আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ওয়ার্ল্ড কাপ ক্রিকেট-৭ ॥ রো ড টু মে ল বো র্ন

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫

প্রত্যেক দলের ১১তম বিশ্বকাপের খেলোয়াড়-কোচ-কর্মকর্তার নাম ঘোষণা করা হয়ে গেছে। যদিও নাম ঘোষণা নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকের অনেক প্রিয় খেলোয়াড় এবার বিশ্বকাপ দলে ঠাঁই না পাওয়ায় কেউ কেউ নাখোশ। প্রায় সব দলেই তরুণদের আধিক্য রয়েছে। অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন কম হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। যদিও সেটা বড় কথা নয়। মোদ্দা কথা, কাপ জেতাটাই আসল। কাপ জিততে পারলে দল নিয়ে ভাববার কারও অবকাশ থাকে না। এবারের বিশ্বকাপের পর্দা উঠবে ১৪ ফেব্রুয়ারি। পর্দা নামবে ২৯ মার্চ। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনায় আজ থাকছে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ নিয়ে আলোচনা। লর্ডস থেকে মেলবোর্ন। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ৪০ বছর। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ৪০ বছরের পথচলা নিয়ে আমাদের ধারাবাহিক আয়োজন ‘রোড টু মেলবোর্ন’। লিখেছেন : কথা সাহিত্যিক ও সাহিত্য সংগঠক : সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

লঙ্কানদের অপরাজিত শিরোপা জয়

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ষষ্ঠ আসর বসে ১৯৯৬ সালে। এবারে আবারও আয়োজনের দায়িত্ব দেয়া হলো ভারত-পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে। এ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সহ-আয়োজক হওয়ার সহজ সুযোগ ছিল। আইসিসি ট্রফির টপ থ্রিতে থাকতে পারলে বাংলাদেশের বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটার সুযোগ মিলত। আর বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করতে পারলে বাংলাদেশের বিশ্বকাপের আয়োজক হবার সৌভাগ্য ঘটতো আরও ১৫ বছর আগে। যেটা হয়েছে ২০১১ সালে সেটা হতে পারত ১৯৯৬ সালে। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের। তারা সেবার বিশ্বকাপের মূল পর্বে উঠতে ব্যর্থ হয়। ফলে আয়োজক হওয়ার সহজ সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যায়। এবারই এশিয়ায় বিশ্বকাপের প্রথম আয়োজন নয়। এর আগে ১৯৮৭ সালে প্রথমবার এশিয়ার ভারত-পাকিস্তান যৌথভাবে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আয়োজন করে। দু’একটি বিষয় বাদ দিলে বিশ্বকাপের নিয়ম-কানুন মোটামুটি ঠিকঠাকই থাকে। এবারেও বিশ্বকাপে ৫০ ওভার করে খেলার নিয়ম বহাল থাকে। এবারের বিশ্বকাপেও মোট ৩৭টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দ. আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা জিম্বাবুইয়ে, কেনিয়া, নেদারল্যান্ড ও আরব আমিরাত এবারের বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার সুযোগ পায়। ভারত-পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার ২৪টি স্টেডিয়ামে এ বিশ্বকাপের খেলাগুলো অনুষ্ঠিত হয়। স্টেডিয়ামগুলো হচ্ছেÑ ভারত : ইডেন গার্ডেন (কলকাতা, পশ্চিম বাংলা,) : আসন সংখ্যা ৯০,০০০ এম চিন্নাস্বামী স্টেডিয়াম (ব্যাঙ্গালোর, কর্নাটক) : আসন সংখ্যা ৫৫,০০০এম এ চিদামবরম স্টেডিয়াম (চেন্নাই, মাদ্রাজ) : আসন সংখ্যা ৫০,০০০ গ্রিন পার্ক (কানপুর, উত্তর প্রদেশ) : আসন সংখ্যা ৪০,০০০ মোহালি, পাঞ্জাব আসন সংখ্যা ৪০,০০০ লাল বাহাদুর শাস্ত্রী স্টেডিয়াম (হায়দ্রাবাদ) : আসন সংখ্যা ৩০,০০০ওয়াংখেড় স্টেডিয়াম (মুম্বাই) : আসন সংখ্যা ৪৫,০০০ নেহরু স্টেডিয়াম (ইন্দোর, মধ্য প্রদেশ) : আসন সংখ্যা ২৫,০০০ ফিরোজ শাহ কোটলা (দিল্লী) : আসন সংখ্যা ৪০,০০০ সরদার প্যাটেল স্টেডিয়াম (আহমেদাবাদ, গুজরাট) : আসন সংখ্যা ৪৮,০০০ চন্দ্রিগড় সেক্টর ১৬ স্টেডিয়াম (পাঞ্জাব, হরিয়ানা) : আসন সংখ্যা ৪৮,০০০ বারাবতী স্টেডিয়াম (কটক, উড়িষ্যা) : আসন সংখ্যা ২৫,০০০ বিদর্ভ স্টেডিয়াম, (নাগপুর, মহারাষ্ট্র) : আসন সংখ্যা ৪০,০০০ মানসিংহ স্টেডিয়াম (জয়পুর, রাজস্থান) : আসন সংখ্যা ২৫,০০০ নেহরু স্টেডিয়াম (পুনে, মহারাষ্ট্র) : আসন সংখ্যা ২৫,০০০ জন। পাকিস্তান : পাকিস্তান ন্যাশনাল স্টেডিয়াম (করাচি, সিন্ধু) : আসন সংখ্যা ৪০,০০০ গাদ্দাফি স্টেডিয়াম (লাহোর, পাঞ্জাব) : আসন সংখ্যা ৬৫,০০০ ইকবাল স্টেডিয়াম (পাঞ্জাব) : আসন সংখ্যা ২৫,০০০ স্টেডিয়াম মিউনিসিপাল স্টেডিয়াম (গুজরানওয়ালা) : আসন সংখ্যা ২০,০০০ নিয়াজ স্টেডিয়াম (হায়দ্রাবাদ, সিন্ধু) : আসন সংখ্যা ১৫,০০০ আরবাব নিয়াজ স্টেডিয়াম পেশোয়ার) : আসন সংখ্যা ২০,০০০ শ্রীলঙ্কা : প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম, কলম্বো আসন সংখ্যা : ৩৫,০০০ ক্যান্ডি স্টেডিয়াম, ক্যান্ডি : আসন সংখ্যা ২৫,০০০ সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব স্টেডিয়াম, কলম্বো : আসন সংখ্যা ১০,০০০ জন।

ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলা হয় এভাবে: অংশগ্রহণকারী ১২টি দলকে দুই গ্রুপে ভাগ করা হয়। গ্রুপ এ তে অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, জিম্বাবুইয়ে ও কেনিয়া এবং গ্রুপ বি-তে ইংল্যান্ড, দ. আফ্রিকা, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, আমিরাত ও নেদারল্যান্ড খেলে। ১৪ ফেব্রুয়ারি অভিষেক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ড বনাম আগের বিশ্বকাপে চমক দেখানো নিউজিল্যান্ড। নিউজিল্যান্ড ১১ রানে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে এ বিশ্বকাপেও শুভ সূচনা করে। নিউজিল্যান্ডের ওপেনার নাথার এ্যাসলে এ বিশ্বকাপের প্রথম শতক হাঁকান এ ম্যাচে। শ্রীলঙ্কায় নিরাপত্তার অভাবের অজুহাতে এ বিশ্বকাপেও অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে এই দুই ম্যাচে শ্রীলঙ্কাকে ওয়াক ওভার দেয়া হয়। তবে তারা শ্রীলঙ্কায় খেলতে গেলেও যে তাদের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়তো না সে প্রমাণ তারা এ বিশ্বকাপে বার বার দিয়েছে। এ গ্রুপে তারা গ্রুপ পর্বের ৫ ম্যাচের ৫টিতেই জিতে পুরো ১০ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে গৌরবের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। এ বিশ্বকাপে তাদের জয় নিয়ে কারও কোন দ্বিধাদ্বন্দ্ব-সংশয় ছিল বলে মনে হয় না। এ গ্রুপের অপর দল অস্ট্রেলিয়া ৫ খেলায় ৩ জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্স আপ হয়। বি গ্রুপে গত বিশ্বকাপের চমক দ. আফ্রিকাও গ্রুপের ৫টি ম্যাচে জিতে শ্রীলঙ্কার মতো পুরো ১০ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে সগৌরবে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। বি গ্রুপের অপর দল চ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান ৪ ম্যাচ জয়ে ৮ পয়েন্ট নিয়ে রানার্স আপ হয়।

এবারও বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে আইসিসির সহযোগী সদস্য কেনিয়া অপ্রত্যাশিতভাবে তিনবারের ফাইনালিস্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৭৩ রানে হারিয়ে দিয়ে সারা ক্রিকেটবিশ্বে হৈচৈ ফেলে দেয়। এ ছাড়া গ্রুপ পর্বে আর তেমন কোন অঘটন ঘটেনি। এবারে শ্রীলঙ্কা যে কাপ জিতবে সেটা তাদের সূচনাই বলে দিয়েছিল। তারা কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে, সেমি ফাইনালে ভারতকে হেসে খেলে হারিয়ে সেটা তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল। কোয়ার্টারে তারা ইংরেজদের ২৩৫ রান তাড়া করে জয় পায় প্রায় ১০ ওভার ও ৫টি উইকেট হাতে রেখেই। আর সেমিতে তাদের ২৫১ রান তাড়া করতে গিয়ে ভারতের ইনিংস শেষ হয় মাত্র ১২০ রানে। ভারতকে ওভার খেলতে হয় মাত্র ৩৪টির মতো। অপরদিকে ফাইনালে শ্রীলঙ্কার প্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়া কোয়ার্টারে নিউজিল্যান্ডকে অতি কষ্টে মাত্র ৩ রানে ও সেমিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে মাত্র ৫ রানে হারিয়ে ফাইনালে শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হয়। তবে ফাইনালে আর ক্যাঙ্গারুদের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি। ১৭ মার্চের ফাইনালে লঙ্কানরা অসিদের নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করেছে। অস্ট্রেলিয়ার করা ২৪১ রানকে লঙ্কানরা টপকেছে প্রায় চার ওভার ও ৭ উইকেট হাতে রেখে। অস্ট্রেলিয়ানরা দম্ভ দেখিয়ে যে শ্রীলঙ্কায় খেলতে যায়নি তাদের সে দম্ভ ভেঙে চুরমার করে দেয় লঙ্কানরা। লঙ্কানরা যে কাপ জিতবে এটা বিশ্বকাপ শুরুর আগেই তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল। এশিয়া কাপে তাদের পারফর্মেন্স দেখে অনেকেই লঙ্কার পক্ষে বাজি ধরতে রাজি ছিল। সেই ১৯৭৯ সালের পর কোন ফেবারিট দল কাপ জিতল। এর আগে ১৯৮৩ সালে ওয়েন্ট ইন্ডিজ, ১৯৮৭ সালে পাকিস্তান, ১৯৯২ সালে নিউজিল্যান্ড ভাল দল নিয়েও কাপ জিততে পারেনি। ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে (৫০ ওভারে ২৪১/৭ রান) ৭ উইকেটে হারিয়ে শ্রীলঙ্কা (৪৯.২ ওভারে ২২৭ রান) প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পায়। অস্ট্রেলিয়ার মার্ক টেলর ৭৪ রান করেন। শ্রীলঙ্কার অরবিন্দ ডি সিলভা নেন ৪২ রানে ৩ উইকেট। অপরদিকে শ্রীলঙ্কার অরবিন্দ ডি-সিলভা অপরাজিত ১০৭ রানের এক ম্যাচ উইনিং ইনিংস খেলেন। ফলে সেমি ফাইনালের পর ফাইনালেও ‘ম্যান অব দ্য ফাইনাল’ হন অরবিন্দ ডি-সিলভা। সেমি ফাইনালের আগেই শ্রীলঙ্কার সনথ জয়সুরিয়া ‘ম্যান অব দ্য সিরিজ’ ঘোষিত হওয়ায় অরবিন্দ ডি-সিলভা ‘ম্যান অব দ্য সিরিজ হতে পারেননি।

ভারতের শচীন টেন্ডুলকর আবারও ৭ ম্যাচে ৮৭.১৬ গড়ে ৫২৩ রান করেন ও ভারতের অনিল কুম্বলে ৭ ম্যাচে ১৮.৬৭ গড়ে ১৫টি উইকেট নেন। চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কা দলের নেতৃত্ব দেন অর্জুনা রানাতুঙ্গা এবং রানার্স আপ অস্ট্রেলিয়া দলের মার্ক টেলর। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল ম্যাচ পরিচালনা করেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্টিভ বাকনার এবং ইংল্যান্ডের ডেভিড শেফার্ড। ষষ্ঠ বিশ্বকাপে যে যোগ্য দল হিসেবে শ্রীলঙ্কা কাপ জয় করেছিল এ কথা অনেকেই মানবেন। সব সময় যে সেরা দল কাপ জেতে না সেটা এবার ভুল প্রমাণিত হলো। শ্রীলঙ্কার এই অনবদ্য ও অপরাজিত জয়ের পেছনে অধিনায়ক অর্জুনা রানাতুঙ্গার সুযোগ্য নেতৃত্ব একটি বড় ও সহায়ক ভূমিকা পালন করে। (চলবে)

e-mail : syedmayharulparvey@gmail.com

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫

২১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: