রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রফতানিমুখী ওষুধ শিল্প

প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারী ২০১৫
  • নিতাই চন্দ্র রায়

সম্প্রতি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হলো সপ্তম এশিয়া ফার্মা এক্সপো-২০১৫। তিন দিনব্যাপী ওই প্রদর্শনীতে ভারত, চীন, কোরিয়া, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, তাইওয়ানসহ বিশ্বের ৩০টি দেশের ৪৫০টি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। মেলায় আধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্রোপচার, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় উৎপাদিত ওষুধ প্রদর্শন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশে বর্তমানে যে বিশ্বমানের ওষুধ উৎপাদন হচ্ছে, তা দিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব। একইসঙ্গে বর্তমান বিশ্বের ৯০টি দেশে বাংলাদেশ মানসম্মত ওষুধ রফতানি করছে।’

বাংলাদেশে তৈরি ওষুধ দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন রফতানি হচ্ছে বিশ্ববাজারে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের জন্য একটি আনন্দের সংবাদ। স্বাধীনতার পর চাহিদার শতকরা ৭০ ভাগ ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো। এখন উন্নত প্রযুক্তির সব কারখানায় ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে। তাই উৎপাদন ও গুণগত মান অনেক বেড়ে গেছে। পঞ্চাশের দশকে শুরু“হওয়া এই শিল্প এখন বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনাময় রফতানিমুখী খাত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় এক হাজার রকমের ওষুধ রফতানি করছে বাংলাদেশ। এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা আর বিশ্ব বাজারের সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে স্বল্পসময়ের মধ্যেই ওষুধ রফতানিতে এশিয়ার শীর্ষে উঠে আসবে বাংলাদেশ।

উচ্চমানের ওষুধ প্রস্তুতকরণ, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও মানব সম্পদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প নিজেদের সক্ষমতা ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছে। কাজেই বিশ্ববাজারে প্রবেশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের।

ওষুধ শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে কর্মস্থান। বর্তমানে এ শিল্পে লক্ষাধিক লোকের প্রত্যক্ষ এবং পাঁচ লক্ষাধিক লোকের পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। এ খাতের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারাটি অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরে এখাতে নতুন করে দুই লাখ লোকের প্রত্যক্ষ এবং ১৫ লাখ লোকের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের ওষুধের মান আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন হলেও ওষুধ নিয়ন্ত্রককারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও আন্তর্জাতিক স্বাীকৃতি পায়নি। এছাড়া আমাদের দেশে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত সরকারী মান যাচাইকারী কোন ল্যাবরেটরি নেই। এ ধরনের একটি ল্যাবরেটরি স্থাপনের জন্য দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি। সরকারী ওষুধ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এবং মান যাচাইকারী ল্যাবরেটরি যদি স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পায়, তা হলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে এদেশে ওষুধ খাতের রফতানি বাজার আরও অনেক বৃদ্ধি পাবে।

এখনও মুন্সীগঞ্জের গজারিয়াতে ওষুধ শিল্পের জন্য এ্যাকটিভ ফ্যার্মসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) পার্ক স্থাপনের কাজটি শেষ হয়নি। যদিও ২০১২ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। এই পার্কটির কাজ সম্পন্ন হলে দেশের অনেকগুলো কোম্পানির ব্যবসায়িক কর্মকাে র প্রসার ঘটবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার ধরতে পণ্য বৈচিত্র্যের পাশাপাশি মান উন্নয়নের গবেষণা কাজও ত্বরান্বিত হবে। এতে গড়ে ওঠা মানব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করা সম্ভব হবে। সীমাবদ্ধ সম্পদ ও প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে এই মুহূর্তে মৌলিক গবেষণায় বিনিয়োগ করার মতো সামর্থ্য নেই বাংলাদেশের। তবে দেশের মেধাবী ও কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন গড়ে উঠা বিশাল মানব সম্পদের যথাযথভাবে কাজে লাগানোর জন্য আবিষ্কৃত ওষুধের গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরী।

বাংলাদেশের ২০১৩ সালের ওষুধের অভ্যন্তরীণ বাজার ছিল ১২ হাজার কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। আশা করা যায়, চলতি বছর শেষে এ বাজারের পরিধি বেড়ে দাঁড়াবে ১৩ হাজার কোটি টাকা। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলে এ খাতে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, পাবনা, খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ২৬৯টি ছোট বড় ওষুধ কারখানা রয়েছে। কারখানাগুলোর মধ্যে বেশকিছু কারখানা আন্তর্জাতিক মানের। বিশেষ করে স্কয়ার, বেক্সিমকো, ইনসেপটা, রেনাটা, অপসোনিন, এসিআই, ্ওরিয়ন, বিকন, পপুলার টেকনো, গ্লাক্সো, হেলথ কেয়ার, এসকেএফসহ বেশকিছু কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে। এ ধরনের বিশ্বমানের ৪২টি ওষুধ কারখানাতে উৎপাদিত কোটি কোটি টাকার ওষুধ আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, জাপান, ইতালি, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে।

পর্যাপ্ত উৎপাদন ক্ষমতা ও গুণগতমানের কারণে প্রতিবছরই বাড়ছে ওষুধ রফতানি। ওষুধ রফতানিকারকরা বলছেন, বিদেশে বিনিয়োগে সরকারী প্রতিবন্ধকতা দূর হলে ওষুধ রফতানি থেকে আয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। রফতানির জন্য আমদানিকারক দেশে ওষুধের নিবন্ধন নিতে হয়। একটি আইটেমের নিবন্ধন নিতে কমপক্ষে ৫০ হাজার ডলার খরচ করতে হয়। অথচ ওষুধ কোম্পানিগুলোকে সরকার একবারে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ডলার পর্যন্ত নেয়ার অনুমোদন দিচ্ছে। এছাড়া ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা ও বন্ডেডওয়্যার হাউস স্থাপনের ক্ষেত্রে জটিলতার মুখে পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকসের তথ্যানুযায়ী , ২০১৬ সালে ১০টি দেশ ওষুধের আকর্ষণীয় বাজারে পরিণত হবে। এগুলো হলো-যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, জামার্নি, ফ্রান্স, ইতালি, ভারত, রাশিয়া ও কানাডা। এর মধ্যে চারটিতে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার রয়েছে। বাকি ছয়টিতেও শীঘ্রই প্রবেশাধিকার পাবে। বাংলাদেশ থেকে সরকারী ব্যবস্থাপনায় ওষুধ আমদানি করবে শ্রীলঙ্কা। এজন্য দু’দেশের মধ্যে সম্প্রতি একটি সমঝোতা সারক স্বাক্ষর হয়েছে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বিকাশে এটা একটা বড় ধরনের উদ্যোগ। শতভাগ আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ওষুধ শ্রীলঙ্কায় রফতানি হবে।

বাংলাদেশের ওষুধ আজ সারা বিশ্বে সমদৃত। অপরদিকে দেশের নেতৃস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মা তাইওয়ান ফুড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে গুড ম্যানুফ্যাকচারিং প্র্যাকটিসেস সার্টিফিকেট পেয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম কোন ওষুধপ্রস্তুকারী প্রতিষ্ঠান এ ধরনের সনদ পেল এবং এর ফলে তাইওয়ানে বেক্সিমকোর ওষুধ রফতানির পথ উন্মুক্ত হলো। প্রাথমিকভাবে ওরাল সলিড, ইনহেলার ও স্টেরিল আই ড্রপের জন্য অনুমোদন পেয়েছে বেক্সিমকো ফার্মা। এটা বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের জন্য এক বিরাট অর্জন। কঠোরভাবে গুণগতমান নিয়ন্ত্রণ এই শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ গুণগতমান নিশ্চিত না হলে বিশ্ববাজারে টিকে থাকা যাবে না। দেশে এখনও পেটেন্ট আইন নেই। এটি দ্রুত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বহু বাঁধা-বিপত্তি পেরিয়ে বিশ্বের অনেক নামি-দামি দেশেকে পেছনে ফেলে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়ে গেছে বহুদূর। এখন প্রয়োজন এই বিস্ময়কর সাফল্যকে ধরে রাখা এবং সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে তাকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলা।

মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), সেতাবগঞ্জ সুগারমিলস লি. সেতাবগঞ্জ, দিনাজপুর

netairoy18@yahoo.com

প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারী ২০১৫

১৮/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: