কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শিবিরের পরামর্শেই শেষ পর্যন্ত ছাত্রদলকে ঐক্য গড়ার তাগিদ খালেদার

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০১৫
  • মাঠপর্যায়ের আপত্তি সত্ত্বেও সে মতেই বৃহত্তর ‘ছাত্রঐক্য’ গড়তে যাচ্ছে ছাত্রদল

বিভাষ বাড়ৈ ॥ শেষ পর্যন্ত জামায়াত-শিবিরের কথা মেনেই ছাত্র সংগঠন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। শিক্ষাঙ্গনে জনরোষ থেকে রক্ষা পেতে এতদিন শিবিরের সঙ্গে চলায় আপত্তি থাকলেও এবার বেগম জিয়ার নির্দেশ মেনে তাদের সঙ্গেই ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে বিএনপির ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল। জানা গেছে, শিবিরের পরামর্শ মেনেই বিএনপি চেয়ারপার্সন জামায়াতসহ ২০ দলের ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য’ গঠন করতে ছাত্রদল নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে শিবিরের পরামর্শ অনুসারে কথিত সর্বদলীয় ঐক্য গঠন ছাড়াও ক্যাম্পাসে কর্মকা- পরিচালনায় শিবিরের সঙ্গে মুখোমুখী অবস্থানে না যাওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন চেয়ারপার্সন। ফলে ছাত্রদলের একটি অংশ বিশেষত মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের আপত্তির মধ্যেই এগোচ্ছে শিবিরের সঙ্গে ছাত্রদলের ঐক্যের প্রক্রিয়া।

সূত্র বলছে, খালেদা জিয়ার গ্রীন সিগন্যাল পাওয়ায় ছাত্রদলের সাধারণ নেতাকর্মীদের অনেকের আপত্তি সত্ত্বেও ২০ দলীয় জোটের কিছু ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে আত্মপ্রকাশ হচ্ছে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের। এ ঐক্য ফোরামের মূল চালকের ভূমিকায় থাকবে ছাত্রদল ও শিবির। উভয়ের সমন্বয়ে সব ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হবে। এছাড়াও ঢাকা মহানগরের প্রত্যেক ওয়ার্ড ও থানায় সমন্বয় কমিটি থাকবে। যারা রাজধানীতে কার্যকর আন্দোলনের ভূমিকা রাখতে পারে। ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, আমরা ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলেছি। বিএনপি চেয়ারপার্সনের নির্দেশের পর ছাত্রদলও এখন মনে করছে সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য জরুরী। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেই সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের দাবি উঠেছিল দাবি করে শিবির-ছাত্রদলের নেতারা বলছেন, দাবি অনেকদিন থেকে উঠলেও ছাত্রদল ঐক্য গঠনে অনীহা প্রকাশ করে। ফলে ছাত্রঐক্য গঠন করা সম্ভব হয়নি। এর আগে গত প্রায় দুই বছর ধরে নানা আলোচনা সমালোচনার পর কিছুদিন আগে ছাত্রদলের কমিটি গঠন করেছিলেন খালেদা জিয়া। যে কমিটি নিয়ে মাসের পর মাস ধরে বিদ্রোহীদের আন্দোলন চলছে। ওই কমিটিও ছাত্র শিবিরের পরামর্শ অনুসারে করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ছাত্রদলের বিদ্রোহী নেতাকর্মীরা। এর আগে ২০০১ সালে আওয়ামী সরকারের পতনের জন্য সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য বিশেষ ভূমিকা রাখলেও বর্তমানে তার কোন কার্যক্রম নেই। এর পেছনে ছাত্রদলকেই বেশি দায়ী করে শিবির। সাবেক ছাত্রদল সভাপতি নাসিরুদ্দিন পিন্টু ও হাবিবুন নবী খান সোহেল সভাপতি থাকাকালীন ছাত্রদল-শিবিরের মধ্যে বোঝাপড়াটা ভাল ছিল। তখন শিবিরের সভাপতি ছিলেন বর্তমান জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল। এরপরে ছাত্রদলের সভাপতি যাঁরা হয়েছেন তাঁরা শিবিরের সঙ্গে ঐক্য করতে আপত্তি জানান। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে শিবিরের প্রস্তাব গেলেও ছাত্রদলের সাধারণ নেতাকর্র্মীদের পক্ষ থেকে ঐক্যে আপত্তি জানিয়ে বলা হয়েছে, জামায়াত-শিবিরের কার্যক্রম দেশের সাধারণ শিক্ষার্থীরা গ্রহণ করে না। শিবিরের সঙ্গে থাকলেও শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রদলও সাধারণ শিক্ষার্থীদের রোষের মুখে পড়বে। কাজেই আমরা এমন কারও সঙ্গে জোট করব না, যাতে কেউ আমাদের নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। বর্তমানে যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে। বিএনপি কেন জামায়াতের সঙ্গে জোট করেছে তা নিয়ে এমনিতেই ছাত্রসমাজের মধ্যে নানা প্রশ্ন আছে। এ অবস্থায় শিবিরের সঙ্গে জোট করলে সাধারণ ছাত্রদের কাছে ছাত্রদলের আর কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না। ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের এমন অবস্থানের কারণেই মূলত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে শিবিরের সঙ্গে ঐক্য প্রক্রিয়া বন্ধ হয়েছিল। ছাত্রদলের অনাগ্রহের কারণে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এক পর্যায়ে ছাত্রদলকে বাদ দিয়েই সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল শিবির।

শিবির নেতারা তখন ছাত্রদল বাদে ২০ দলীয় জোটের অন্যান্য ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে বৈঠকও করেছিল। কিন্তু গত এক বছরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে শিবির নেতাদের একাধিক বৈঠক আর সে বৈঠকে শিবিরের সহযোগিতা চাওয়ার পর পরিস্থিতি পাল্টেছে। একাধিক বৈঠকে আন্দোলনের মাঠে শিবিরের সহযোগিতা চান বিএনপি চেয়ারপার্সন। মূলত এর পরই ছাত্রদলের নতুন কমিটি ও ছাত্র ঐক্য গঠনের জন্য উদ্যোগ নিতে খালেদা জিয়ার কাছে প্রস্তাব তুলে ধরেন শিবির নেতারা।

ছাত্রদলের একটি বড় অংশ এখনও নিজেদের অস্তিত্বের জন্যই শিবিরের সঙ্গে ঐক্যের বিরুদ্ধে। শিবিরের প্রতি খালেদা জিয়ার মনোভাবে খুশি নয় এ অংশটি। তবে তাঁরা বলছেন, ‘শিক্ষাঙ্গনে গ্রহণযোগ্যতা হারানোর আশঙ্কা আছে তবু ম্যাডামের নির্দেশ শিবিরের সঙ্গে চলতে হবে’। বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে কি নির্দেশ দেয়া হয়েছে? এমন প্রশ্নে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক এক সেক্রেটারি বলছিলেন, ম্যাডাম এ নিয়ে কয়েকবার কথা বলেছেন। সাধারণ নেতাকর্মী বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ের আপত্তির কথা তুললে বলা হয়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বাঁচা-মরার আন্দোলন চলছে। সুতরাং আন্দোলনের স্বার্থেই এখন সব দল ও মতপার্থক্য ভুলে ঐক্য গড়ার কথা ভাবতে হবে। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের শিবির নির্ভরতার কারণে ছাত্রদলের মাঠ পর্যায়ের ক্ষোভের মাঝেই ঐক্যের বিষয়টি এগিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে বিএনপির চেয়ারপার্সনের অবস্থান শিবির নির্ভর হলেও ঐক্য নিয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে ছাত্রদলের কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ের একটি অংশের মাঝে। এ অংশের সঙ্গে একমত বিএনপির কয়েক নেতাও। কিছুদিন আগে ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করা এক নেতা নাম প্রকাশ করতে সাহস না পেলেও বলছিলেন, শিবিরের সঙ্গে ছাত্রদলের জোট করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। সাধারণ নেতাকর্মীরাও এটি চায় না। কারণ, শহীদ জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। অতীতে ছাত্রদল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। কাজেই আমরা এমন কারও সঙ্গে জোট করব না, যাতে কেউ আমাদের নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। তিনি জানান, ছাত্রঐক্য গঠনের বিষয়ে কথাবার্তা শুরুর পরই সারা দেশের ছাত্রদলের নেতারা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সারাদেশের নেতাকর্মীরা বলেছেন, আসলে ছাত্রদলকে শিবিরের কাছে লিজ দেয়ার একটা প্রক্রিয়া চলছে। অথচ ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের আদর্শ পুরোপুরি আলাদা। দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রদল অতীতে ছাত্রশিবির তাড়িয়েছে। এমনকি বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় থাকার সময়ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের সঙ্গে ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ হয়েছে। অনেক স্থানে শিবিরের হামলায় ছাত্রদলের নেতারা হতাহতও হয়েছেন। শিবিরের সঙ্গে জোট করলে সাধারণ ছাত্রদের কাছে ছাত্রদলের আর কোন গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের একজন যুগ্ম-আহ্বায়ক বলেন, ২০ দলের সমাবেশে বিএনপির নেতাদের উপস্থিতিতে মঞ্চের সামনের দিকে বসাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের নেতাদের ওপর এখনও ছাত্রশিবির হামলা চালায়। যদি জোট করা হয়, তখন আর ছাত্রদলের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাধারণ শিক্ষার্থীরা শিবিরের সঙ্গে আমাদেরও প্রত্যাখ্যান করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানেও কখনই কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। ঠিক এমন অবস্থায় ছাত্রঐক্য গঠনের শেষ পর্যায়ে এসেও উদ্দেশ্য ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা করছে শিবির। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠায় বিএনপির কয়েক নেতার ওপর ক্ষেপেছে ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। এ ক্ষোভের বিষয়টি ইতোমধ্যেই শিবিরের ফেসবুক পেজ ‘বাঁশের কেল্লা’য় পোস্ট করা মন্তব্যেই পরিষ্কার করা হয়েছে। সম্প্রতি পোস্ট করা এক মন্তব্যে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে বিএনপির একটি অংশের নেতাদের। বলা হয়েছে, ‘জামায়াত-বিএনপি যদি জোট করতে পারে। শিবির-ছাত্রদল জোট করলে কার কাপড় খুলে পড়ে?? বিএনপির ভিতর এক ধরনের নেতা আছে হয় যাঁরা পূর্বে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ করত না হয় তাঁরা আওয়ামীদের সঙ্গে বেয়াই থেকে শুরু করে মামা-খালু ,ভাগ্নি চাচা এসব লতা-পাতা জড়ানো সঙ্গে অবৈধ সম্পদের মালিক নেতারা রাজনীতি বিএনপি করলেও এদের কলিজার ভেতর আওয়ামী প্রীতি/দুর্বলতা রয়ে গেছেই, তাঁরা আওয়ামী লীগের ভাবধারা থেকে বের হতে পারছে না,... এরা জামায়াতের বিষয়ে অনাগ্রহ দ্যাখায়, তুলে নিয়ে আসে মুক্তিযুদ্ধকে। আরে শালা, দুনিয়ার অন্য দেশ কি স্বাধীন হয়নি?? সেসব দেশে রাজাকার ছিল না?/ তাঁরা কি রাজাকার রাজাকার করে মাতম করছে?? স্বাধীন করে কি ঘোড়ার ডিম পেয়েছি আমরা?? দেশে গণতন্ত্র আছে?? অর্থনৈতিক মুক্তি হয়েছে?? বাঁশের কেল্লায় আরও বলা হয়েছে, ‘বিএনপির ভেতর থাকা আওয়ামী আদলে গড়ে ওঠা নেতারা চান না জামায়াতকে নিয়ে সরাসরি আন্দোলনে যাওয়া, কিন্তু কেন?/ তাঁরা সেখানে মুক্তিযুদ্ধের বিষয় তুলে নিয়ে আসেন, আসলে এসব নেতাদের মাধ্যমে হাসিনার ইনডাইরেক্ট শেল্টার দেয়া ছাড়া কিছুই না, তারা চান না জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে থাকুক, কারণ জামায়াতকে আলাদা করতে পারলে বিএনপিকে দুর্বল করতে সুবিধা হয়। তাঁরা আবার শিবিরের সঙ্গে ছাত্রদলের ঐক্য করতে বাধা দিচ্ছে, আরে বাবা জামায়াতের সঙ্গে যদি বিএনপি জোট করতে পারে শিবির ছাত্রদল জোট করলে কার কাপড় খুলে পড়ে?? হ্যাঁ পড়ে– আওয়ামীপন্থী বিএনপি নেতাদের, বিএনপিকে এই বলয় থেকে বের হয়ে আসতে হবে। কিন্তু এসব ফাজিল নেতা পরিকল্পিতভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন শক্তিশালী করতে বাধা দিয়ে দিন দিন বিএনপিকে শেষ করে দিচ্ছে’।

এর আগে গত বছরের মাঝামাঝি একবার ছাত্রশিবিরের পরামর্শ নিয়ে ছাত্রদলকে সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। কেবল তাই নয়, জামায়াত-শিবিরের পছন্দের শিক্ষক-সাংবাদিকদের হাতেই দেয়া হয়েছিল ছাত্রদল সংস্কারের দায়িত্ব। এতে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে বিএনপির ছাত্র সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মাঝে। ঘটনাকে নজিরবিহীন ও অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করে আপত্তি তুলেছে নেতাকর্মীদের বড় একটা অংশ। ঘটনা নিয়ে দুইভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল ছাত্রদল। আবার সেই একই পথে এবার শিবিরে চাওয়া অনুসারে ছাত্রদলের বিষয় সিদ্ধান্তে হতাশ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।

প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারী ২০১৫

১৭/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: