মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সাধু নিকোলাসের ধর্মপল্লী

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • ফারুখ আহমেদ

শরত মৌসুম চলছে তখন। শরত শুরু হতেই বৃষ্টি নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথায় আকাশ হবে নীল আর তাতে থাকবে ছোপ ছোপ শরতের শ্বেতশুভ্র মেঘ। তা না, প্রতিদিন মেঘ আর বৃষ্টি। রোদ যেন দূর আকাশের চাঁদ। এমন একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, আকাশে বেশ মেঘ। নিজের মধ্যেই মতভেদ চলল বার কয়েক-বের হব কী, হব না। অবশেষে বের হব জয়ী হতেই সেই মেঘলা আর বৃষ্টিভেজা দিনে প্রকৃতির কাছে নিজেকে সমর্পণ করলাম। প্রকৃতি মনে নেশা ধরায়, মাতাল করে দেয়। প্রকৃতির মাঝে অনাবিল সুখ। সেই সুখকে সঙ্গী করে যাত্রা হল শুরু। এভাবেই চলতে চলতে এক সময় চলে এলাম পূবাইলের পথে। টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ্ মাস্টার উড়াল সেতু উড়াল দিয়ে এই পথে এসেছি। কিছুক্ষণ আগে নাগদা সেতু অতিক্রম করে উলুখোলা সেতু পার হয়ে এখন কাঞ্চন সেতুর কাছাকাছি। কিন্তু আমরা কাঞ্চন সেতু পর্যন্ত যাব না। মোটরসাইকেল উলুখোলা সেতুর ওপর দাঁড় করালাম। নিচে বয়ে চলেছে বালু নদ। বালু নদে আমাদের দৃষ্টি। বর্ষা চলে গেছে, তো কী হবে। শরতেও বালু নদ যেন পূর্ণযৌবনা। এই এলাকায় অন্য সময় এলে দেখা যায় চারদিকে নদী ভরাটের চিত্র। তবু বর্ষা এলে নদী অনেকটা তার প্রকৃত রূপ ফিরে পায়। ঋতুভেদে বর্ষা আসবে। ক্ষীণ প্রবাহের হলেও নদীও থাকবে, আর সঙ্গে চলবে বর্ষা আর নদী বন্দনা। কবি নির্মলেন্দু গুণ বর্ষা বন্দনায় বলেছেন, ‘বাংলার ঋতুভেদে বর্ষাই হচ্ছে একমাত্র নারী।’ শ্রীকান্ত আচার্য তার গানে নারীকে নদীর সঙ্গে তুলনা করে বলেছেনÑ তোর সাথে যে নদীর অনেক মিল/নদীর নামে তোকে যে তাই ডাকি/রোদ পড়লে নদীটা ঝিলমিল/তোকে ভেবেই নদীর ছবি আঁকি!’ এভাবেই গুনগুনিয়ে উলুখোলা সেতু থেকে একটু এগিয়ে উলুখোলা বাজারে চলে আসি। এখানে গরুর খাঁটি দুধের চা খেয়ে বাতাস আর বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য বর্ষাতি গায়ে দিয়ে বাম দিকে নাগরীর পথে ছুটি।

নাগরী অর্থ কলস কিন্তু এই নাগরী ভাওয়াল রাজ্যের একটি গ্রাম। খ্রীস্টান অধ্যুষিত এলাকা। পর্তুগীজ নির্মিত টলেন্টিনুর সাধু নিকোলাসের গির্জাটির অবস্থান এখানে। নাগরীর সে গির্জা দেখতে আজকের ছুটে চলা। ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন অনেক জায়গা আছে যা এখনও পর্যটকদের ভিড়ে ভারাক্রান্ত হয়নি, নাগরী তেমন একটি ঐতিহাসিক যায়গাও বটে। পথ চলতে চলতেই পথিক কে প্রশ্ন ‘ভাই নাগরী কত দূর?’ পথিকের উত্তর ‘এইতো সামনে।’ কিন্তু পথ আর শেষ হতে চায় না। গ্রামের লোক-জনের ‘এইতো সামনে বলা যে কত দূর তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন।’ সুতরাং ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, আবার কখনও ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে চারদিকে চোখ রেখে চুপচাপ এগিয়ে চলি পথ সৌন্দর্য আর নীরবতাকে সঙ্গী করে। সেই নীরবতায় মাঝে-মাঝে ধাক্কা হয়ে আসে টমটমের আওয়াজ। ধীর গতির নসিমন গাড়ির স্থানীয় নাম টমটম, যা এই রাস্তায় চলাচলকারী একমাত্র বাহন। এখানে রাস্তার দু’পাশে বিল এখন পানিতে টইটম্বুর। ফসলের জমিতে এখন শাপলা শালুকের খেলা দেখে নজরুলের গান মনে পরে যায়Ñ ঝিলের জলে কে ভাসালে নীল শালুকের ভেলা/মেঘলা সকাল বেলা/এই মেঘলা সকাল বেলা। এখন অবশ্য সকাল নয়, প্রায় দুপুর হয়ে গেছে।

বিল আর শাপলা-শালুকের পাশাপাশি চলতি পথে মাঝেমধ্যে কিছু ফসলের জমিও চোখে পড়ছিল। যার সবুজাভ অনন্য সৈান্দর্য মনে দোলা দিয়ে যাচ্ছিল। মাছ ধরার দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, এ যেন মাছ ধরার মহোৎসব। এমন সৌন্দর্য দেখে কণ্ঠ আবার গুনগুনিয়ে ওঠেÑ অপরূপ এই জন্মভূমি/নেই তুলনা যার/বন-বিথী পরে যেথায়/ফুলের কণ্ঠহার। ডিএল রায় একদম খাঁটি কথাই বলেছেনÑ এমন দেশটি কোথাও খুঁেজ পাবেনাকো তুমি/সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।’ মেঘলা আকাশে বৃষ্টির খেলা রিমিঝিমি আর ঝিরিঝিরি। এভাবে অনেকক্ষণ পথ চলছি, তাই একটু অস্থিরতা মনে বিরাজ করছে সঙ্গে মন বলছে নাগরী আর কত দূর। এমন সময় হঠাৎ মেঘ সরিয়ে কুমিরের হাঁয়ের ভেতর থেকে যেন সূর্য বের হয়ে আলো ঝলমল হয়ে উঠল চারদিক। অপরূপ সে দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা নাগরী পৌঁছালাম।

নাগরী বাজার থেকে বাম দিকে মোড় নিয়ে একটু সামনে গেলেই গির্জার গেট। গেট সরিয়ে ভেতরে ঢুকতে দানব আকারের এক গির্জা। গির্জার সামনে দু-হাত উঁচিয়ে স্বয়ং যিশু দাঁড়িয়ে। এটিই টলেন্টিনুর সাধু নিকোলাসের গির্জা। ধর্মযাজক সাধু নিকোলাসের নামানুসারে গির্জাটির নামকরণ। এই গির্জাটি নতুন। গির্জাটির সঙ্গে নবাবগঞ্জ হাসনাবাদের গির্জাটির কোথায় যেন মিল খুঁজে পেলাম। আর্চ বিশপ মাইকেল রোজারিও গির্জাটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। আর্চ বিশপ পৌলিনুস কস্তা ডিডি এর উদ্বোধন করেন। নাগরীতে গথিক স্থাপত্যশৈলীর এমন চমৎকার একটি গির্জা দেখে আমরা বিস্মিত। গির্জাটি ঘুরে ঘুরে দেখে সামনে এগোই। এবার মূল ও প্রাচীন গির্জা ভবনটি চোখে পড়ে। তেজগাঁয়ের জপমালা রানীর গির্জার সঙ্গে এর অনেক মিল। জপমালা রানীর গির্জাটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৬১৭ সাল। আর নাগরীর এই গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৬৬৩ সালে। দুটি গির্জাই সেই সময় পর্তুগীজরা নির্মাণ করেন। মূলত বাণিজ্য পেতে ও কুঠি নির্মাণই তাদের উদ্দেশ্য থাকলেও ইউরোপীয়দের মধ্যে তাঁরাই প্রথম ধর্ম প্রচার করেন। এখানে আমরা প্রর্থনা কক্ষ, সমাধি স্থল ঘুরে ফাদারের বাস ভবনে যাই। সেখান থেকে আমাদের গন্তব্য দাঁড়ায় পানজোরা গ্রাম। যাবার আগে পাশের বিশাল খেলার মাঠে স্থানীয় দুটি দলের মধ্যে ফুটবল খেলা দেখে পানজোরার দিকে ছুটি।

নাগরী ও পানজোরা গ্রাম দুটি পাশাপাশি। এখন আমরা মাদার তেরেসা রোডে। এখানে সাধু এন্তনির নামে একটি মার্কেট রয়েছে। মার্কেটের পথ ধরে আর একটু সামনে গিয়ে পেয়ে যাই সাধু এন্তনি নিকোলাসের গির্জাটি। এটিকে ভক্তরা তাঁর তীর্থ স্থান বা প্রার্থনা স্থান বলে থাকেন। ক্যাথলিক সম্প্রদায়ভুক্ত যাঁরা ঈশ্বরের সাধনা করেন তাদের সাধু বলা হয়। সাধু নিকোলাস এন্তনি প্রথমে নাগরী মিশনে ছিলেন। কোন এক কারণে প্রতি রাতে সাধু পানজোরা গ্রামের এই নির্জনে চলে আসতেন, তখন এলাকাটি প্রায় জঙ্গল ছিল। প্রতিদিন যখন এমন ঘটনা ঘটে চললো, ভক্তরা পানজোরাতে ক্যাথরিন পিরচের দান করা জমিতে আরেকটি গির্জা নির্মাণ করেন। সেটি এই পানজোরার গির্জা। যার নির্মাণকাল ১৯০৬ সাল। আমরা মোটরসাইকেল নিয়েই গির্জায় প্রবেশ করি। এ সময় সূর্য আবার মেঘের আড়ালে মুখ লুকাল। আমরা সাধু এন্তনির মাতৃসদন ও শিশুকেন্দ্রের সামনে মোটরসাইকেল স্ট্যান্ড করলাম। এখানে কথা হয় সাধু এন্তনির এক ভক্তের সঙ্গে; তাঁর কাছেই জানতে পারলাম ‘এখানে প্রতি বছর নভেনা হয়। মুসলমানদের এস্তেমার মতো। নবম দিন বড় অনুষ্ঠান হয়। সারাদেশ থেকে লোক আসে, আসে সারাবিশ্ব থেকে। এখানে সৎ উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করলে তা পূরণ হয়।’ বিশ্বাসে মিলায় বস্তু- ভাবতে ভাবতে আমরা আরও সামনে যাই। এখানে চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর গির্জাটি দাঁড়িয়ে। এমন সৌন্দর্য দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না। পাশেই তীর্থোৎসব উদযাপনের বিশাল মঞ্চ। এই মঞ্চকে ঘিরেই প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে বসে নভেনা উৎসব। এমন কোন নভেনা উৎসবে যোগদানের ইচ্ছা মনে পোষণ করে আমরা আকাশের দিকে তাকালাম। আকাশে মেঘের আড়াল সরে আবার সূর্যালোক জেগেছে। সে আলোয় একাকার হয়ে যাচ্ছে পানজোরার সাধু নিকোলাস এন্তনির গির্জা।

নাগরী ও পানজোরার পথ

গুলিস্তান থেকে সরাসরি কালীগঞ্জ এক্সপ্রেসে চড়ে কালীগঞ্জ নেমে রিকশায় নাগরী, সেখান থেকে হেঁটে বা রিকশায় পানজোরা। অথবা গুলিস্তান থেকে টঙ্গী নেমে সেখান থেকে টেম্পোতে নাগরী। তবে দলবেঁধে নিজস্ব বাহনে যেতে পারলে সবচেয়ে ভাল। আমি সেই পরামর্শই দেব। এমন জায়গায় দলবেঁধে বেড়ানোর মজাই আলাদা। নাগরীতে খাবার ভাল কোন হোটেল নেই। তবে ভাল মিষ্টি পাওয়া যায়। তাছাড়া উলুখোলা বাজার, পূবাইল ও টঙ্গী বাজারেও খাবার খেয়ে নিতে পারেন। ফেরার পথে পূবাইল হয়ে কাঞ্চন সেতু ঘুরে আসতে ভুল করবেন না, ভুল করবেন না পূবাইল স্টেশনে কিছু সময় কাটাতে!

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: