আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

গৃহযুদ্ধে ভেঙ্গে পড়ছে লিবিয়া

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫
  • এনামুল হক

রক্তক্ষয়ী গৃৃহযুদ্ধ ও পাশ্চাত্যের হস্তক্ষেপে ২০১১ সালের শেষ দিকে লিবিয়ার লৌহমানব কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি উৎখাত হবার পর আশা করা গিয়েছিল দেশটাতে শান্তি ও স্থিতি আসবে, সমাজতন্ত্র কায়েম হবে। কিন্তু তা হয়নি, বরং তেলসমৃদ্ধ এই দেশটি চরম বিশৃঙ্খলা ও ঘোরতর অরাজকতার মধ্যে দ্রুত রসাতলে যেতে বসেছে। লিবিয়ায় হানাহানি ও রক্তপাত চলছে। উপদলীয় ও গোত্রগত লড়াই, মিলিশিয়ার সঙ্গে মিলিশিয়ার সংঘাত তীব্র থেকে তীব্রতর রূপ ধারণ করেছে। রাষ্ট্র হিসেব লিবিয়া অকার্যকর হয়ে পড়েছে, ভেঙ্গে পড়েছে।

বস্তুত পক্ষে লিবিয়া আজ এক ব্যর্থ রাষ্ট্রের মূর্তরূপ। কিছুদিন আগেও যেসব দল উপদল একত্রিত হয়ে গাদ্দাফীর পতন ঘটিয়েছিল তারা এখন পরস্পরের সঙ্গে হানাহানিতে মেতে উঠেছে। গোটা দেশটাকে তারা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিচ্ছে। আজকের লিবিয়া দুই সরকার দুই পার্লামেন্ট ও দুই কেন্দ্রীয় ব্যংক গবর্নরের মধ্যে বিভক্ত। সেনাবাহিনীরও আছে দুই স্টাফ প্রধান এবং এই সেনাবাহিনী মূলত জাতিগত লাইনে বিভক্ত আরব ও অনারব। লিবিয়া আজ প্রধান দুটি পক্ষ। এরা সংক্ষেপে ডিগনিটি ও ডন নামে পরিচিত। আরব উপজাতিরা ডিগনিটির পতাকাতলে সংঘবদ্ধ। অন্যদিকে মিসরাতান ও বর্বর উপজাতীয় সৈন্যরা ডনের পতাকাতলে আবদ্ধ। রাজধানী ত্রিপোলিসহ লিবিয়ার সিংহভাগ ভূখ- ডনের নিয়ন্ত্রণে এবং তাদের যোদ্ধার সংখ্যাও অনেক বেশি। অন্যদিকে বেইদায় প্রতিষ্ঠিত জেনারেল খলিফা জাকতায়ের ডিগনিটি সরকারের বিমান শক্তি এবং সম্ভবত অস্ত্রবল প্রতিপক্ষের তুলনায় অধিক। এছাড়াও আছে ছোট ছোট বেশ কিছু বাহিনী যারা এই দুই প্রধান পক্ষের মধ্যে কখনও এ পক্ষ কখনও ও পক্ষের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করে আসছে। কিন্তু কেন এমন হলো? গাদ্দাফি উৎখাতের পর ক্ষমতায় বসেছিল ন্যাশনাল ট্রাপজিশনাল কাউন্সিল (এনটিসি) যার মধ্যে একত্রিত হয়েছিল সকল দল, পক্ষ ও মিলিশিয়া বাহিনী? এনটিসির পরিচালনায় ২০১২ সালের জুলাইয়ে দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে জেনারেল ন্যাশনাল কংগ্রেসের (জিএনসি) হাতে সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার সংষর্ষের সূত্রপাত। সশস্ত্র ব্যক্তিদের গুলিতে নিহত হয় মার্কিন রাষ্ট্রদূত। সরকার সকল মিলিশিয়াকে নিষিদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। ছোটখাটো লড়াই চলতে থাকে বিভিন্ন মিলিশিয়ার মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী আবদুর রহিম আল কেইব মিলিশিয়াদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে। তাদের নেতাদের সিনিয়র মন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। সরকারের বিভিন্ন কাজকর্ম হয় উপেক্ষিত। মিলিশিয়াদের দাপট বেড়ে চলে। সরকার হয়ে পড়ে দুর্বল ও নিষ্ক্রিয়।

উল্লেখ করা যেতে পারে, গাদ্দাফি উৎখাতের সময় বিদ্রোহী বাহিনীর যোদ্ধার সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০ হাজার। এক বছর পর তা ২ লাখ ছড়িয়ে যায়। তালিকাভ’ক্ত মিলিশিয়া বাহিনীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫শ’। এর প্রায় অর্ধেকই এসেছিল একটিমাত্র নগরী মিসরাতা থেকে। এবং এত ক্ষমতাধর হয়ে উঠে যে, সরকার তাদের ইচ্ছামতো চলতে বাধ্য হয়। তারা পার্লামেন্টকে তাদের অনুকূলে আইন পাস করতে বাধ্য করে। কোন অন্যথা হলেই তারা মন্ত্রীদের দফতর অথবা পার্লামেন্ট ভবন অবরুদ্ধ করত।

কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতার সুযোগে যুদ্ধবাজরা সুপ্ত উপজাতীয় আঞ্চলিক ও জাতিগত বিরোধ পুনরুজ্জীবিত করে তোলে। এর পাশাপাশি ছিল ইসলামী মিলিশিয়াদের দাপট। বিভিন্ন উপজাতি ও ইসলামী মিলিশিয়াদের মধ্যে উত্তেজনা প্রথম থকেই তুঙ্গে ছিল। ২০১৩ সালের জুন মাসে ট্রানজিশনাল কাউন্সিল অব বারকা নামে মূলত আরব উপজাতীয়দের একটি সংস্থা লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলকে একটি পৃথক ফেডারেল অঞ্চল ঘোষণা করে এবং এর অল্প কিছুদিন পর সির্তে উপসাগর এলাকার উপজাতীয় মিলিশিয়ারা সেখানকার তেলখনিগুলো দখল করে নেয়। এদিকে পশ্চিমে বর্বর জাতির লোকেরা যারা জনগোষ্ঠীর এক- দশমাংশ, তারা নিজেদের কাউন্সিল গঠন করে এবং মেগরেব ও ইউরোপে অবস্থানরত বৃহত্তর বর্বর সম্প্রদায়ের সমর্থন কামনা করে।

লিবিয়ার এই বিরোধপূর্ণ পরিস্থিতিতে অন্যান্য দেশও জড়িয়ে পড়ে। তুরস্ক, কাতার ও সুদান ইসলামপন্থীদের সমর্থন যোগায়। অন্যদিকে মিসর আমিরাত ও অন্যরা বহুল স্বীকৃত পূর্বাঞ্চলীয় জোটের পাশে দাঁড়ায়।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকায় দুই দশকের প্রবাস জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরেন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল খলিফা হাকতার। তিনি জোর করে জিএনসি ভেঙ্গে দেয়ার এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিজেকে পুনপ্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালান। শেষে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির প্রধান হন। আপারেশন ডিগনিটি নামে তাঁর পরিচালিত অভিযানের পর জিএনসি ভেঙ্গে দেয়া হয় এবং নতুন নির্বাচন হয়, যা কোনদিক দিয়েই ২০১২ সালের নির্বাচনের ধারে কাছে ছিল না। নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে ইসলামী জিহাদী মিসরাতান ও বর্বর উপজাতীয় মিলিশিয়াদের জোট ত্রিপোলির ওপর ছ’সপ্তাহ স্থায়ী আক্রমণ চালিয়ে তা দখল করে নেয়। এই অভিযানে লিবিয়া ডন নামে পরিচিত। নবনির্বাচিত পার্লামেন্ট তবরুকে সরিয়ে দেয়া হয়। এদিকে লিবিয়া ডন জোট নির্বাচনপূর্ব জিএনসিকে পুর্নগঠিত করে এবং এক নতুন সরকার নিয়োগ করে। অপরদিকে জিহাদীরা ২০১৪-এর অক্টোবরে ডারনা বন্দরকে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনাধীন ঘোষণা করে। সে বছরের ডিসেম্বরে লিবিয়ার প্রধান তেল টার্মিনাল লাস লানুফ নিয়ে ডন ও ডিগনিটি বাহিনীর মধ্যে লড়াই বেঁধে যায়। লিবিয়ার এই গৃহযুদ্ধের বিষবাষ্প এখন সাহেল অঞ্চলে অর্থাৎ মালি থেকে নাইজার ও নাইজিরিয়া হয়ে সুদান ও সোমালিয়া এমনকি মিসরের সিনাই মরু পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫

২১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: