কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ডেভিড বার্গম্যান ও জামায়াতের সহিংসতা একই সুতোয় গাঁথা

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫
  • হৃষীকেশ সাহা

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যানকে ২ ডিসেম্বর, ২০১৪ আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। ওই দিন আদালতের কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাদ-ের নির্দেশ প্রদান করা হয়। এ সময় তাঁকে আদালতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। একই সঙ্গে বার্গম্যানকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদ-ের আদেশ দেয়া হয়।

বিগত ৪ ডিসেম্বর, ২০১৪ লন্ডনভিত্তিক একটি সংগঠন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর দ-াদেশে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ‘পেন ইন্টারন্যাশনাল’ নামের এ সংগঠনটি মানবাধিকার ও লেখকদের সংগঠন হিসেবে পরিচিত। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) ও ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টস- এ ৩টি সংগঠনও এ রায় সম্পর্কে যৌথভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। দি ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো পত্রিকায় ৭ ডিসেম্বর, ২০১৪ এ সম্পর্কিত খবর প্রকাশ করে। ডেইলি স্টারের শিরোনাম David Bergman Rights Watchdogs deplore conviction. (বাংলায় ডধঃপযফড়ম-এর আভিধানিক অর্থ- বাড়ি ও সম্পত্তি প্রহরায় নিযুক্ত কুকুর)। ডেভিড বার্গম্যানের দণ্ডাদেশে অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত সংগঠনগুলোর বিলাপ। শিরোনামটি যথার্থভাবে উপাদেয়। প্রথম আলো শিরোনাম করেছে- তিন মানবাধিকার সংগঠনের বিবৃতি বার্গম্যানের দণ্ডাদেশ সমালোচনার পথ সঙ্কুচিত করেছে।

সমসাময়িককালের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয় ঘটে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে। পাকিস্তান দখলদার বাহিনী ও তাদের দোসররা পৈশাচিক উল্লাসে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞে মেতে ওঠে। সভ্যতার ক্রমবিকাশ, দেশে দেশে আইনের শাসন এবং মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার তাগিদ বিচার বহির্ভূত অপরাধ প্রশ্রয় দেয় না। বিচারবিহীন অপরাধ একটি উন্নত কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্তরায়। মানুষের অধিকার, জবাবদিহিতা ও শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে জার্মানির ন্যুরেমবার্গে যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হচ্ছে। টোকিও ট্রায়াল সম্পর্কেও জেনেছি। সাবেক যুগোশ্লাভিয়ায়, সিয়েরা লিওনে, কঙ্গোতে ও সুদানে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। বিচারের বাইরে রাখা হয়নি। কম্বোডিয়া ও রুয়ান্ডায় বিচার হচ্ছে। হাইব্রিড ট্রাইব্যুনাল ও এডহক ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে গঠিত হয়েছে ডেমোস্টিক ট্রাইব্যুনাল। সততা নিষ্ঠায়, মেধা মেননে, নিরপেক্ষতা ও বিচারিক প্রজ্ঞায় সর্বোপরি দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিপারপতির সমন্বয়ে প্রতিটি ট্রাইব্যুনাল সমুজ্জ্বল। অক্লান্ত অম্লান হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।

ডেভিড বার্গম্যান ব্রিটিশ নাগরিক। বাংলাদেশের এক বিখ্যাত আইনবিদের কন্যা-জামাতা। পেশায় সাংবাদিক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরবোজ্জ¦ল অহঙ্কার । ত্রিশ লাখ মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। প্রায় চার লাখ নারীকে সম্ভ্রম হারাতে হয়েছে। লাখ লাখ ঘরবাড়ি আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে। বিশ লাখ মানুষকে দেশের ভিতরের বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছে। নৃশংসতার ভয়াবহতা এতই তীব্র ছিল যে, এক কোটি মানুষ ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। স্বজন হারানোর বেদনা। হৃদয়ে রক্তজবার মতো লাল দগদগে ক্ষত। হন্তারকদের বিচারের প্রতীক্ষায় দীর্ঘ প্রহর। চার দশক পেরিয়ে যায়।

International Crimes (Tribunals) Act, ১৯৭৩ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান। রক্তখেকো পিশাচদের বিচারের জন্যই তিনি এ আইনটি প্রবর্তন করেছিলেন। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ এ আইনের অধীনে ঢাকায় পুরনো হাইকোর্ট ভবনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তীতে ২২ মার্চ, ২০১২ আরেকটি ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরু হয় জামায়াত-বিএনপিসহ কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের মিথ্যাচার। দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র। বিচার প্রক্রিয়া বানচাল করার জন্য শত শত কোটি টাকার বাজেট। লবিস্ট নিয়োগ। আন্তর্জাতিক মহলের নষ্টচক্র এতে জড়িয়ে পড়ে। যেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কিছুই হয়নি। কিন্তু সত্য যে বড় কঠিন। আর বাঙালী সেই কঠিনেরে করেছে জয় ১৯৭১ সালে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যাতত্ত্বের উন্মাদ উদ্ভাবনা আমাদের অপরিমেয় যন্ত্রণাকে পরিহাস করেছে। আমাদের রক্তস্নাত আলোকিত অহঙ্কারকে আহত করেছে। আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বকে বিড়ম্বিত করেছে।

ডেভিড বার্গম্যানের ধৃষ্টতা ও জামায়াতী সহিংসতা একই সূত্রে গাঁথা। সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিচারের প্রক্রিয়ায় আনা হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হচ্ছে কম্বোডিয়ায়। সেদিক থেকে ১৯৭১ সাল খুব বেশি দূরের নয়। ১৯৭৩ সালের জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, আন্তর্জাতিক মিডিয়া, বিভিন্ন গোয়েন্দা প্রতিবেদন এড়িয়ে যাওয়ার কোন অবকাশ নেই। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণা এখনও অবিকৃত অবস্থায় রয়েছে। ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ, লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম হারানোর চাপা কান্না, স্বদেশ থেকে বিতাড়িত এক কোটি মানুষের অনিশ্চিত মানবেতর জীবনের গগনবিদারী আর্তনাদ, নিজ বাসস্থান ছেড়ে দেশের ভেতরে শুধু জীবনটাকে নিয়ে লাখ লাখ মানুষের দিগি¦দিক ছুটে বেড়ানো ডেভিড বার্গম্যানকে বেদনাহত করতে পারেনি। তিনি একজন সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে একটি সুন্দর স্বচ্ছ গ্রহণযোগ্য বিচার প্রক্রিয়ার প্রত্যাশী হতে পারেননি। কোন নীল এজেন্ডা বাস্তবায়নে একজন ডেভিড বার্গম্যানের হাতে দুরভিসন্ধির কলম থাকতে পারে না। বরদাশত করা যায় না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভাগ্যহত শহীদদের সংখ্যা নির্ণয়ের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। ইতিহাসের অমোঘ সত্যকে বিভ্রান্তির উত্তপ্ত কড়াইয়ে নিক্ষেপ করে বিচার প্রক্রিয়ার মানদ-কে নিচে নামানোর জঘন্য অপপ্রয়াস ছাড়া আর কিছু নয়। ডেভিড বার্গম্যান তাঁর ব্যক্তিগত ব্লগে ১১ নবেম্বর, ২০১১ প্রকাশিত ‘ Sayedee indictment : 1971 deaths’ এবং ২৬ জানুয়ারি, ২০১৩ ও ২৮ জানুয়ারি, ২০১৩ প্রকাশিত যথাক্রমে ‘Ayad Judgment analysis 1: Ôin-absentiaÕ trials and defense inadequacy Ges ÔAyad Judgement analysis 2 : Tribunal assumptions’ শীর্ষক নিবন্ধ বাঙালী জাতির ঘাম, রণ্ড উৎকণ্ঠায় বহু প্রতীক্ষায় অর্জিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মর্যাদা ও নিরপেক্ষতাকে নিম্নগামী করার হীন উদ্দেশ্যপ্রসূত। এ অধিকার ডেভিড বার্গম্যানকে কেউ দেয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এসব বিষয়ে মৌনব্রত পালনের কোন সুযোগ নেই। International Crimes (Tribunals) অপঃ, ১৯৭৩-এর ১১ (৪) ধারা এসব দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালকে সোচ্চার রেখেছে। রায়ের সমালোচনা আর ট্রাইব্যুনারের স্বাধীন মর্যাদাবান কর্তৃত্বকে খাটো করা এক বিষয় নয়। রায়ের সমালোচনা করতে গিয়ে কেউ বাঙালী হিসেবে আমার ললাটে আঁকা মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবতিলক বিবর্ণ করতে পারে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ এবং এর বিচারপতিবৃন্দ সত্য থেকে উদ্ভাসিত আলোর অভিযাত্রী-নির্ভীক।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছে প্রশ্ন, মানবাধিকার কার? গণহত্যাকারী, অত্যাচারী, উৎপীড়নকারী, নির্যাতনকারী, লুণ্ঠনকারী, অগ্নিসংযোগকারী, ধর্ষক- এদের মানবাধিকার, না নিপীড়িতের, অত্যাচারীতের, সর্বস্ব হারানোদের? মারণাস্ত্রধারী ঘাতকদের, না মুক্তিকামী কোটি কোটি নিরস্ত্র মানুষের? কোন্টা প্রাধান্য পাবে? ন্যায়বিচার, না অবিচার, বিচার, না বিচারহীনতা কোন্টা? এদেশ তো বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ-শোষিতের পক্ষে। ঘাতকদের পক্ষে তোমরা কিছু নামধারী আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থায় যেতে পার। আমরা যাব না।

এখানে দুটি পক্ষ- একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ যারা করেছে এবং অপরটি যারা এর নির্মম শিকার হয়েছে। শেষোক্তদের কোন মানবাধিকার থাকবে না? থাকবে না বিচার পাওয়ার কোন অধিকার? নইলে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ায় ইতিহাস মীমাংসিত ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নিহতের সংখ্যা নিয়ে এমন তামাশা কেন? আমাদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট রক্তস্নাত গৌরবোজ্জ্বল অতীত কারও ঔদ্ধত্যের কাছে ম্নান হবেÑ বিচার পাওয়ার অধিকার বিনষ্ট করার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনী কর্তৃত্বকে নিন্দিত করার কোন উদ্যোগ বা প্রয়াস কোনভাবেই প্রশ্রয় পেতে পারে না।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মান সরকারী আধিকারিকদের অপরাধমূলক ভূমিকা নিরূপণের জন্য ভার্সাই চুক্তি করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ এবং কতিপয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীর অভিপ্রায় ছিল একটি স্থায়ী ওহবৎহধঃরড়হধষ ঈৎরসরহধষ ঈড়ঁৎঃ প্রতিষ্ঠা করা। এ লক্ষ্যে ১৯৪৮ সাল থেকে ওহঃবৎহধঃরড়হধষ খধি ঈড়সসরংংরড়হ এবং জাতিসংঘ সমগ্র মানবজাতির শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করতে শুরু করে। অবশেষে ১৯৯৬ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধসমূহের সংকলন- গ্রন্থভুক্তি সম্পন্ন হয়। ১৯৯৮ সালে এটি ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈৎরসরহধষ ঈড়ঁৎঃ (ওঈঈ)-এর বিধিবদ্ধ আইনে পরিণত হয়, যা জড়সব নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত ও প্রশংসিত। সভ্যতার এই অগ্রযাত্রাকে নির্বিঘœ করাই মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ব্রত হওয়া উচিত। লাখো কোটি নিপীড়িত মানুষের আর্তনাদ, হাহাকার ও ন্যায়বিচার পাওয়ার আকাক্সক্ষাকে অবহেলা করে লাখ লাখ মুক্তিকামী নিরীহ মানুষের রক্তে পুষ্ট মুষ্ঠিমেয় শ্বাপদদের জন্য কলম ধরা লজ্জার, পরাজয়ের ও অমার্জনীয় অপরাধের শামিল। যে সমালোচনা অপরাধের বিচারহীনতার পক্ষে, যে সমালোচনা একটি স্বচ্ছ উন্মুক্ত আইনী বিচার প্রক্রিয়াকে বিভ্রান্তির বেড়াজালে নিক্ষেপ করতে চায়, যে সমালোচনা অপরাধীদের বাঁচাতে সচেষ্ট, যে সমালোচনা ন্যায়বিচারের পথকে প্রসারিত করে না, যে সমালোচনা সহিংসতা, হত্যা, নির্যাতন, বর্বরতা ও পাশবিকতার সহযোগী তাকে তো সঙ্কুচিত করতেই হবে। তার জন্য বিলাপ করা আর যাই হোক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মানায় না।

লেখক : প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল

প্রকাশিত : ২১ জানুয়ারী ২০১৫

২১/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: