রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

প্রতিকথা ও গল্পকার

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • ছোট কাগজ

আমাদের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে লিটল ম্যাগাজিন নামের নিভৃতচারী কিছু সাহিত্যপত্রের মৌন-নির্যাস। নবীন, প্রথাবিরোধী ও সৃষ্টিশীল লিখিয়েদের জন্য লিটল ম্যাগাজিনই হচ্ছে উপরে উঠার প্রথম ধাপ এবং একমাত্র আশীর্বাদ-সিঁড়ি। আকারে-প্রকারে ছোট হতে পারে অথবা রমরমা নগদী বাজারে তার জনপ্রিয়তার বালাই নাও থাকতে পারে কিংবা পথশিশুর মতো জন্ম তার ফুটপাতে হতে পারে কিন্তু গুণীদের সমাজে লিটল ম্যাগাজিনের গুরুত্ব অপরিসীম এবং আকাশচুম্বী। এক্ষেত্রে কিংবদন্তি লিটলম্যাগ সম্পাদক কবি বুদ্ধদেব বসুর বক্তব্যটাই প্রণিধানযোগ্য। তিনি ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে ‘দেশ’ পত্রিকার মে সংখ্যায় ‘সাহিত্যপত্র’ শিরোনামের চমৎকার একটি প্রবন্ধে লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন- ‘এক রকমের পত্রিকা আছে যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটাবার জন্য কিনি, আর গন্তব্য স্টেশনে নামার সময় ইচ্ছে করে গাড়িতে ফেলে যাই- যদি না কোন সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত এবং বিব্রত করেন আমাদের। আরেক রকমের পত্রিকা আছে যা স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাথে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয় কিন্তু যা একবার হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেয়ে চেয়ে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিন-গন্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি- জল, পোকা আর অপহারকের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্য। যে সব পত্রিকা এই দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্গত হতে চায়- কৃতিত্ব যেটুকুই হোক, অন্তত নজরটা যাদের উঁচুর দিকে, তাদের জন্য নতুন একটা নাম বেরিয়েছে মার্কিন দেশে, চলতি কালে ইংরেজী বুলিতে এদের বলা হয়ে থাকে লিটল ম্যাগাজিন।’

তারই ধারাবাহিকতায় দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা এমনকি অজপাড়া গাঁ থেকেও প্রতিনিয়ত প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য লিটল ম্যাগাজিন। যাদের আদরণীয় নাম হচ্ছে লিটলম্যাগ। সম্প্রতি প্রকাশিত চমৎকার কয়েকটি ছোট কাগজের আলোচনা নিচে তুলা ধরার প্রয়াস পাওয়া গেল :

প্রতিকথা

সম্প্রতি প্রকাশিত হলো তরুণ লেখক হানিফ রাশেদীনের সম্পাদনায় ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র ‘প্রতিকথা’র চতুর্থ সংখ্যা। প্রতিকথার বর্তমান সংখ্যাটি বিভিন্ন কারণেই ভাল লেগেছে। কবিতার নানামাত্রিক বির্তকের মুহূর্তলগ্নে এসে একঝুড়ি রুচিশীল কাব্য-উপহার হাতে নিয়ে পাঠকের সামনে এসেছে দাঁড়িয়েছে সাহিত্যের ছোটকাগজ প্রতিকথার চর্তুথ সংখ্যা। এ সংখ্যায় বেশ কয়েকটি গল্পও চোখে পড়ার মতো। প্রতিকথার আলোচ্য সংখ্যায় গুচ্ছকবিতা লিখেছেন-মঈন চৌধুরী, মুক্তি ম-ল, অরবিন্দ চক্রবর্তী, আমিনুর রহমান সুলতান, শামীম সিদ্দিকী, মোহাম্মদ আন্ওয়ারুল কবীর, আনোয়ার কামাল, আশরাফুল ইসলাম দুর্জয়, নাজনীন খলিল, বাবুল হোসাইন, জিয়াবুল ইবন, মমিন মানব, কামরুল বসির, মুহাম্মদ আমানুল্লাহ, রাকিব মোজাহিদ ও উপল বড়ুয়া। একক কবিতা লিখেছেন- পরাগ রিছিল, আহমেদ আলাউদ্দিন, হাসানুজ্জামান, চন্দনকৃষ্ণ পাল, লতিফ জোর্য়াদার, শান্তনু সুমন, সিজন নাহিয়ান, মাহবুবা ফারুক, এমদাদুল আনোয়ার, সালেহীন বিপ্লব, শাহ মাইদুল ইসলাম, রাকিবুল হায়দার, আহমেদ সুজন, তুষার কাব্য, মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সজীব, রাইসুল ইসলাম নয়ন, অশ্রু হাসান, মেহেদী আরজান ইভান, শেখ আহমেদ ফরহাদ, অদিতি মৃন্ময়, শায়মা হক প্রমুখ। এর বাইরেও সিয়েরা স্টেটনের কবিতা অনুবাদ করেছেন দিলারা রিঙকি। চলতি সংখ্যার মঈন চৌধুরী, মুক্তি ম-ল এবং মোহাম্মদ আন্ওয়ারুল কবীরের বেশ কিছু কবিতাই অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং আকর্ষণীয়। প্রতিকথার এ সংখ্যায় শক্তিমান কথাকার সালাম সালেহ উদদীনের ‘ঝড় অথবা বৃষ্টি যা পারে না’ শিরোনামের চমৎকার একটি গল্পের পাশাপাশি আরও যাদের লেখা ভাল লেগেছে তাঁরা হলেন- চার্বাক সুমন, এসএম মামুনুর রহমান, পার্থ তালুকদার, এটিএম মোস্তফা কামাল, মাসুম আহমেদ প্রমুখ। চলতি সংখ্যায়- ‘মনঃসমীক্ষণ ও জ্যঁ লাঁকা পর্ব-১’ শিরোনামে নজরুল ইসলাম শৈলীর অসাধারণ একটি প্রবন্ধসহ কালজয়ী কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হকের দর্শনচিন্তা সম্পর্কে বেশ গোছানো একটা লেখা লিখেছেন আনিসুজ্জামান মানিক, ‘আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা’ শিরোনামে লিখেছেন আহমেদ রাসেল এবং ‘মুক্তিযুদ্ধের নকল বই ও পুরস্কার প্রসঙ্গে’ শিরোনামে স্বল্পদৈর্ঘ্য তথ্যবহুল ও সংরক্ষণযোগ্য গবেষণাধর্মী একটি রচনা লিখেছেন হোসেন শহীদ মজনু। তবে লেখাটি আরও বিস্তর হলেও ক্ষতি ছিল না। ব্যক্তিগত গদ্য এবং বই আলোচনা লিখেছেন যথাক্রমে- মিনাজ মুর, আহসান হাবীব ও জাবেদ হোসেন। কিন্তু কিছু মুদ্রণপ্রমাদ ব্যতিরেকে প্রতিকথার চলতি সংখ্যাটি অত্যন্ত মুগ্ধকর এবং যতœশীল একটি সাহিত্যভা-ার। প্রতিকথার এই সংখ্যার প্রচ্ছদ এঁকেছেন- গুণী চিত্রশিল্পী মোস্তাফিজ কারিগর। চতুর্থ সংখ্যার মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ৪০ টাকা।

গল্পকার

ইংরেজী নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে বছরের সূচনালগ্নেই প্রকাশিত হলো মুহাম্মদ মহিউদ্দিন সম্পাদিত কথাসাহিত্যনির্ভর ছোটকাগজ গল্পকার। প্রথমবারের মতো প্রকাশিত গল্পকারের আলোচ্য সংখ্যায় চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘হাফিজুর রহমানের অগ্রযাত্রা’ শিরোনামে জীবনধর্র্মী চমৎকার একটি গল্প এবং জনপ্রিয় কথাকার হাসান আজিজুল হকের শিক্ষণীয় একটি সাক্ষাতকার ছাপানো হয়েছে। গল্পকারের এ সংখ্যায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে দিলওয়ার হাসানের অত্যন্ত সূক্ষ্মভাষায় অনুদিত আইজ্যাক বাশেভিস সিঙ্গারের ক্যাফেটেরিয়া গল্পটি। তাছাড়া এ সংখ্যায় তরুণ গল্পকার মনি হায়দারের ‘গল্প লেখার গল্প’ এবং সন্তোষ কুমার শীলের ‘ইলিশ’ ও সতীশ চন্দ্র সরকারের ‘ফজল মাস্টারের দিনকাল’ শিরোনামের বাস্তবতাস্পর্শী একেবারেই সহজ-সরল ভাষায় লেখা অত্যন্ত সুখপাঠ্য তিনটি গল্পও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে গল্পকারের প্রথম সংখ্যার আরও একটি চমৎকার সংযোজন হলো, কবীর চৌধুরী কর্তৃক অনুলিখন ‘লম্বু, মোটু আর তীক্ষèচক্ষু’ শিরোনামে চেকোস্লোভাকিয়ার একটি লোকগল্প এবং সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক আর. এফ. এ. সুলীপ্রধোম সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ বিরল একটি নিবন্ধ। অবশ্যই আর. এফ. এ. সুলীপ্রধোমের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি ও তাঁর বর্ণাঢ্য সাহিত্যজীবন সম্পর্কে অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণটি পাঠ করে নবীন লেখক, গবেষকরা কম-বেশি তথ্য-প্রেরণা পাবেন। এ সংখ্যায় আরও যাদের লেখা ভাল লেগেছে তাঁরা হলেন- রফিক আনোয়ার, জান্নাতুল ফেরাদউস, মুহাম্মদ মহিউদ্দিন প্রমুখ। তবে গল্পকারের ছাপামানের দিকে আরও একটু নজর রাখা বাঞ্ছনীয় ছিল এবং সাহিত্যের নানাবিধ খুঁটিনাটি সম্পর্কে সুন্দর সুন্দর তথ্য-সংযোজন থাকলেও মাঝে মাঝে অপ্রয়োজনীয় কিছু জিনিসও দৃষ্টি এড়াতে পারেনি। গল্পকারের প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ করেছেন : সোহেল আশরাফ। মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র ৩৫ টাকা।

রফিকুজ্জামান রণি

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: