রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

চলে গেলেন গোবিন্দ হালদার

প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারী ২০১৫
চলে গেলেন গোবিন্দ হালদার

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মানবতার মমতায় জড়িয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে মুক্তিসেনাদের উদ্বুদ্ধ করতে কলমকে করেছিলেন হাতিয়ার। লিখেছিলেন বাংলাদেশের জন্মের মহাকাব্যিক অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নিবেদিত গান। পাকবাহিনীর কবলমুক্ত স্বাধীন দেশের স্বপ্নমাখা সেই কালজয়ী গান মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি/যে মাটির চির মমতা আমার অঙ্গে মাখা যার নদী জল ফুলে ফুলে মোর স্বপ্ন আঁকা। অবশেষে থেমে গেল স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতিকে প্রেরণা জোগানো সেই কিংবদন্তি গীতিকবি গোবিন্দ হালদারের জীবনের লড়াই। শনিবার সকালে চিরতরে নিঃশেষ হলো তাঁর জীবনস্পন্দন। তিনি কলকাতার মানিকতলার জিতেন্দ্রনাথ রায় হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। সকাল ১০টা ২০ মিনিটে হাসপাতালের চিকিৎসকরা স্বাধীন বাংলা বেতারের এই গীতিকার ও সুরকারকে মৃত ঘোষণা করেন। গত দুই মাস ধরে তিনি এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন কিডনিজনিত অসুস্থতা ও বার্ধক্যজনিক সমস্যায়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

গোবিন্দ হালদারের প্রয়াণের সংবাদে একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের কলকাতার শিল্প-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বাধীন বাংলা বেতারের অনন্য এই গীতিকবির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ। এছাড়াও তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। এছাড়াও সাংগঠনিকভাবে শোক জানিয়েছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।

শোক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খ্যাতিমান এই গীতিকারের মৃত্যুতে বাংলাদেশের মানুষ তাদের একজন অকৃত্রিম বন্ধুকে হারালো। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রয়াত এ গীতিকারের লেখা সুরারোপিত গান মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দীপ্ত করার পাশাপাশি সে সময়ের অবরুদ্ধ দেশবাসীকেও মুক্তির অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত করেছিল। বাংলাদেশের মানুষ চিরদিন তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালবাসার সঙ্গে স্মরণ করবে। এছাড়াও ওই বিবৃতিতে শেখ হাসিনা গোবিন্দ হালদারের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্য এবং ভক্ত ও গুণগ্রাহীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রখ্যাত শিল্পী আবদুল জব্বার গোবিন্দ হালদারের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সংবাদটি জানার পরই আমার মনটা বিষণœ হয়ে যায়। ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। প্রতিবেশী দেশের নাগরিক হয়েও আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি ধারণ করেছিলেন হৃদয় দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর রচিত গানগুলো এক কথায় অনবদ্য, যা কোনদিন মুছে যাবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের মতোই তাঁর গানের ইতিহাসও আজীবন স্মরণ করবে বাঙালী জাতি। তিনি আরও বলেন, প্রকৃতির নিয়মেই সব মানুষকেই একদিন চলে যেতে হয়। তবে আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার মাধ্যমে তাঁর প্রতি প্রকৃত সম্মান জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাঁর মতো মানুষের অবদানের দাম দেয়া না গেলেও পরিপূর্ণ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশকে যেন আপন মাতৃভূমির মতোই ভালবেসেছিলেন গোবিন্দা হালদার। আর হয়ত সে কারণেই গত ২১ নবেম্বর তাঁর অসুস্থতার খবর পেয়ে চিকিৎসার সব দায়িত্ব নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এদিকে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়ে অসুস্থ এই গীতিকবির সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর চিকিৎসার সার্বিক খোঁজখবর নেন। ওই সময় রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর ভূমিকার কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। আইসিইউতে থাকা গোবিন্দ হালদারকে তিনি বলেন, আপনি বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আপনার ভূমিকা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আপনার অনেক গান অনুপ্রাণিত করেছে মুক্তিযোদ্ধাদের।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতারে সম্প্রচারিত গোবিন্দ হালদারের লেখা গানগুলো নিরন্তর অনুপ্রেরণা যুুগিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ কালজয়ী এই গানটির স্রষ্টা তিনি। এছাড়াও ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা’, ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা’র মতো সাড়া জাগানো গানেরও রচয়িতা তিনি। ভারতের কলকাতার আয়কর বিভাগে কর্মরত অবস্থায় বন্ধু কামাল আহমেদের অনুপ্রেরণা ও উৎসাহে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর গান রচনা করেন। কামাল আহমেদ তাঁকে স্বাধীন বাংলা বেতারের কর্ণধার কামাল লোহানীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাঁর হাতে ১৫টি গানের খাতা দেন। আর এ গানগুলোর মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতারে প্রথম প্রচারিত হয় সমর দাসের সুরারোপিত ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’ গানটি। ষোলই ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্থনের খবর পাওয়ার পরপরই ওই সন্ধ্যায় প্রচারিত হয় ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’ গানটি। এই গানের সুর দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী আপেল মাহমুদ এবং মূল কণ্ঠ দিয়েছিলেন স্বপ্না রায়। এছাড়াও কণ্ঠ দিয়েছিলেন আপেল মাহমুদ ও সহশিল্পীরা।

১৯৩০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁয় জন্ম নেয়া গোবিন্দ হালদার ছোটবেলা থেকেই প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার সঙ্গে পরিচিত হন। পরিণত বয়সে স্বাভাবিক কারণেই জড়িয়ে পড়েন বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে। দীর্ঘদিন ধরে কিডনির দূরারোগ্য ব্যধিতে ভুগছিলেন। একপর্যায়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যান গোবিন্দ হালদার। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শনিবার সকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মহান এই গীতিকার।

প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারী ২০১৫

১৮/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: