আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সম্ভাবনাময় ওষুধ শিল্প

প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারী ২০১৫
  • এসএম মুকুল

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রফতানি আয় বাড়াতে ভাল অবদান রাখছে। এ খাতে শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি তাদের শ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করছে। ফার্মেসি ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে অসংখ্য তরুণ আত্মকর্মসংস্থানের পথ খুঁজে নিয়েছে। দেশের ওষুধের চাহিদার প্রায় পুরোটাই দেশীয় কোম্পানিগুলো মিটিয়ে আসছে। তবে ওষুধের কাঁচামাল প্রধানত আমদানি নির্ভর থাকায় অনেক টাকা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। অন্তত ৮৫ শতাংশ কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। দেশে কাঁচামাল উৎপাদন করা গেলে সামগ্রিকভাবে ওষুধের উৎপাদন বাড়বে এবং ব্যয় কমবে। কাঁচামাল আমদানি বন্ধ হলে দেশে সাশ্রয় হবে হাজার কোটি টাকা।

পেছনের কথা

ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ ১৯৮২ বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে এক নতুন দ্বার উন্মোচন করে। এ অধ্যাদেশ প্রণীত হওয়ার পর দেশীয় ওষুধ শিল্পের বিকাশ এবং উন্নত ও মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছে। এ অধ্যাদেশ চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবায় ক্ষতিকর, অপ্রয়োজনীয় ও অব্যবহারযোগ্য ওষুধ দ্রুত বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়া হয়, পাশাপাশি যাতে সমাজের সব শ্রেণী এবং পেশার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে সেজন্য ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে কম মূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ বাজারজাত করার জন্য দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো এগিয়ে আসে।

বিনিয়োগ

বাংলাদেশের অনেক উৎসাহী ও স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলোর মান ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। ফলে ওষুধ আমদানি কমছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে সর্বমোট ২৬৯টি অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রস্ততকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বছরে ২৪ হাজার ব্র্যান্ডের ১২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদন করছে। তথ্য-অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১০০ কোটি টাকা। ২০০৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। ২০১২ সালে এ খাতে বিনিয়োগের আকার দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকার মতো।

ওষুধের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে

ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের সুফলের কারণে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ওষুধের বাজার বাড়ছে। আশার খবর হলো, দেশের ভেতর ৯৭ ভাগ ওষুধের যোগান দিচ্ছে দেশী কোম্পানিগুলো। বর্তমানে বাংলাদেশে ওষুধের বাজার সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও দেশের বাজারে ওষুধ বিক্রির পরিমাণ ছিল সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের তুলনায় ওই বছর স্থানীয় বাজারে চাহিদা বাড়ে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৪ সালে স্থানীয় বাজারে ওষুধ বিক্রির পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অথচ ২০০৪ সালে ছিল ২ হাজার ৮৭৩ কোটি এবং ২০০৩ সালে ছিল ২ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ওষুধশিল্প সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বড় কোম্পানিগুলো দেশের ভেতরে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি, মধ্যম কোম্পানিগুলো ৫০ কোটি থেকে ৩০০ কোটি এবং ছোট কোম্পানিগুলো ৫০ কোটি টাকার ওষুধ বিক্রি করে। দেশে বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি ওষুধ বিক্রি করেÑ এমন কোম্পানির সংখ্যা ২০টির মতো।

৮৭ দেশে বাংলাদেশের ওষুধ

বর্তমানে ৮৭টি দেশে রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশে তৈরি ওষুধ ও কাঁচামাল। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০১ সালে বাংলাদেশ ১৭টি দেশে ৩২ কোটি টাকার ওষুধ রফতানি করত। ২০১১ সালে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের ৫৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ওষুধ রফতানি করেছে। ২০১২ সালে বাংলাদেশ ৪৬৬ কোটি ও ২০১৩ সালে ৫০৬ কোটি টাকার ওষুধ রফতানি করে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ওষুধ রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ১৬ শতাংশ। ২০১৪ অর্থবছরে ৬ কোটি ৯২ লাখ ডলারের ওষুধ রফতানি করা হয়। মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনকারী ৪২টি কোম্পানির উৎপাদিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, ইতালি, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, বর্তমানে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, সুইজারল্যান্ডসহ ৮৭টির বেশি দেশে রফতানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। জাপানও বাংলাদেশ থেকে ওষুধ আমদানির আগ্রহ ব্যক্ত করে।

বছরে সাশ্রয় ১ হাজার কোটি টাকা

দেশে আন্তর্জাতিকমানের এন্টি ক্যান্সারের ওষুধ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ইনসুলিন এবং অন্যান্য প্রতিষেধক ভ্যাকসিন। এসব ওষুধের দামও তুলনামূলকভাবে বিদেশী ওষুধের চেয়ে কম। বাংলাদেশে বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ওষুধ এবং ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো বিভিন্ন থেরাপিউটিক শ্রেণীর ওষুধ উৎপাদন করে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টাসিড, আলসার/গ্যাসস্ট্রিক প্রতিরোধকারী ওষুধ, ভিটামিন ও মিনারেল, ব্যথা উপশমকারী, স্নায়ুরোগ, শ্বাসকষ্ট ও বক্ষব্যাধি উপশমকারী ওষুধ।

বাংলাদেশে স্থাপিত হচ্ছে ওষুধের কাঁচামাল (অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিকেল ইনগ্রেডিয়েন্ট-এপিআই) উৎপাদন কারখানা। ফলে বছরে এ দেশের সাশ্রয় হবে ১ হাজার কোটি টাকা এবং কর্মসংস্থান হবে কয়েক হাজার শিক্ষিত যুবক-যুবতীর।বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় আড়াইশ ছোট-বড় ওষুধ কোম্পানি বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধ উৎপাদন করে। এর মধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ওষুধের কাঁচামাল দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো উৎপাদন করে। আরও ১ হাজার কোটি টাকার কাঁচামাল বিদেশে থেকে আমদানি করতে হয়। পানি বিশোধনের এক একটি মেশিনের জন্য খরচ হয় ৬ থেকে ৭ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত ইনপ্রেডিয়েন্ট পার্কে সবার ব্যবহারের জন্য স্থাপন করা হবে বড় ধরনের পানি বিশোধন প্ল্যান্ট। এছাড়া দূষিত শিল্প বর্জ্য শোধন করার জন্য করা হবে এফ্লোয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। ফলে এখানকার শিল্প বর্জ্য এলাকার পরিবেশ দূষণ ঘটাবে না।

মিটফোর্ডে বিক্রি ২ হাজার কোটি টাকা

মিটফোর্ড পাইকারি ওষুধের বাজার হিসেবে সুখ্যাতি ছড়িয়েছে। রাজধানীর এই মিটফোর্ড ওষুধের বাজারে বছরে বিক্রি হয় ২০০০ কোটি টাকার ওষুধ। বাংলাদেশের ওষুধের সুনাম এখন বহির্বিশ্বেও। দেশেই ওষুধের বাজার রয়েছে ৫০০০ কোটি টাকারও বেশি। মিটফোর্ড ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ীÑ চোরাচালানের মাধ্যমে ১০০০ কোটি টাকারও বেশি পরিমাণ বিদেশি ওষুধ আসছে দেশে। এই চোরাচালান ঠেকানো সম্ভব হলে দেশে ওষুধের বাজার চাহিদা আরও সম্প্রসারিত হবে। ওষুধ সমিতির তথ্যে দেখা গেছে, সারাদেশে প্রায় ৩ লাখ ওষুধের দোকান রয়েছে। তার মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার দোকান অবৈধ। লাইসেন্স বিহীনভাবে ব্যবসা করছেন অনেক ওষুধ ব্যবসায়ী। মিটফোর্ড ছাড়াও দেশে আরও ৪টি বড় ওষুধের মার্কেট রয়েছেÑ খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর এবং চট্টগ্রামের হাটহাজারিতে।

ভেজাল ওষুধ

ওষুধ শিল্পের বিকাশ আশাব্যঞ্জক হলেও ভেজাল ওষুধে বাজার সয়লাব। অসাধু চক্র বাজারে ওষুধ বিক্রি করছে। সে ওষুধ খেয়ে অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকেই। প্রাণ রক্ষায় ওষুধ কিনে, সে ওষুধে মৃত্যুবরণের বিষয়টি খুবই দু:খজনক। শক্তিশালী অসাধু সিন্ডিকেটের দৌরাতেœ হুবুহু নকল ওষুধ কিনছে মানুষ। ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে তা যথেষ্ট নয়। আরো কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কাজে লাগাতে হবে অমিত সম্ভাবনা

বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় ওষুধ শিল্পখাতে ডি-৮ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন দেশীয় ওষুধ শিল্প মালিকরা। বাংলাদেশে ওষুধ শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটছে। আরও ঘটবে যদি উপযুক্ত মানসম্পন্ন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে সরবরাহ করা সম্ভব হয়। মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে প্রয়োজনে বিদেশী ফার্মাসিস্ট, কেমিস্ট অথবা বিশেষজ্ঞ বা প্রযুক্তি নিয়োগ করা যেতে পারে। বিদেশী আর্থিক সহায়তায় ওষুধের কারখানা স্থাপন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ঋণের ভিত্তিতে বিদেশী কাঁচামাল, মেশিন ও যন্ত্রপাতি আমদানি করা যেতে পারে। বিদেশী কোম্পানিকে একটা সুনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য আংশিক মুনাফাভোগী করা হলেও সম্পূর্ণ মালিকানা তাদের হাতে না ছাড়াই উত্তম।

উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারী ২০১৫

১৮/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: