কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নেত্রকোনায় বিশেষ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত চ্যাপা শুঁটকি

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০১৫
  • সঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে

বাঙালীর রসনা বিলাসে শুঁটকি মাছের জুড়ি নেই। আর তা যদি হয় দেশী জাতের মাছের শুঁটকি তাহলে তো কথাই চলে না। সাধারণত বিভিন্ন প্রজাতির মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। দেশী জাতের মাছের শুঁটকি সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় হাওড়াঞ্চলে।

নেত্রকোনার খালিয়াজুরি, মদন, মোহনগঞ্জ ও কলমাকান্দার বিস্তীর্ণ এলাকা মূলত হাওড়াঞ্চল। এসব উপজেলায় রয়েছে ছোট-বড় অনেক নদী, বিল ও অন্যান্য জলাশয়। আর এসব জলাশয় থেকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ দেশী জাতের মাছ আহরণ করা হয়। এজন্য নেত্রকোনার বৃহৎ হাওড়াঞ্চলকে বলা হয় ‘মৎস্যভা-ার’। এখান থেকে সারাদেশে যেমন কাঁচা মাছ সরবরাহ করা হয়, তেমনি সরবরাহ করা হয় বিপুল পরিমাণ শুঁটকি মাছও। হাওড়ের শুঁটকির কদর সর্বত্র।

শুঁটকি উৎপাদন করা হয় সাধারণত শীত মৌসুমে। বছরের এই সময়ে হাওড়ের নদী-নালা-বিল-ঝিলের পানি শুকিয়ে যায়। ফলে তখন প্রচুর মাছ পাওয়া যায়।

এছাড়া আবহাওয়াও অনুকূলে থাকে। প্রতিবছরের মতো এবারও শীত মৌসুমে হাওড়ের বিভিন্ন জলমহালে শুঁটকি উৎপাদনের ধুম লেগেছে। এসব জলমহাল থেকে প্রতি সপ্তাহে বাজারজাত করা হচ্ছে শত শত মণ শুঁটকি মাছ।

হাওড়ের জলমহাল শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন সকালে জেলেরা জলাশয়ে জাল ফেলে মাছ ধরেন। এর পর বিভিন্ন জাতের মাছ আলাদা করেন। বড় মাছ বিক্রির উদ্দেশ্যে আড়তে পাঠিয়ে দেন। আর ছোট মাছ রেখে দেন শুঁটকি করার জন্য। এজন্য প্রতিটি জলমহালেই গড়ে তোলা হয়েছে শুঁটকির চাতাল। সাধারণত পুঁটি, চিংড়ি, চাঁদা, বেলে, টাকি, শোল, গজার, কাকিলা, চাপিলা, ট্যাংরা, কাচকি প্রভৃতি জাতের ছোট মাছ দিয়ে শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। এছাড়া বড় মাছেরও শুঁটকি হয়। তবে তা পরিমাণে কম। আর সেগুলোর দামও পড়ে অনেক বেশি।

শুঁটকি উৎপাদনের বেশিরভাগ কাজ করেন নারী শ্রমিকরা। এজন্য প্রতিটি শুঁটকির চাতালে মৌসুমভিত্তিক একাধিক নারী শ্রমিক নিয়োগ করা হয়। জেলেরা মাছ ধরার পর তারা প্রথমে সেগুলো কাটা-বাছাই করেন। পরে তা ধুয়ে রোদে শুকাতে দেন। ভাল মতো শুকাতে সাধারণত চার-পাঁচ দিন লাগে। এরপর সেগুলো বস্তায় ভরে পাইকারি বাজারে পাঠানো হয়। খালিয়াজুরি উপজেলার লেপশিয়া বাজার শুঁটকি মাছের জন্য প্রসিদ্ধ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা এখান থেকে শুঁটকি কিনে থাকেন। এছাড়া মোহনগঞ্জ, ছেছড়াখালি, কলমাকান্দা, যাত্রাবাড়ী প্রভৃতি বাজারেও প্রচুর শুঁটকি পাইকারি দরে বিক্রি হয়। এছাড়া খুচরা বিক্রি হয় জেলার প্রায় সব বাজারে।

সাধারণ শুঁটকির পাশাপাশি নেত্রকোনা অঞ্চলে ‘চ্যাপা শুঁটকি’ নামে আরও এক ধরনের বিশেষ শুঁটকি উৎপাদন করা হয়। এর প্রস্তুতপ্রণালী একটু ব্যতিক্রম। সবাই তা তৈরি করতে পারেন না। বিশেষ করে জেলে সম্প্রদায়ের কিছু পরিবার বংশ পরম্পরায় চ্যাপা শুঁটকি তৈরি করেন। চ্যাপা শুঁটকি তৈরি হয় পুঁটি মাছ দিয়ে। কাঁচা পুঁটি মাছ কাটার সময় তা থেকে চর্বি বা তেল জাতীয় পদার্থটি আলাদা করে তা উনুনে জাল দিয়ে রাখা হয়।

অন্যদিকে মাছগুলো রোদে শুকানো হয়। ভালভাবে শুকানোর পর ওই মাছগুলোতে তেল মেখে (পুঁটি মাছের তৈরি তেল) মটকায় ভরে কিছুদিন মাটির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়। এভাবে নির্দিষ্ট কিছুদিন রাখার পর তৈরি হয় চ্যাপা শুঁটকি। অন্যান্য শুঁটকির চেয়ে চ্যাপা শুঁটকির দাম অনেক বেশি। হাওড়াঞ্চলের প্রতিটি ঘরে চ্যাপা শুঁটকি মানেই এক সুস্বাদু খাবার।

অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে নদী-নালা, বিল-ঝিলের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কমছে মাছের উৎপাদন। এক সময় যে হাওড়াঞ্চলকে ‘মৎস্যভা-ার’ বলা হতোÑ দিনে দিনে সেখানেও মাছের আকাল দেখা দিচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে অনেক প্রজাতির মাছ। তবু হাওড়াঞ্চল এখনও তার শুঁটকি উৎপাদনের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলের শুঁটকি মাছ শুধু নেত্রকোনাতেই নয়, রাজধানীসহ প্রায় সারাদেশেই সরবরাহ করা হচ্ছে। পাঠানো হচ্ছে বিদেশে বসবাসরত আত্মীয়-স্বজনদের কাছেও। নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলে যাঁরা বেড়াতে যান, তাঁরা কখনই শুঁটকি মাছ কিনতে ভোলেন না।

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০১৫

১৭/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: