কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এ ব্যবসায় পুঁজি বলতে এনজিও ঋণ আর ধারকর্জ ॥ কুয়াকাটার শুঁটকির ঐতিহ্য দীর্ঘদি

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০১৫
  • মেজবাহউদ্দিন মাননু, কলাপাড়া থেকে

কুয়াকাটার শুঁটকির রয়েছে আলাদা সুখ্যাতি। কোন ধরনের কীটনাশক ব্যবহার হয় না। প্রাকৃতিকভাবে শুকিয়ে করা হয় বাজারজাত। ফলে এর রয়েছে আলাদা স্বাদ। স্থায়ী পল্লী নেই। তবুও ৪০ বছর ধরে চলছে শুঁটকির সফল ব্যবসা। প্রায় হাজার পরিবার ফি-মৌসুমে এখানে শুঁটকি ব্যবসার মধ্য দিয়ে আয় করছে লাখ লাখ টাকা। সীমাহীন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পেশাটি রয়ে গেছে মৌসুমীনির্ভর। তবে খুচরা বিক্রির অন্তত ৫০টি দোকান নিয়ে আলাদা বাজার গড়ে ওঠায় এ ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। কুয়াকাটায় আসা পর্যটক-দর্শনার্থীর কাছে প্রতিদিন শতাধিক কেজি শুঁটকি বিক্রির সুযোগ রয়েছে। স্থানীয় লোকজনও এখন বিভিন্ন ধরনের শুঁটকির ভর্তা খাওয়ার প্রতি ঝুঁকেছে। সৃষ্টি হয়েছে ১২ মাস শুঁটকির স্থানীয় চাহিদা।

কুয়াকাটা সৈকতের পশ্চিমদিকে মাঝিবাড়ি, খাজুরা ছাড়াও খালগোড়া, গঙ্গামতি, কাউয়ার চর ধুলাসারে রয়েছে শুঁটকির ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ব্যবসা। একেকটি স্পটে ৫/৬ থেকে ১০/১২ ব্যবসায়ী মৌসুমের শুরুতেই (কার্তিক মাসে) নামেন এ ব্যবসায়। চলে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। বর্ষায় আর চলে না। প্রকৃতিকে ভর করেই এ ব্যবসায় কেটে গেছে অন্তত তিন যুগেরও বেশি সময়।

মৌসুমের শুরুতেই ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে পাঁচ/ছয়জন শ্রমিক নিয়ে একেকজনে শুরু করেন ব্যবসা। ঝুপড়িসংলগ্ন মাছ শুকানোর মাচান তৈরি করতে হয়। বাঁশের মাচান বানানো, জাল-নৌকা কেনা এবং দাদন নিয়ে একেকজন ব্যবসায়ী অন্তত দশ লাখ টাকার পুঁজি দিয়ে শুরু করেন এ ব্যবসা। সাধারণত লইট্টা, ফাহা, ফালিসা, চাবল, কোরাল, হাঙ্গর, ছুরি, পোমা, চান্দাকাটা, চিংড়ি, লাক্ষ্মা, নোনা ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শুঁটকি করা হয় কুয়াকাটা ও তার আশপাশের চরগুলোতে।

শুঁটকি ব্যবসায়ী ইদ্রিস হাওলাদার, দেলোয়ার খলিফা, তৈয়ব আলী, কালাম ও কুদ্দুস জানান, মৌসুমের শুরুতে প্রচুর মাছ পাওয়া গেছে। এখন মাছ কমে গেছে। এছাড়া হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতায় এখন ব্যবসায় সমস্যা হচ্ছে। রয়েছে জলদস্যুদের ভয়, জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছে না। ব্যবসায়ীদের মন্তব্য প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও রয়েছে পুঁজি সঙ্কটসহ বহুমুখী সমস্যা। স্থানীয়দের দেয়া তথ্যানুসারে শুঁটকি ব্যবসার সঙ্গে রয়েছে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ। মাছ ধরা, জাল থেকে মাছ ছড়ানো। শুঁটকির জন্য মাছ কাটা এবং শুকানো। এরপরে পরিবহন শ্রমিকেরও প্রয়োজন। কুয়াকাটাসহ কলাপাড়া উপজেলায় শুঁটকি ব্যবসায় প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে প্রতি বছর কার্তিক থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত অন্তত এক হাজার পরিবারের কর্মসংস্থান জোটে। ব্যবসায়ীদের দাবি, তাদের শুঁটকিতে কোন ধরনের কীটনাশক ব্যবহৃত হয় না। প্রাকৃতিকভাবে রোদে শুকিয়ে পরিচ্ছন্নতার মধ্য দিয়ে করা হয় শুঁটকি।

দেখা গেছে, কুয়াকাটা মূল সৈকতের পশ্চিমে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরেই একটি শুঁটকি পল্লী। সাতজন ব্যবসায়ী বাসা করেছেন। কেউ মাছ আহরণ শেষে ধোয়ার কাজ করছেন। কেউ বড় মাছ কাটছেন। লবণ মিশিয়ে মাচানের ওপরে বিছিয়ে শুকানোর কাজ চলছে। কেউবা শুকানো শুঁটকি বস্তায় ভরছেন। পরে সংলগ্ন বাসায় সংরক্ষণ করে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন মোকামে চালান করা হয় শুঁটকি। ব্যবসায়ী কালাম জানান, মৌসুমের প্রথম দিকে প্রচুর মাছ পাওয়া গেছে। এখন আকাল চলছে। এছাড়া হরতাল-অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতায় মোকামে মাছ পাঠাতে পারছেন না। কখনও নৌপথে মোকামে মাছ পৌঁছাতে পারলেও দাম কম পাওয়া যায়। গড়ে সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত কেজি দরে বিক্রি হয় শুঁটকি মাছ। এখন মৌসুমের মাত্র দুই মাস বাকি। ব্যবসায় এ বছর লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন সবাই। তবে স্থানীয়ভাবে শুঁটকির খুচরা বাজার গড়ে ওঠায় কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন। কেউ কেউ আবার কুয়াকাটা সৈকতের পাশে শুঁটকির খুচরা বিক্রির দোকান দিয়েছেন। ব্যবসায়ী ইদ্রিস জানান, ধার-দেনা কিংবা চড়া সুদে টাকা এনে তাঁরা শুঁটকির ব্যবসা শুরু করেন। সরকারীভাবে ব্যাংক থেকে বিশেষ লোন দেয়ার দাবি তাঁর।

প্রায় ৪০ বছর ধরে কুয়াকাটায় শুঁটকির ব্যবসা চলে আসছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কোন পল্লী গড়ে তোলা হয়নি। একেক বছর একেক জায়গায় ব্যবসায়ীরা পল্লী সাজায়। বিক্রির জন্য নেই কোন নির্দিষ্ট মার্কেট। আর পুঁজি বলতে এনজিওর লোন কিংবা স্থানীয়ভাবে ধার-কর্জ। এ বছর কুয়াকাটা সৈকতের পশ্চিম দিকে দুই কিলোমিটার দূরে সাত ব্যবসায়ীর একটি পল্লী গড়ে ওঠে। আবার প্রায় সাত মাইল দূরে লেম্ফুর চরে কয়েক ব্যবসায়ী মিলে আরেক পল্লী করেছেন। এছাড়া মহিপুর ইউনিয়নের খালগোড়ায় রয়েছে একটি ছোট্ট শুঁটকি পল্লী। এভাবে গঙ্গামতি, চরধুলাসার, কাউয়ারচরে শুঁটকি পল্লীগুলো অস্থায়ী ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। যে যেভাবে পারছে ব্যবসা করছেন। কিন্তু স্থায়ী কোন শুঁটকি পল্লী আজও গড়ে ওঠেনি। ব্যবসায়ী নজরুল হাওলাদার জানান, স্থায়ীভাবে সরকারী উদ্যোগে শুঁটকি পল্লীর জন্য জায়গা নির্ধারণ করা, বিক্রির জন্য পৃথক বাজার করে দেয়। ব্যাংক থেকে স্বল্পসুদে পর্যাপ্ত ঋণের ব্যবস্থা না করলে শুঁটকির এ ব্যবসা পেশা হিসেবে ধরে রাখা সম্ভব নয়। নইলে শুঁটকির ব্যবসার সঙ্গে এখানে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত তিন শ’ পরিবারসহ পরোক্ষভাবে জড়িত আরও সহস্রাধিক পরিবার এ ব্যবসায় টিকে থাকতে পারবে না।

এ ব্যাপারে কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও বিচ ম্যাজেমেন্ট কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, শুঁটকি ব্যসায়ীদের নিজস্ব পল্লী এবং শুঁটকি বিক্রির নির্দিষ্ট বাজার করে দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০১৫

১৭/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: