কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মিল্কিওয়েতে বায়ুপ্রবাহ ঘন্টায় ২০ লাখ মাইল

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • এনামুল হক

প্রায় ২০ লাখ বছর আগে আমাদের আদিমতম পূর্বপুরুষরা সবে যখন চার পা ছেড়ে দু’পায়ের ওপর ভর দিয়ে হাঁটতে শিখেছে, সে সময় এক ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল আমাদের নীহারিকা মিল্কিওয়েব কেন্দ্রস্থলে। সেখানে ঘটেছিল এক প্রচ- বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের শক্তি এত তীব্র ছিল যে, গ্যাস ও অন্যান্য পদার্থ ঘণ্টায় ২০ লাখ মাইল গতিতে বাইরের দিকে প্রবাহিত হয়েছিল।

এখন ২০ লাখ বছর পর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা সেই বিস্ফোরণের পরিণতি পর্যবেক্ষণ করছেন। পরিণতিটা হলো আমাদের নীহারিকার সমতলের প্রায় ৩০ হাজার আলোকবর্ষ উপরে ও নিচে সৃষ্ট গ্যাসের মেঘমালার উত্তাল তরঙ্গ। পাঁচ বছর আগে নীহারিকার কেন্দ্রভাগে গামা রশ্মির প্রভার মধ্যে এই বিশালাকায় কাঠামোটি আবিষ্কৃত হয়। এরপর রঞ্জনরশ্মি ও বেতার তরঙ্গে বেলুনাকৃতির এ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা গেছে। তবে নাসার হাবল স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যেই প্রথম এ রহস্যময় কাঠামোর গতি ও গঠনবিন্যাস নির্র্ণীত হয়। বিজ্ঞানীরা এখন আমাদের নীহারিকা থেকে প্রচ- গতিতে বেরিয়ে ঘাওয়া পদার্থের ভর নির্ণয় করার চেষ্টা করছেন। কারণ সেটা করতে পারলে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ থেকে বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ নির্ণয় করতে পারা যাবে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ বিচিত্র কাঠামোর সম্ভাব্য দুটো ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। একটা হলো মিল্কিওয়ের কেন্দ্রভাগে নক্ষত্রের জন্মকালীন আগুনে ঝড় অথবা অতিকায় ব্ল্যাকহোলের বিস্ফোরণ। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যদিও অন্যান্য নীহারিকার কেন্দ্রভাগ থেকে উৎসারিত চার্জযুক্ত বস্তুকণার প্রবাহ দিয়ে গঠিত গ্যাসীয় বায়ু দেখেছেন, তথাপি তাঁরা এখন আমাদের নীহারিকার নিজস্ব আতশবাজির অনন্য দৃশ্য কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করছেন।

এন্ড্রু ফক্স নামে এক মার্কিন গবেষক বলেন, ‘অন্যান্য নীহারিকার কেন্দ্রভাগের দিকে তাকালে যে বহির্মুখী প্রবাহ দেখা যায় নীহারিকাগুলো অনেক দূরে হওয়ার কারণে সেগুলোকে অনেক ছোট মনে হয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে আমরা যে বহির্গামী মেঘমালা দেখতে পাচ্ছি, সেটা আমাদের নীহারিকার মধ্যে মাত্র ২৫ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। আমরা সামনের সারির আসনে বসে আছি। ওই আসন থেকে আমরা এ সব কাঠামোর খুঁটিনাটি দিকগুলো পরীক্ষা করে দেখতে পারব। আমরা দেখতে পারব বুদ্বুদগুলো কত বড়। ওগুলো আকাশের কতটা অংশ ঢেকে রেখেছে তাও পরিমাপ করতে পারব।’

ফার্মি বাবলস নামে অভিহিত বিশালাকায় এই কাঠামো গোড়াতে নাসার ফার্মি গামা-রে স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। অতি শক্তিশালী গামারে-র বিকীরণ থেকে বোঝা গিয়েছিল যে, নীহারিকার কেন্দ্রভাগে প্রচ- আলোড়নময় এক ঘটনা থেকে গ্যাসের মেঘমালা মহাশূন্যের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। এই বহিমুর্খী প্রবাহ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়ার জন্য ফক্স হাবলের কসমিক অরিজিনস স্পেকটোগ্রাফ (সিওএস) কাজে লাগান, যাতে দূরবর্তী একটি কোয়াসারের অতিবেগুনি রশ্মির অনুসন্ধান ও তা পরীক্ষা করে দেখা যায়। কারণ ওই প্রবাহমান আলোর গায়েই লেখা রয়েছে প্রসারমান গ্যাসের গতি, গঠন উপাদান ও তাপমাত্রা সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য, যা কেবল সিওএসই যোগাতে পারে।

ফক্সের গবেষক দল হিসেব করে দেখতে সক্ষম হয়েছেন যে, বাবলের কাছের দিকের গ্যাস পৃথিবী অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে এবং দূরের দিকের গ্যাস দূরে চলে যাচ্ছে। সিওএস স্পেকট্রায় দেখা যায় যে, গ্যাস নীহারিকার কেন্দ্রভাগ থেকে ঘণ্টায় মোটামুটি ২০ লাখ মাইল বা ৩০ লাখ কিলোমিটার গতিতে বাইরে ধাবিত হচ্ছে।

সিওএসএর পর্যবেক্ষণে প্রথমবারের মতো গ্যাসীয় মেঘমালার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পদার্থরাজির গঠন উপাদান নির্ণয় করা হয়। দেখা যায়, এতে আছে সিলিকন, কার্বন ও এ্যালুমিনিয়াম। এ থেকে বুঝা যায় যে, এই গ্যাস নক্ষত্ররাজির ভিতরে উৎপন্ন ভারি উপাদানসমূহে সমৃদ্ধ। এগুলো হলো নক্ষত্র গঠনের অবশিষ্টাংশ। সিওএস গ্যাসের তাপমাত্রাও পরিমাপ করে দেখেছে এই তাপমাত্রা সাড়ে ১৭ হাজার ডিগ্রী ফারেনহাইট অথচ বহির্গামী অতি-উত্তপ্ত গ্যাসের বেশিরভাগ অংশের তাপমাত্রা প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ডিগ্রী বলে ধারণা করা হয়। সে তুলনায় ভেতরের গ্যাস যথেষ্ট শীতল। বিষয়টির ব্যাখ্যা করে ফক্স বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, শীতলতর গ্যাস, সম্ভবত আমাদের নীহারিকার চাকতিতে অবস্থিত নক্ষত্রসমূহের মাঝখানের গ্যাসরাজি ঝড়ের বেগে সেই উত্তপ্ত বহিমুর্খী প্রবাহের মধ্যে চলে যাচ্ছে।’

এ হলো সুদূরের ২০টি কোয়াসারের জরিপের প্রথম ফল। এই কোয়াসারগুলোর আলো ফার্মি বাবলের ভিতরের কিংবা ঠিক বাইরের গ্যাসের মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়Ñ ঠিক যেমন একটা সুঁই বেলুনকে ফুটো করে অগ্রসর হয়। পুরো নমুনার বিশ্লেষণ থেকে জানা যাবে কী পরিমাণ ভর বাইরের মহাশূন্যে উৎক্ষিপ্ত হচ্ছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এরপর বাবলের বিভিন্ন অবস্থানের গতির সঙ্গে পদার্থরাজির ভরের বহিমুর্খী প্রবাহের তুলনা করে বিস্ফোরণ ঘটাবার জন্য কী পরিমাণ এনার্জি প্রয়োজন, সেটা এবং সম্ভবত বিস্ফোরণের উৎপত্তিও নির্ণয় করতে পারবেন।

গ্যাসের বহির্গামী প্রবাহের একটা সম্ভাব্য কারণ হলো নীহারিকার কেন্দ্রভাগে নক্ষত্র সৃষ্টিকালীন টালমাটাল অবস্থা, যা থেকে সুপারনোভা তৈরি হয়। সুপারনোভা হলো নক্ষত্রের মৃত্যুকালীন বিস্ফোরণ, যা গ্যাসকে সবেগে বাইরে বের করে দেয়। আরেক সম্ভাব্য কারণ হলো একটি বা একাধিক নক্ষত্রের মিলকিওয়ের অতিকায় ব্ল্যাকহোলের ভিতরে পড়ে যাওয়া। এমন ঘটনা ঘটবার সময় ব্ল্যাকহোলের দ্বারা অতি উত্তপ্ত হয়ে উঠা গ্যাস বিস্ফোরিত হয়ে মহাশূন্যের গভীরে চলে যায়। আমাদের নীহারিকার বয়সের তুলনায় বাবলগুলোর আয়ু যেহেতু ক্ষণস্থায়ী তাই বলা যেতে পারে যে, মিল্কিওয়ের ইতিহাসে এমন ঘটনা বারবার ঘটে থাকে। কারণ যাই থাক, সম্ভবত এমন ঘটনা হঠাৎ হঠাৎ করেই সংঘটিত হয় এবং হয়ত কেবল তখনই হয় যখন ব্ল্যাকহোল পদার্থপুঞ্জ গোগ্রাসে গ্রাস করে থাকে।

সূত্র : সায়েন্স ডেইলি

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: