কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ডিজিটাল এগোবে ঐতিহ্যের হাত ধরে

প্রকাশিত : ২০ জানুয়ারী ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

দীপুর ফোন পেয়ে একটু বিরক্তই হলো রুদ্র। ঠিক পড়ার মধ্যে ফোন। উপন্যাসটির ক্লাইমেক্স পর্যায়ে রয়েছেও এখন। দীপু শুধু জানত, সে একটি বই পড়ছে। বইটি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে। সহজ সরল ঝরঝরে ভাষায় লেখা। এখন দীপুর ফোনটা রিসিভ করতে হবে ট্যাবটির এই অপশন বন্ধ করে। কেননা ট্যাবের ইন্টারনেটেই বইটি পড়ছে সে। ফেসবুকেই দু’জনের পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা শেষে বন্ধুত্ব। এই রাজধানীতেই দু’জনের বাস। কাকতালীয়ভাবে উভয়ে একই ক্লাসের ছাত্র। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিন্ন। একটা জায়গায় দারুণ মিলÑ দু’জনেই বইয়ের পোকা। ফোনে দীপু জানতে চায়, বই পড়া কতদূর হলো? বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে কবে যাবে বই জমা দিয়ে নতুন বই আনতে? দীপুও একটা বই এনেছে কেন্দ্র থেকে। সেটা সে জমা দেবে। রুদ্রর সঙ্গে একই দিনে জমা দিতে চায়। দেখা হয় না অনেক দিন। রুদ্র একটু রহস্য রেখে বন্ধুকে জানায়, সে বই জমা দিতে যাবে না। আলাপের শেষদিকে আসল কথা জানাল সে, কেন্দ্রের নতুন সুযোগ অনলাইনে বই পড়ছে। দীপু জানাল তার সীমাবদ্ধতার কথা। দামী ট্যাব কেনার সামর্থ্য তার নেই। বাসার কম্পিউটার বেশিরভাগ সময় থাকে ব্যস্ত। বড় আপু নেটে বসলে আর ওঠে না, আব্বু-আম্মু খবর, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, রান্নাবান্না, সিনেমার খবর নিয়েই থাকেন ব্যস্ত। ছোট ভাইটি বসলে কথাই নেই। গেম-কার্টুন নিয়ে যায় তার সারা বেলা।

দৃশ্যত ঘটনা ও চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও বাস্তবতা কিন্তু এমনই। বিশ্ব এখন গ্লোবালাইজেশন ভিলেজ। প্রযুক্তির ওপর এতটাই নির্ভরশীলতা বেড়েছে যে, জীবনের প্রতি পরতে পরতে এর সর্বগ্রাসী প্রভাব। প্রকাশনা জগতও এর বাইরে নয়। ই-দৈনিক, ই-ম্যাগাজিন এখন আকছার পাওয়া যাচ্ছে ইন্টারনেটে। ই-নিউজপোর্টালের কথা তো পুরনোই। তথ্য জানার জন্য যেমন এসবের ওপর নির্ভর করছে মানুষ, তেমনি নির্মল আনন্দের খোরাক হিসেবেও পাচ্ছে ই-বুক।

এ বাস্তবতায় এখন আলোচিত হচ্ছে আগামীদিনে আসলে ছাপার অক্ষরের প্রকাশনার ভবিষ্যত কী? কোন কোন মহল এ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্নও। এরই মধ্যে তা প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। তবে উদ্বিগ্নতার চেয়ে আশান্বিত হওয়ার একটি ঘটনা ঘটে গেল সম্প্রতি।

গত শুক্র ও শনিবার বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রের এক কর্মযজ্ঞই এ আশাকে দিয়েছে জাগিয়ে। নতুন প্রযুক্তিকে যেমন অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তেমনি ঐতিহ্যকেও ধারণ করে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাল এ কর্মসূচী। আলোকিত মানুষ গড়ার প্রত্যয়ে বইপড়া কর্মসূচী হাতে নিয়েছিল সেই ৩৬ বছর আগে প্রতিষ্ঠানটি। আজ যাঁরা প্রৌঢ়ত্বের দ্বারপ্রান্তে বা বিগত যৌবনে অবস্থান করছেন, এমন পাঠকও সৃষ্টি করেছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। বইপড়া শুধু নির্মল আনন্দই নয়, মনুষ্যত্ব জাগ্রত করে ভবিষ্যত সুনাগরিক তৈরিতে সহায়ক। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে প্রতি বছর আয়োজন করে থাকে বইপড়া প্রতিযোগিতা। ২০১৪ সালে ঢাকা মহানগরের ৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এর আওতায় আনা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের ৩০ হাজার শিক্ষার্থী এতে অংশ নেয়। মূল্যায়ন পর্বে গিয়ে কৃতিত্ব দেখায় ৬ হাজার ৯২ জন। তাদের পুরস্কৃত করতে আয়োজন করা হয় দুই দিনব্যাপী এক অনুষ্ঠানের। রাজধানীর রমনা পার্কে ওই দুই দিন সকালে হাজার হাজার পাঠক-শিক্ষার্থীর নির্মল হাসিতে কুয়াশা কেটে উঠেছিল সূর্য। প্রতিটি বইপড়ুয়া যেন সেই আলোর মুখ। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কারস্বরূপ তুলে দেয়া হয় বই। অনুষ্ঠানে যেমন ছিল মুদ্রিত বইয়ের পাঠক, তেমনি ছিল অনলাইনের পড়ুয়ারা। একটি মোবাইল অপারেটর কোম্পানি অনলাইনে বই পড়তে কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে, সে তথ্যও জানানো হয়।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়Ñ শুধু ঢাকা মহানগরেরই যদি ৩০ হাজার শিক্ষার্থী এ কর্মসূচীতে অংশ নেয়, তবে সারাদেশে নিশ্চয়ই এর কয়েকগুণ বেশি পাঠক রয়েছে। এ তো গেল শিক্ষার্থীর একটা পরিসংখ্যান। শিক্ষার্থীদের বাইরে রয়েছেন আরও কত পাঠক। আবার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্মসূচির বাইরেও রয়েছেন অগণিত পাঠক। তাদের সবারই ঘরে কম্পিউটার, হাতে হাতে লাপটপ বা ট্যাব কিংবা ইন্টারনেট-সেবার মোবাইল সুবিধা আছে, এমনটা ভাবার সময় আসেনি। সবাই যে এসবের ব্যবহারিক দিক আয়ত্ত করতে পেরেছেন বা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, তেমনটাও নয়। আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা সবার ক্ষেত্রেও সমান সুফল দেয়নি। এখনও অধিকসংখ্যক পাঠককে নির্ভর করতে হচ্ছে ছাপার অক্ষরের বইয়ের ওপর। মহল বিশেষ যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা পুরোপুরি সঠিক নয়। আধুনিক ও পরিবর্তিত তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় মুদ্রণশিল্প তার অস্তিত্ব হারাবে না। তেমনি উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ ও সহজপ্রাপ্য হবে ডিজিটালময় ই-শিল্প। উভয় মাধ্যম থেকেই ভবিষ্যতে মানুষ সমভাবে নেবে সেবা। ডিজিটাল প্রযুক্তি আর ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে বেঁচে থাকবে মুদ্রণসহ সব শিল্প।

প্রকাশিত : ২০ জানুয়ারী ২০১৫

২০/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: