মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাংলাদেশের ফুটবল বিদেশী নির্ভর

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫
বাংলাদেশের ফুটবল বিদেশী নির্ভর

ফুটবলে বাংলাদেশের সুসংবাদ বরাবরই কম। সেই তুলনায় ব্যর্থতার গল্প এবং গ্লানি দুই-ই অনেক বেশি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আঙ্গিনার ফুটবল লড়াই-এ আমরা এখনও অনেক অনেক পিছিয়ে। ফুটবলে সামগ্রিক ও সার্বিক বিচারে প্রত্যাশিত কোনো ধরনের অগ্রগতি ঘটেনি। তবে কখনও কখনও কেউ কেউ আমাদের ফুটবলে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট থেকেছেন। সব অন্ধকার পেরিয়ে দেখিয়েছেন আলোর পথ। নিরন্তর দুঃখের মাঝে কিছুটা হলেও সুখের পরশ বুলিয়ে দিয়েছেন। তাঁদেরই অন্যতম একজনÑ ফুটবল কোচ জর্জ কোটান। ফুটবলে যখন সাফল্য একেবারেই অধরা ছিল, তখন অস্ট্রিয়ান এই কোচ সাফ ফুটবলে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন করে এক নতুন ইতিহাসের সূচনা করেছিলেন। সেবার ২০০৩ সালে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বসেছিল সাফ ফুটবল প্রতিযোগিতা। দক্ষিণ এশিয়ার এই মর্যাদাকর লড়াই-এ নিজ গ্রুপে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল নেপাল, মালদ্বীপ এবং ভুটান। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই বাংলাদেশ দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠেছিল। এরপর সেমিফাইনালে শক্তিশালী চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশ উঠে গিয়েছিল ফাইনালে। শেষমেশ ঘাম ঝরানো ফাইনালে মালদ্বীপকে ট্রাইব্রেকারে হারিয়ে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়নশিপের বিজয়মাল্য পরার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। তবে সেই অসম্ভব কাজটি মুঠোবন্দী হয়েছিল কোচ জর্জ কোটানের কারণেই।

আমাদের ফুটবলের সেই সাফল্যের নায়ক চিরচেনা কোচ জর্জ কোটান দীর্ঘদিন পর আবার বাংলাদেশে এসেছেন। তবে জাতীয় দলের গুরুদায়িত্ব নিয়ে নয়, এবার এসেছেন দেশের অন্যতম ফুটবল ক্লাব আবাহনী লিমিটেডের দায়িত্ব নিয়ে। ইতোমধ্যেই চুক্তিবদ্ধ ক্লাবের জন্য কাজও শুরু করেছেন। নিজেকে খানিকটা ব্যতিব্যস্তও রেখেছেন। জর্জ কোটান উঠেছেন পান্থপথস্থ নাস নামের একটি সার্ভিস এ্যাপার্টমেন্টে। প্রতিদিন ওখান থেকে সরাসরি চলে যান প্র্যাকটিস মাঠে। প্র্যাকটিস শেষের বাদবাকি সময় সার্ভিস এ্যাপার্টমেন্টে কাটান নিজের রুটিন ওয়ার্ক এবং প্রয়োজনীয় কাজ নিয়ে।

বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে বরাবরই জর্জ কোটান গভীর খোঁজখবর রাখেন। এর পেছনে অন্তর্গত কারণও আছে। প্রথমত এই দেশটিতে কাজ করতে এসে তিনি খানিকটা মায়ায়ও পড়ে যান। ফলে অন্তর থেকে বাংলাদেশকে ভালবেসে ফেলেন। স্বভাবতই এই দেশের ফুটবল নিয়ে তাঁর মাঝে এক ধরনের আগ্রহ ও উদ্বিগ্নতা বরাবরই কাজ করে। বাংলাদেশের সার্বিক ফুটবল মান না এগুনোতে কোটান খুবই মর্মাহত। তিনি মনে করেন অনেক সময় নষ্ট ও অপচয় হয়ে গেছে, ফুটবলের কোনো উন্নতিই ঘটেনি। জর্জ কোটানের ভাষ্যটাই আমরা শুনি। ‘বাংলাদেশ আমার সেকেন্ড হোম, এদেশটাকে খুব ভালবাসি। এদেশের ফুটবল নিয়ে অনেকদিন কাজ করার সুযোগ হয়েছে। কাছ থেকে অনেক কিছুই দেখেছি। আমি সব সময়ই বাংলাদেশের উন্নতি কামনা করি। বাংলাদেশ ফুটবলে ভাল করলে আমার নিজের মাঝে এক ধরনের গর্ব অনুভব করি। কিন্তু সার্বিক বিচারে বললে বাংলাদেশের ফুটবলের কোন উন্নতিই ঘটেনি। অনেক সময় শুধু শুধু অপচয় হয়েছে। কাজের কাজ কোনটাই হচ্ছে না।’ জর্জ কোটান মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বাংলাদেশের ফুটবল শুধু বার বার হোঁচট খাচ্ছে। লক্ষিত গন্তব্যের দিকে কোনমতেই এগুতে পারছে না। তাঁর মতে, কিছু ভুলত্রুটির উপর ভর করে বাংলাদেশের ফুটবল এগুচ্ছে-যা কাক্সিক্ষত নয়। বিশেষ করে জাতীয় লীগ চালু করা, জাতীয় লীগে বেশিসংখ্যক বিদেশী ফুটবলারকে খেলতে দেয়ার সুযোগ দেয়া, নতুন ট্যালেন্ট আবিষ্কার করতে না পারা, ট্যালেন্ট বের হলেও ঠিকমতো কাজে লাগাতে না পারাা-এ সবের কারণেই দেশের ফুটবল এগুতে পারছে না। কোটান বলেন, বাংলাদেশের মতো একটি দেশের লীগ খেলায় যদি এক একটি ক্লাবে চার থেকে পাঁচজন করে বিদেশী খেলোয়াড়কে খেলার সুযোগ দেয়া হয় তাহলে এটি যে কত বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত তা বলে শেষ করবার নয়। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ফুটবলকে মেধা ও নেতৃত্ব শূন্য করতে সবচেয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশের ফুটবলের বিকাশে এটি সবচেয়ে অসম এক চিন্তার সংয়োজন। এই চিন্তা থেকে দ্রুতই বের হয়ে আসতে। বিদেশী ফুটবলারদের এই আধিপত্য বন্ধ করা না গেলে কোনভাবেই বাংলাদেশের ফুটবল সামনের দিকে এগুতে পারবে না।

কোটান বলেন, চার বা পাঁচজন বিদেশীকে খেলানোর প্রশ্নই আসে না, লীগে প্রতি টিমে একজন বিদেশী খেলোয়াড়কে খেলালে ভাল হয়। এর বাইরে আরেকজন হতে পারে। কোনভাবেই দুই-এর বেশি অনুমোদন দেয়া ঠিক নয়। এটি অব্যাহত থাকলে বিদেশী ফুটবলাররাই লীগ নিয়ন্ত্রণ করবে এবং আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে। বিদেশী ফুটবলাররা শুধু এ দেশের অর্থ নিয়ে যাবে। বিনিময়ে বাংলাদেশের ফুটবলের কোন উন্নতিই ঘটবে না। দ্রুতই এই সিদ্ধান্ত ও চিন্তার জায়গায় বাফুফের কর্মকর্তাদের অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে। এটি না করা হলে ফুটবলের দৃশ্যমান কোন ধরনেরই উন্নতিই ঘটবে না। কোটান বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল লীগের শোভা বা সৌন্দর্য এখন আর দেশের ফুটবলাররা নয়, বিদেশী ফুটবলাররা। তারাই সবকিছু কন্ট্রোল করছে। তাদের দাপটে দেশী ফুটবলাররা খেলতে পারছে না। ভাল ভাল ফুটবলারদের সাইডলাইনে বসে থাকলে হচ্ছে। বিভিন্ন দলের মূল স্টাইকাররা খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। তাদের এক্সপোজার নেই। সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় তাদের নাম নেই। যেনো এক বিদেশী লীগ চলছে এখানে। কোটান ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বিদেশী প্লেয়ারদের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ দেশের স্ট্রাইকাররা। ভাল স্ট্রাইকারদেরও সাইডলাইনে বসে থাকতে হয়Ñ এটি অগ্রহযোগ্য। ফলে তাদের জীবনের মূল্যবান সময় অপচয় হচ্ছে। স্ট্রাইকারদের মধ্যে গুণগত কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। এ রকম পরিস্থিতি নিয়ে বাফুফেকে অবশ্যই ভাবতে হবে।

পুরনো স্মৃতির দিকে ফিরে গিয়ে কোটান বলেন, বাংলাদেশের ফুটবলে অনেক ট্যালেন্ট পেয়েছি। আমিনুলের মতো ফুটবলার পেয়েছি। এখনও ট্যালেন্টরা আসছে। কিন্তু সুযোগ সঙ্কোচন হয়ে আসার কারণে সেই ট্যালেন্টরা তাদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারছে না। এখন যে নিয়মে জাতীয় লীগ চলছে তাতে করে মনে হচ্ছে দেশী খেলোয়াড়দের খেলার সুযোগ আরও ছোট হয়ে আসছে। সুতরাং এই নীতি না পাল্টালে ফুটবলের উন্নতি সম্ভব নয়। কোটানের মতে, বাংলাদেশের ফুটবলে আরও অভাবনীয় অনেককিছু হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সেটা হয়নি। একযুগ আগে সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও সেই জয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি। সবখানেই বাংলাদেশকে হোঁচট খেতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত সাফ ফুটবলে তারা নিজেদের শক্তিশালী হিসেবে প্রমাণ করতে পারেনি। অনেকদিন পর বাংলাদেশে আসতে পেরে কোটান বেশ খুশি। বাংলাদেশে আসার আগে তিনি জার্মানিতে ছিলেন। এএফসির হয়ে কিছু ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছেন। তবে এর আগে তিনি সর্বশেষ প্রফেশনাল কোচ হিসেবে যুক্ত হয়েছিলেন পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের সঙ্গে। ২০০৫ সালে মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদের কোচ হিসেবেও তিনি বাংলাদেশে এসে একবার দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নে পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের কোচ হয়ে এসেছিলেন তিনি।

আবাহনীকে ভাল ফলাফল পাইয়ে দিতে কোটান নিবিড়ভাবে কাজ করছেন। এই মুহূর্তে তিনি আবাহনী সম্পর্কে কোন কিছু বলতে নারাজ। কোটান মনে করেন, এদেশের সবকিছুই তার চেনা-জানা। জীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন বাংলাদেশে। চেষ্টা করবেন ক্লাবকে ভাল কিছু দিতে। তবে তিনি মনেপ্রাণে চান বাংলাদেশের ফুটবলটা আরও এগিয়ে যাক। সবশেষে কোটান ক্ষোভ আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের ফুটবলে অনেক ধরনের সমস্যা আছে। কিন্তু সেসব সমস্যা উতরিয়ে সামনে যে এগুনো যাবে না, তা নয়। লক্ষ্যটা এখনই নির্ধারণ করতে হবে। লক্ষ্য ঠিক রেখে এগুলো সাফল্য আসবেই। কোনভাবেই দেশের ফুটবলারদের বঞ্চিত করে ফুটবলের উন্নতি ঘটানো যাবে না। ফুটবলকে উচ্চমাত্রায় নিতে হলে বিদেশী নয়, দেশী ফুটবলারদের সুযোগকেই বেশি বিস্তৃত করতে হবে।’

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫

২১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: