রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাকাট্টা লোট

প্রকাশিত : ২০ জানুয়ারী ২০১৫
  • কামরুল হাসান

শীতের প্রকোপে পৌষের শেষলগ্নে ঘুড়ি ওড়ানোর ঐতিহ্য গ্রাম-বাংলার সর্বত্র। গ্রামীণ জনপদের এই পুরনো সংস্কৃতি শহুরে জীবনেও সমভাবে দৃশ্যমান। যান্ত্রিক ঢাকার বিশাল সব অট্টালিকার ভিড়েও ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্য দেখেও তাই অবাক হয় না নগরবাসী। আকাশে নানা রং-বেরঙের ঘুড়ি তাদের নাগরিক জীবনে কিছুটা হলেও অতীত স্মৃতিকে জাগিয়ে তোলে। আকাশে রঙিন ঘুড়ি ওড়ানোর দৃশ্য নগরবাসীকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের সেই প্রাণবন্ততায়।

ব্যস্ত নগর জীবনে পুরনো ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে এখনও সমুন্নত রেখেছেন আদি ‘ঢাকাইয়ারা’। যারা রাজধানী ঢাকার দক্ষিণাঞ্চলের অধিবাসী যা পুরান ঢাকা হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। পুরান ঢাকার বাসিন্দারাই আদি ঢাকাইয়া হিসেবে রাজধানীতে পরিচিত।

বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিন হলো ইংরেজী বছরের চৌদ্দ জানুয়ারি। পৌষ সংক্রান্তির দিনই পালিত হয় পুরান ঢাকা ও আদি ঢাকাইয়াদের ঐতিহ্যের সাকরাইন উৎসব। সাকরাইন মূলত ঘুড়ি উৎসব যা দীর্ঘদিন ধরে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধনের মিলনমেলা হিসেবে স্বীকৃত। প্রতি বছরের মতো এবারও চৌদ্দ জানুয়ারি ভোরে কুয়াশার আবছায়াতেই ছাদে-ছাদে শুরু হয় ঘুড়ি উড়ানোর উন্মাদনা। সাকরাইন পালন করতে পুরান ঢাকার তরুণ, যুবক সকলেই আগ থেকে ঘুড়ি-নাটাই প্রস্তুত করে রাখেন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। খুব ভোরেই দেখা যায় প্রায় প্রতিটি ছাদে ঘুড়ি-নাটাই হাতে প্রস্তুত তরুণরা। পরিবারের ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণে মুখরিত ছিল প্রতিটি ছাদ। সকাল গড়িয়ে দুপুর আসতেই এ উৎসবের জৌলুস বাড়তে থাকে। ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পরিবারের কর্তাদের দেখা যায় এ উৎসবের মিছিলে সামিল হতে। অতীতে মাইকের প্রচলন থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তিকালে বেশ কিছু ছাদে সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ঘুড়ির উৎসব মানেই কাটাকাটি খেলা। সাকরাইন পালনের আগেই তরুণরা বিশেষ প্রক্রিয়ায় সুতাকে ধারালো করেছেন। সুতায় ধারালো বা মাঞ্জা দেয়ার রীতিটা তাই গুরুত্বসহকারে করা হয়। ঘুড়ির কাটাকাটি খেলায় কোন ঘুড়ি কেটে গেলেই বিজয়ী পক্ষ ‘বাকাট্টা লোট’ স্পীকারে বলতে থাকেন। বিভিন্ন ডিজাইনের ঘুড়ি চোখে পড়ল আকাশে যেমন : চোখদার, মালাদার, ঘায়েল দাবা প্রভৃতি সম্প্রতি যোগ হয়েছে রেসলার রকের মার্কা। এমন উৎসবে পুরান ঢাকার সর্বত্র উন্মাতাল ছিল। গে-ারিয়া, তাঁতিবাজার, লক্ষ্মীবাজার, চকবাজার, লালবাগ, সূত্রাপুরের সব ছাদেই এমন উন্মাদনা। বিকেলের পর শুরু হয় আতশবাজি আর গান-বাজনা। সবকটা ছাদে লাইটিং আর আগুনের খেলার উন্মাতালে যোগ দেন ছেলে-মেয়ে সবাই, গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে শহুরে পার্টির এমন মিশেল সত্যিই অপূর্ব। রাতের আকাশে ঝলমল বাজির রং ও কানফাটা শব্দে বিদায় নেয় এ বছরের সাকরাইন উৎসব।

সাকরাইন সম্পর্কে স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ করে আরও যা জানা গেল, অতীতে সাকরাইনে পুরান ঢাকার শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই-বাহারি ঘুড়ি উপহার ও পিঠার ডালা পাঠানো ছিল ঐতিহ্যের অংশ। ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর খাবার বিলি করা হতো আত্মীয়স্বজন এবং পাড়া-পড়শীদের মাঝে। নীরব প্রতিযোগিতা চলত কার শ্বশুরবাড়ি থেকে কত বড় ডালা এসেছে। আজ এসব চমৎকার আচারগুলো প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার পথে।

পুরান ঢাকার আদি বসবাসকারী মানুষ এখন প্রাচীন সেই ঐতিহ্যময় স্মৃতি রোমন্থন করেন। নতুন প্রজন্মকে শোনান ঐতিহ্যের কাহন। মনের গভীরে পরম মমতায় ঐতিহ্যের সেই পরম্পরা আজও লালন করে বর্তমানের তারুণ্য।

প্রকাশিত : ২০ জানুয়ারী ২০১৫

২০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: