কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

হিংস্র মনুষ্য ছোবলে রাজনীতি বিষাক্ত করার অপচেষ্টা

প্রকাশিত : ১৯ জানুয়ারী ২০১৫
  • সহিংসতার আগুন দ্রুত নির্বাপণ চাইছে মানুষ

মোয়াজ্জেমুল হক ॥ হিংস্র মনুষ্য ছোবলে রাজনীতি হয়ে যাচ্ছে অসুস্থ। পরিবেশ আজ বিষাক্ত। নিরীহ মানুষকে বলী করা হচ্ছে সহিংসতার আগুনে জনসমর্থনহীন লাগাতার অবরোধ ডেকে। রবিবার ২০ দলের ডাকা লাগাতার অবরোধের ত্রয়োদশ দিবস অতিবাহিত হয়েছে। এ অবরোধের কবল থেকে মুক্ত ছিল না ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের দ্বিতীয় পর্বের বিশ্ব এজতেমাও। তবে লাখ লাখ মুসল্লিকে থামানো যায়নি। পথে পথে অবরোধের দেয়াল উপড়ে ফেলে রবিবার এজতেমার সমাপ্তি ঘটেছে আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে।

কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ ঘোষণাকারীদের নামিয়ে দেয়া মস্তান ক্যাডার বাহিনীর চোরাগোপ্তা মামলা, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, রেললাইন উৎপাটন, যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগে সম্পদের সঙ্গে মানুষকে পুড়িয়ে অঙ্গার করার ঘটনা থেমে নেই। ২০ দলের অবরোধের গেল ১৩ দিনে সাফল্য কিÑ এমন প্রশ্নের উত্তর ২০ দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছেও মিলছে না। রাজনীতি সচেতন মানুষও ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন। এর উত্তর যেন কুয়াশার চাদরে ঢাকা শীতের সকালের মতো। প্রশ্ন উঠেছে ২০ দল সরকার বিরোধিতার নামে যে অঘোষিত যুদ্ধ শুরু করেছে সেই যুদ্ধের রেশ টানতে হচ্ছে জনগণ তথা সাধারণ মানুষকে। এ পর্যন্ত তাদের অবরোধে সরকারের কোন অঙ্গহানি নেই। কর্মকা-ে স্থবিরতা নেই। সরকার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে চলেছে। অথচ সব ধরনের শিকারের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে সাধারণ মানুষ। ইতোমধ্যে এ সহিংসতায় মৃত্যুর সংখ্যা ত্রিশের কাছাকাছি। আহতের সংখ্যা অগণন। এতে কি আন্দোলনরত ২০ দল আনন্দিত? জনজীবন দুর্বিষহ করে অসুস্থ রাজনীতির বিষাক্ত পরিবেশে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে সাধারণ মানুষ। এমনিতর পরিস্থিতিতে সরকারও আন্দোলন দমাতে হার্ড লাইনে। বিভিন্ন স্থানে নেমে গেছে যৌথবাহিনী। আজ-কালের মধ্যে চিহ্নিত স্থানগুলোতে আরও নামবে। সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত বিএনপি-জামায়াত ও জঙ্গীবাদী, মৌলবাদী ক্যাডারদের আস্তানায় চলবে অপারেশন। এ সংকল্প নিয়ে এগিয়ে চলেছে সরকার। এ বক্তব্য সরকার ও সরকারী চালিকাশক্তির সব স্তর থেকে জানান দেয়া হচ্ছে।

ইতোমধ্যে কয়েকটি দেশের কূটনৈতিকদের তৎপরতাও দৃশ্যমান। তবে তারাও চাচ্ছেন সহিংসতা বন্ধ হোক। দু’পক্ষকে সংলাপে বসাতে আগ্রহী কূটনীতিক মহল। কিন্তু সরকারী অবস্থান-আগে অবরোধ প্রত্যাহার, সহিংসতা বন্ধ। ইঙ্গিত মিলছে সরকার প্রয়োজনে সংলাপ করবে। শর্তাধীনে সমাবেশ করতেও দেবে। কিন্তু বিপরীতে ২০ দলের অবস্থান কি তা একেবারে ঘোলাটে। তারা এখন মধ্যবর্তী নির্বাচন পেতে বিভোর হয়ে আছে। এর আগে তারা শর্তহীন সংলাপ ও সমাবেশও চায়। সর্বশেষ শনিবার ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম জিয়া অনড় অবস্থানে রয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানান দিয়েছেন বিএনপি নেতা এমকে আনোয়ার। তাঁর অনড় অবস্থান, গণতন্ত্র, রাজনীতি, সাধারণ মানুষ, সহায় সম্পদ, যানবাহন জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়েই চলেছে। বোমা হামলায় ঝলসে যাওয়া মানুষ কাতরাচ্ছে বিভিন্ন হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। সহিংসতায় ইতোমধ্যে কেউ হারিয়েছে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, কেউ হারিয়েছে আপনজন। তারপরও ২০ দল বলছে অবরোধ চলবে। অর্থাৎ দেশে আরও আগুন জ্বলবে, মানুষ মরবে।

রাজনীতি সচেতন বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, ২০ দল আরও বড় ধাক্কা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু যে লাগাতার অবরোধ ও সহিংসতা চালাচ্ছে এর চাইতে বড় আর কি ধাক্কা রয়েছে তা তাদের বুঝে আসছে না। আর কি ঘটনার অবতারণা হলে সরকারকে তারা আলোচনায় বসতে বাধ্য করাবে এবং দাবি আদায় হবে তাও কারও জানা নেই। লাগাতার অবরোধে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ২০ দলের আশু সফলতা আছে কিনা তা নিয়ে কেউ কিছু ধারণা করতে পারছে না। ২০ দলের আন্দোলনের বিপরীতে সরকার আগেও যা বলেছে, এখনও তাই বলছে। সরকার বলেই দিয়েছে মেয়াদ পূর্ণ হলেই নির্বাচন। সমাবেশ হতে পারে শর্তাধীনে। তার আগে অবরোধ ও সহিংস সকল কার্যক্রমের ইতি টানতে হবে। সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্রে রবিবার আবারও বলা হয়েছে, ২০ দল যতই সহিংসতা বাড়াচ্ছে সরকার ততই হার্ড লাইনে যেতে বাধ্য হচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষের সহায় সম্পদ রক্ষা করতে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে। এছাড়া সরকারের অন্য কোন পথ খোলা নেই।

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে বলা হচ্ছে, এদেশের মূল রাজনীতি দুই ধারায় বিভক্ত। প্রগতির পক্ষে ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশের মানুষের বড় একটি অংশ উদ্বুদ্ধ। যার নেতৃত্বে রয়েছে আওয়ামী লীগ। আর আওয়ামী লীগের বিরোধী অবস্থানে রয়েছে আরেকটি অংশ। যার নেতৃত্বে বিএনপি। ২০ দলের চলমান রাজনৈতিক কর্মসূচীতে ব্যবসায়ীদের মাঝে চলছে আহাজারি। অশ্রুজলে সিক্ত হচ্ছেন শিল্প মালিকরা। যানবাহনের যাত্রীরা ভোগান্তির শেষ সীমায়। কাজ না পেয়ে অলস শ্রমিকরা ধুঁকছে। আর প্রচ- ক্ষোভে ক্ষুব্ধ মানুষ কেবল গজরাচ্ছে। সঙ্গত কারণে সর্বত্র উঠেছে একই আওয়াজ- থামুন। অবরোধ থামান। জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ করুন। বোমা হামলা, সহিংসতা কাম্য নয়। জনকল্যাণের নামে মানুষ মেরে অপরাজনীতির খিস্তিখেউরের পথ পরিহার করে শান্তিপূর্ণ আলোচনার পথে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া এ মুহূর্তে অন্য কোন পথ খোলা নেই। খোলা নেই বিদেশী হস্তক্ষেপের কোন পথও। কারণ, এদেশকে কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি। বিদেশী সমর্থন, সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা কোথায়। এদেশ এখন সাহসে বলীয়ান, কর্মে উজ্জীবিত, শিল্পে উন্নত, বেড়েছে অর্থনীতির সূচক, বিশ্ব অঙ্গনে বহু অর্জন এদেশের। ব্যর্থতা শুধু অপরাজনীতির ফাঁসকল থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে না পাওয়া। লাল সবুজের পতাকার ছোট্ট এদেশটিতে জনসংখ্যা যেখানে তরতর করে বেড়ে চলেছেÑ সে জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে যেতে হবে দূর-বহুদূর। অবরোধ আন্দোলনকারীদের সহিংসতার পথ পরিহার করে ভাবতে হবে দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে, সহায়-সম্পদ ও জানমাল নিয়ে। সর্বোপরি গণতান্ত্রিক ধারাকে অব্যাহত রেখে মানুষকে জানান দিতে হবে এগিয়ে নেয়ার আশ্বাসে।

প্রকাশিত : ১৯ জানুয়ারী ২০১৫

১৯/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: