কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘চির উন্নত শির’ এক নাট্যযোদ্ধা

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • মিলন কান্তি দে

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের এক ক্ষণজন্মা নাট্যপ্রতিভা মমতাজউদ্দীন আহমদ; দ্রোহী চেতনায় শানিত হয়েছে তাঁর একেকটি নাটক। অশুভ প্রতিক্রিয়াশীল চক্রকে তিনি ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপের কশাঘাতে জর্জরিত করেছেন। আমজনতাকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করেছেন শিল্পের লড়াই। তাঁর সৃজনশীল চিন্তা-চেতনায় বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা। স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তাঁর সৃষ্টি সম্ভার। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, চারিত্রিক দৃঢ়তা, স্পষ্টবাদিতা তাঁর অঙ্গের ভূষণ। অসত্য, অপশক্তি ও দেশদ্রোহীর বিরুদ্ধে তিনি ‘চির দুর্দম দুর্বিনীত।’ সংখ্যাতীত দর্শক ও পাঠক সমাজের কাছে তিনি ‘চির উন্নত শির’ এক নাট্যযোদ্ধা।

১৯৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় জন্ম মমতাজউদ্দীনের। পরে তাঁদের পরিবারটি স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে আজকের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ভোলাহাট থানার বজরাটেক গ্রামে। বাবা-কলিমউদ্দিন আহমদ, মা-সখিনা খাতুন। আগামী রবিবার এই অকুতোভয় নাট্য সেনানীর ৮০তম জন্মদিন। এ উপলক্ষে নানা আয়োজনে সরব থাকবে সংস্কৃতি অঙ্গন। শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধাঞ্জলি ও উপহার গ্রহণের মধ্য দিয়ে সিক্ত হবেন লোকনন্দিত বরেণ্য নাট্যকার মমতাজউদ্দীন আহমদ। আমরাও তাঁকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাই এবং একান্ত কামনাÑ আরও দীর্ঘ দিবস-রজনী তিনি আমাদের আলোকিত করুন।

দুই

কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতার পেশাকে তিনি মহান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। বিগত শতাব্দীর ’৬০-এর দশকে চট্টগ্রাম সরকারী কলেজে অধ্যাপনাকালে শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে তিনি আলোচিত ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেন। তাঁর প্রতিভা ও মেধার উন্মেষ ঘটে বন্দর নগরী চট্টগ্রামেই। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তিনি। একাধারে শিক্ষক, গবেষক, আবৃত্তিকার, উপস্থাপক, নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা ও কলাম লেখক। ১৯৯৬-৯৭ সালে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত রাজনৈতিক-সমাজ-সংস্কৃতির ওপর তাঁর তীর্যক, শাণিত ও রসাত্মক লেখাগুলো বিপুল পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেছিল। শিল্প-সংস্কৃতির প্রতিটি মাধ্যমেই তিনি দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে সবকিছুকে অতিক্রম করেছে তাঁর নাট্যপ্রতিভা, নাট্যকার-নির্দেশক-অভিনেতা। এক্ষেত্রে নাট্যকার রূপে ভীষণভাবে আলোড়িত ও স্বাতন্ত্র্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন দর্শক হৃদয়ে থাকবে।

তাঁর উল্লেখ যোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে- ‘বর্ণচোর’ ‘বিবাহ’ ‘হরিণ চিতা চিল’ ‘কী চাহ শঙ্খচিল’ ও ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’র মতো প্রতিরোধের নাটক। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের আগেই ‘এবারের সংগ্রাম’ ও ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ নামে দু’টি নাটক মঞ্চায়নের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাট্যধারার সূচনা করেন তিনি। বিদ্রƒপ, কটাক্ষ, স্যাটায়ার, হিউমারÑ এ সবই হচ্ছে তাঁর নাট্য সংলাপকে গতিময় ও নাট্যোৎকণ্ঠা সৃষ্টি করার প্রধান অবলম্বন। সংলাপের শাণিত শক্তি দিয়ে বিক্ষুব্ধ বাংলায় উড়ে বেড়ানো শকুনের বংশ ধ্বংস করতে চেয়েছেন তিনি। আবার এ বাংলার জন্য, বাংলার নির্যাতিত মানুষের জন্য তাঁর ব্যাকুলচিত্তের বহিঃপ্রকাশও আমরা প্রত্যক্ষ করি অনেক নাটকে। তাঁর আপাদমস্তক চরিত্রটিও যেন বিদ্রোহের প্রতীক। এ বিদ্রোহ জুলুমবাজের বিরুদ্ধে। যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে। এবারের সংগ্রাম নাটকে ‘মানুষের’ কণ্ঠে শেষ সংলাপটি হচ্ছেÑ ‘খুঁজে বের করব জুলুমবাজকে। আমার ছেলের রক্তের দাম আমি কড়ায়গ-ায় আদায় করে নেব।’ স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা নাটকে একটি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চরিত্রের নাম নূর মোহাম্মদ। সে যখন বলে ‘প্রয়োজন হলে লক্ষ মানুষের জীবন যাবে তবু দেশ ভাগ করা চলবে না’, তখন রচয়িতা দর্শকের পক্ষ থেকে বলেনÑ ‘প্রেমের জ্বালা আর স্বাধীনতার আগুন কখনও নিভে যাবে না।’

তিন

নাট্যকার মমতাজউদ্দীন আহমদকে একদা প্রত্যক্ষ করি ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্পেও ১৯৭৫ সালের ১৩ জুলাই। চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত হয় এ দেশের যাত্রাশিল্পের ওপর প্রথম সেমিনার। উদ্যোক্তা-অধুনালুপ্ত বাংলাদেশ পরিষদ চট্টগ্রাম কেন্দ্র। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ওই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করার। মমতাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন প্রধান আলোচক। ৪০ বছর আগে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যাত্রা একটি মহান শিল্পÑ এটি শুধু মুখে বললে হবে না, কাজে দেখিয়ে দিতে হবে। যাত্রাকে বাঁচাতে হলে আধুনিক কোন বিষয়ের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করা যাবে না। যাত্রা যুগ যুগ ধরে চলবে তার নিজস্ব টেডিশনে। ৪ দশক পরেও সত্য কথা বলতে হচ্ছে, যাত্রার ঐতিহ্যগত ধারা অসাধু বাণিজ্যলোভী প্রদর্শকদের হাতে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না (কয়েকজন অবশ্য ভাল কাজ করছেন)। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও প্রশাসন (কিছু ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত বাদে) মৃত সৈনিকের ভূমিকা পালন করছে। এ ব্যাপারে দ্বিতীয় জাতীয় যাত্রা উৎসবের স্মরণিকায় ‘যাত্রার বিবিধ অর্থে’ নিবন্ধে তিনি লিখেছেনÑ ‘আমরা তো দাঁড়াইয়া আছি। হারান মাস্টার হিটলার নিধনের বন্দনা ধরিলেই মিছিলের যাত্রা শুরু হইবে এবং আমরাও ঐকতানবাদনের সঙ্গে যাত্রা-সূচনা করিতে পারিব।’

পরবর্তীতে শিল্পকলা একাডেমির কয়েকটি যাত্রাবিষয়ক সেমিনারে তিনি মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন এবং কখনও বা সভাপতিত্ব করেন। একাডেমি আয়োজিত দুটি জাতীয় যাত্রা উৎসবে তিনি জুরি বোর্ডের সদস্যও ছিলেন। যাত্রা-অন্তঃপ্রাণ বরেণ্য নাট্যজন মমতাজউদ্দীন আহমদের ৮০তম জন্মদিনে যাত্রালোকের পক্ষ থেকে আবারও জানাই প্রণতি। তাঁর ক্ষুরধার কলমের জোরে নতুন দীপ্ত চেতনায় উদ্ভাসিত হোক যাত্রা ও নাট্যমঞ্চ।

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: