা। সেটা শুকিয়ে আবার সন্ধ্যার সেশনে (৫টা থেকে ৭টা) যোগ দিয়ে বাড়ি ফিরে রাতেও ধুয়ে ফেলতেন পরদিন পড়ে যাওয়ার জন্য। অনেক সময় ঠিকমতো না শুকালে সিক্ত কাপড়েই অনুশীলন করতে হয়েছে। শিবাজি পার্ক থেকে বান্দ্রায় বাড়ি ফিরতেই ৪০ মিনিট লেগে যেত বাসে করে। বসার সিট পেলে ঘুমিয়ে পড়তেন আর না পেলে দাঁড়িয়ে যেতে হতো। ঘর্মাক্ত ও নোংরা জামাকাপড়ের জন্য বাস কন্ডাক্টরের কাছে প্রতিদিনই ভর্ৎসনা শুনতে হতো এবং বাসগুলোও নিতে চাইত না। ক্রিকেট সরঞ্জাম নেয়ার ব্যাগের জন্য আলাদা জায়গা লাগত তাই দাঁড়িয়ে থাকলেও আলাদা টিকেট কাটতে বলা হতো তাঁকে। অথচ সেই অর্থটা তাঁর ছিল না সে সময়। তাই শেষ পর্যন্ত স্কুলও বদলাতে হলো। আসলেও ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যেত চান কিনা এমন প্রশ্ন করেছিলেন বাবা। শচীন তাঁর সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন বাবাকে-‘আমি ক্রিকেট খেলতে চাই।’

বান্দ্রার ইংলিশ স্কুল থেকে শারদাশ্রমে যোগ দিলেন শচীন। এর পরেই নিজের ক্রিকেট দক্ষতা বেড়ে গেল। আচরেকারও বিশেষ কিছু কৌশল রপ্ত করার অনুশীলন করিয়েছিলেন। ফলে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলার সুযোগও পেয়ে যান। আচরেকার বলতেন অনেক বড় অনুশীলনও ম্যাচ খেলার সমান নয় ক্রিকেট উন্নতির জন্য। কামাঠ মেমোরিয়াল ক্লাবের হয়ে প্রথম খেলতে নেমে ‘গোল্ডেন ডাক’ শচীন। পরের ম্যাচেও শূন্য। তৃতীয় ম্যাচে ৭ বলে ১ রান করেন। তবে স্কুল দলের হয়ে প্রথম ম্যাচে বেশ ভালই করেছিলেন। ২৪ রান। সে সময় ৩০ রান করতে পারলে স্থানীয় পত্রিকায় সেই ব্যাটসম্যানকে নিয়ে ছবিসহ খবর প্রচার হতো। ওই ম্যাচে অনেক অতিরিক্ত রান হওয়ায় স্কোরার অতিরিক্ত থেকে কেটে আরও ৬ রান যোগ করেন শচীনের অনুমতি নিয়ে তাঁর নামের সঙ্গে। পরদিন শচীনকে নিয়ে ছবিসহ খবর ছাপা দেখে আচরেকার রেগে গিয়েছিলেন। ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে ‘আর হবে না’- বলেছিলেন শচীন। ১৯৮৫ সালে মুম্বাই অনুর্ধ-১৫ দলের হয়ে পুনে খেলতে গিয়েছিলেন মাত্র ৯৫ রুপী নিয়ে। একটা ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়া শচীন রানআউট হয়ে যাওয়ার পর পরবর্তী ম্যাচে বাদ পড়েন। সঙ্গে কোন পয়সাও ছিল না, কারণ ফাস্ট ফুড খেয়ে আগেই শেষ করেছিলেন দলের পক্ষে খেলার জন্য পাওয়া ৯৫ রুপী। পরে শিবাজি পার্কে চাচার বাড়িয়ে দুটা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে হেঁটে ফিরেছিলেন। পশ্চিমাঞ্চল অনুর্ধ-১৫ দলে সুযোগ হয়নি সেটাই মূল কারণ এ কান্নার। তবে স্কুলের হয়ে নিয়মিতই খেলতেন আর এটাই তাঁর দক্ষতার বৃদ্ধি ঘটায়।

প্রথম বছর শারদাশ্রমে কেটে গেল। ৬০ দিনের গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে ৫৫টি প্রস্ততি ম্যাচ খেলেন শচীন। কোন কোন ম্যাচ শেষে সামান্য কিছু অর্থ দিতেন তাঁকে আচরেকার নাস্তার জন্য। আর বিকেলে শুরু হতো ব্যতিক্রমী অনুশীলন। ব্যাটসম্যানদের মনোসংযোগ বাড়ানোর অনুশীলন। ১৫ মিনিট করে ৫ সেশন নেটে ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেতেন শচীন। আচরেকার স্টাম্পের ওপর এক রুপীর মুদ্রা দিয়ে রাখতেন। ফিল্ডিংয়ে থাকত প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন। ৯০ গজ দূরে গিয়েও যদি ক্যাচ ধরা হতো সেটাও আউট বলে গণ্য হতো। তাই মাটি কামড়ে শট নেয়া ছাড়া উপায় ছিলনা। ক্যাম্পে থাকা ২০/৩০ জন বোলার বোলিং করতেন। যদি অপরাজিত থেকে কেউ সেশন শেষ করত তাহলে স্টাম্পের ওপরে রাখা এক রুপী তাঁর হয়ে যেত। এমন চ্যালেঞ্জ সামনে নিয়ে ব্যাট করাটা খুবই দুরূহ মনে হলেও পরে দারুণ উপভোগ করতে শুরু করেছিলেন শচীন। তাছাড়া এক রুপী কামিয়ে নেয়ার এমন সুযোগটাও ছাড়তে চাননি। সেটা জমিয়ে শিবাজি পার্কের অদূরে থাকা জুসের দোকান থেকে বেশ ব্যয়বহুল ফলের জুস কিনে খেতেন শচীন। মাঝে মাঝে তাঁর বাবা আসতেন তাঁকে নিতে। তখনও বাবার কাছে ওই জুস খাওয়ানোর আবদার করতেন তিনি। কিন্তু বড় ভাই ও এক বোন এবং সংসারের খরচা মিটিয়ে নিয়মিত এ ব্যয়বহুল জুস খাওয়ানো প্রায় অসম্ভবই ছিল শচীনের বাবার। তবু তিনি বালক শচীনের আবদার ফেলতেন না, খুশি করতেন ছেলেকে। এ কারণেই এক রুপী যেভাবেই হোক জিততেই হবে এমন একটি তাড়না কাজ করত শচীনের মনে। জমিয়ে জুস কিনে খাবেন। এই এক রুপী কামিয়ে নেয়ার তীব্র আকাক্সক্ষাটাই শচীনের ক্রিকেট উন্নয়নে বড় ভূমিকা রেখেছে। তাই এ বিষয়ে আত্মজীবনীতে শচীন লিখেছেন, ‘এক রুপী অর্জন করাটা ছিল আমার জন্য অতি আনন্দের। তাছাড়া এটা আমাকে শিক্ষা দিয়েছিল শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও কিভাবে সুস্থির ও মনোযোগী থেকে কোন কাজ সম্পন্ন করা যায়।’

তথ্যসূত্র- শচীন টেন্ডুলকরের আত্মজীবনী ‘

‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫

২১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: