মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

‘গণ’ পুড়িয়ে ‘তন্ত্র’?

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫
  • রাহুল শর্মা

ঘটনা-১

মিনহাজুল ইসলাম অনিক। বয়স ১৬। ফেনী সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থী সে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি তার পরীক্ষা। চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিদিনের মতো গত ৫ জানুয়ারি বিকেলেও বন্ধু হৃদয়সহ কোচিং শেষে রিকশায় চড়ে বাসায় ফিরছিল অনিক। রিকশায় গল্প করছিল দু’বন্ধু। কোন কিছু বোঝার আগেই বিএনপি-জামায়াতের মিছিল থেকে ছোড়া ককটেল বিস্ফোরিত হয় তাদের রিকশায়। লুটিয়ে পড়ে দুই বন্ধু।

ঘটনা-২

ঢাকার রাস্তায় রিকশা চালান অমূল্য চন্দ্র বর্মণ (৪৫)। গত কয়েক দিনের অবরোধে আয়-রোজগারে ভাটা পড়ায় ফিরে যাচ্ছিলেন গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছিলেন সামান্য কিছু টাকা আর স্ত্রী-সন্তানের জন্য কেনা সামগ্রী। তবে অমূল্য আর প্রিয়জনের কাছে ফিরতে পারেননি। তার আগেই গত ১০ জানুয়ারি রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় অবরোধের আগুনে দগ্ধ হয়েছেন তিনি। পুড়ে গেছে তাঁর প্রিয় সন্তান ও স্ত্রীর জন্য কেনা সামগ্রীও। অমূল্য চন্দ্র এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বিছানায় কাতরাচ্ছেন যন্ত্রণায়।

ঘটনা-৩

আবদুল হক। বাড়ি বরিশালের হিজলায়। ঢাকায় এসেছেন গত ৯ জানুয়ারি। উদ্দেশ্য বিশ্ব এজতেমায় যোগ দেয়া। কিন্তু ২০ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধের কারণে কয়েকবার গাড়ি পরিবর্তন করে, নানা ভোগান্তি পেরিয়ে পৌঁছেছেন রাজধানীতে। উঠেছেন ছোট বোনের মগবাজারের বাসায়। ৯ জানুয়ারি রাতে মগবাজার মোড়ের চায়ের স্টলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। এজতেমার প্রসঙ্গ উঠতেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন তিনি। বলেন, ‘স্বাধীন দেশে একটি রাজনৈতিক দল এভাবে মানুষের ধর্ম পালনে বাধা দিতে পারে না। তিনি আরও বলেন, এভাবে ধর্ম পালনে বাধা দেয়ার জন্য বিএনপিকে বিচারের আওতায় আনা হোক।

ঘটনা-৪

মোঃ মুরাদ হোসেন। বয়স ২৩। বাসের হেলপার। এই পেশাই তাঁর জীবিকার উৎস। প্রতিদিনের মতো ৯ জানুয়ারিও যশোরের খাজুরা থেকে মাগুরাগামী বাসে হেলপারি করেছেন। অবরোধের কারণে বাসায় যাননি। ঘুমিয়ে ছিলেন বাসেই। হঠাৎই ঘুম ভাঙলে দেখেন সারা বাসে আগুন। কোনরকমে বাস থেকে বের হন মুরাদ। কিন্তু এরই মধ্যে তার মুখম-ল ও হাত-পাসহ শ্বাসনালী পুড়ে যায়। প্রথমে তাঁকে ভর্তি করা হয় যশোর হাসপাতালে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে আনা হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে না ফেরার দেশে চলে যান মুরাদ।

উল্লিখিত ঘটনাগুলো শুধু ঘটনাই নয়, রূঢ় বাস্তবতা। বিএনপির ডাকা অবরোধে এমন আরও অনেক ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে দেশের আনাচে-কানাচে। এমন দৃশ্য দেখে মনে হয় আন্দোলনের নামে এ যেন মানুষ মারার বিচিত্র ফাঁদ। রাজনৈতিক কর্মসূচী দেয়ার অধিকার যে কোন রাজনৈতিক দলেরই আছে। কিন্তু মানুষের বাঁচার নিশ্চয়তা কেড়ে নেয়ার অধিকার কারও নেই।

আন্দোলনের দেশ বাংলাদেশ। রাজনৈতিক আন্দোলন অতীতেও হয়েছে। কিন্তু এভাবে কখনও আন্দোলনের নামে মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়া হয়নি। এ ধরণের সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচী শুরু করেছিল যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতে ইসলামী। এখন জামায়াতের মতো একই কায়দায় নাশকতা চালাচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলও (বিএনপি)। তাদের এ সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মাত্রা আরও উত্ত্যপ্ত হয়েছে ক্রমাগত মিথ্যাচারের বিষয়টি ধরা পড়ে যাওয়ায়। যার সাম্প্রতিক উদাহরণ ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির সভাপতি অমিত শাহের সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার কথিত টেলিকথনের খবর এবং বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যদের ভুয়া বিবৃতি সংক্রান্ত সংবাদ মিডিয়ায় প্রকাশ। এ দুই ঘটনার মাধ্যমেই প্রকাশ পায় বিএনপির রাজনৈতিক দেউলিয়াতত্ত্ব।

॥ এক ॥

গণতন্ত্র রক্ষার (!) জন্য আন্দোলন করছে বিএনপি। আর এর নামে চারদিকে নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারছে, পুলিশের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে তাদের আহত করা হচ্ছে, পেট্রোল বোমা মেরে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে যানবাহন এবং তার ভেতর জ্যান্ত মানুষ। বিএনপির নেতৃত্বে বিশ দলীয় জোট এসব করছে গণতন্ত্র রক্ষার জন্য! গণ শব্দের অর্থ মানুষ, মানুষের জন্য যে তন্ত্র বা আইন, তার নামই গণতন্ত্র। রাজনীতি গণের জন্য অর্থাৎ মানুষের জন্য। গণ (মানুষ) পুড়িয়ে তন্ত্র কি রক্ষা করা যায়? আইনের জন্য তো মানুষ নয়, মানুষের জন্যই আইন। মানুষই যদি না থাকে, তাহলে আইন দিয়ে কি হবে? এটা আবার কি ধরনের গণতন্ত্র রক্ষার নমুনা। গণতন্ত্র রক্ষার নাম যদি মানুষ পুড়িয়ে মারা, যানবাহনে পেট্রোল বোমা ছোড়া, পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নেয়া হয় তাহলে সেটা আবার কেমন গণতন্ত্র রক্ষা? রাজনৈতিক অধিকারেরও একটা সীমা থাকা দরকার। যার খুশি যখন খুশি কারণে-অকারণে হরতাল ডাকার, অবরোধ দেয়ার অধিকার কারও নেই। আর এরকম কর্মসূচীতে জনগণ দুর্ভোগ পোহাবে, বোমায় ঝলসে যাবে, মারা পড়বেÑ এমন তথাকথিত ‘অধিকার’ আমরা কতকাল সহ্য করব। অবরোধ-হরতালের নামে নাশকতার দায় অবশ্যই অবরোধ-হরতাল আহ্বানকারীদের। তাই এমন কর্মসূচীতে সহিসংতা সৃষ্টিকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা জরুরী। যুক্তির নিরিখে আমরা মানতে বাধ্য যে, হরতাল-অবরোধ ডাকা রাজনীতির ভাষা। কিন্তু মানুষ খুন, পেট্রোল বোমা মারা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ- এগুলো কোন্ ভাষা? তাই এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, অবরোধ-হরতাল আহ্বানকারী দলের প্রধানও এ অপরাধের দায় এড়াতে পারেন না। তাই অবরোধ-হরতাল আহ্বানকারী দলের প্রধানকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।

॥ দুই ॥

গণতন্ত্র রক্ষার (!) জন্য অবরোধ কর্মসূচী ডেকেছে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট। অথচ তাদের এ কর্মসূচীতে জনগণের কোন সম্পৃক্ততা নেই বললেই চলে। তাই অবরোধের দিনে ঢাকার ব্যস্ততম সড়কগুলোর ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়তে হয়, বাসে প্রতিদিনকার মতো ভিড় ঠেলে উঠতে হয়, মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস নির্বিঘেœ চলে। যদিও কোথাও কোথাও দুর্বৃত্তরা চেষ্টা করে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে। কখনও কখনও সে চেষ্টা সাময়িক সময়ের জন্য সফল হয়, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কেননা বিএনপির ডাকা অবরোধ কর্মসূচীতে জনগণের বিন্দুমাত্র সাড়া নেই।

তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম, সরকার বেগম জিয়াকে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করেছে, আন্দোলনে বাধা সৃষ্টি করছে, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে হামলা, মামলা ও গ্রেফতার চালাচ্ছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না বিষয়টি নতুন নয়। এর আগে যখন বিএনপি রাষ্ট্র্র ক্ষমতায় ছিল তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগের ওপরও হামলা, মামলা, গ্রেফতার চালানো হয়েছিল। বিএনপির এসব দাবি যদি সত্যিই হতো তাহলে প্রশ্ন কেন সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামছে না? কেন জনগণ প্রতিবাদ-প্রতিরোধ করছে না? এ থেকেই বোঝা যায় বিএনপির জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে জনগণের সমর্থন নেই। অতীতেও জণগণ এসব সন্ত্রাসী কর্মকা-ে সমর্থন দেয়নি, এখনও দিচ্ছে না, ভবিষ্যতেও দেবে না। বরং জনগণ এ ধরনের কর্মসূচীকে ঘৃণা করে। আর এ ধরনের কর্মসূচী আহ্বানকারী দল হয় জনবিছিন্ন। বিএনপি যতই ফাঁকা বুলি আর মিথ্যাচার করুক না কেন, তাদের আন্দোলনে যে জনগণের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, সে বিষয়টি বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। বিএনপি যদি ন্যায়সঙ্গত দাবি নিয়ে জনগণের কাছে যেত তাহলে অবশ্যই জনগণ সাড়া দিত। যা অতীতেও বহুবার হয়েছে।

আসুন একটু পেছন ফিরে তাকাই। তাহলেই দেখব জনগণের ক্ষমতা, জনগণের শক্তি। ঘটনা-১ : ১৯৭১ সালে যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্থগিত ঘোষণা করেন, তখন ঢাকায় ক্রিকেট খেলা হচ্ছিল স্টেডিয়ামে। খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে পুরো গ্যালারি মিছিলে পরিণত হয়, রাস্তায় নেমে আসে মানুষ, পুরো ঢাকা শহরের সব রাজপথ রূপ নেয় জনসমুদ্রে। ২) ১৯৯০ সালে এরশাদ সাহেবের শেষ দিনগুলোয় মিছিল-সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ছিল। কারফিউ জারি করা হয়েছিল। শুধু শুক্রবার দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নেয়া হয়েছিল জুমার নামাজ পড়ার জন্য। এ সময়ের মধ্যে নাজাজ পড়ে মানুষ দলে দলে মানুষ টুপি মাথায় দিয়ে চলে যায় বায়তুল মোকাররমে। কোন নেতা সেদিন নির্দেশ দেয়নি। নামাজ শেষে হাজার হাজার মানুষ বেরিয়ে পড়ে মিছিল নিয়ে। বিজয়নগরের মোড়ে আর্মি কনভয়গুলো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। শেষে পুলিশ গুলি করে কাকরাইল মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে।

॥ তিন ॥

রাজপথে জীবন্ত দগ্ধ মানুষের ছবি। পত্রিকার পাতায় পুড়ে যাওয়া অসহায় মানুষের বাঁচার আকুতি। রণমূর্তির পুলিশ, মুখোশধারী পিকেটার, জ্বলতে থাকা রাজপথ আর আগুনে পোড়া নিরীহ মানুষের যন্ত্রণাকাতর মুখ। এ সব দৃশ্য হঠাৎ করেই আবার এসেছে। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের উত্তর যার দেয়ার কথা, তিনি দিব্যি আরাম আয়েসে আছেন গুলশানের দোতলা বাড়িতে। বলছি বিএনপি নেত্রী বেগম জিয়ার কথা। স্বাধীনতার চার দশক পেরিয়ে গেছে, এখনও কেন রাজনৈতিক হানাহানির শিকার মানুষ? রোম যখন পুড়ছিল, তখন নাকি সম্রাট নিরো বাঁশি বাজাচ্ছিলেন। মানুষের প্রতি, মানবতার প্রতি নৃশংসতার চরম উদাহরণ এটি। এখনকার বাংলাদেশ প্রায় প্রতিদিনই হয়ে উঠছে ইতিহাসের রোম, আধুনিক নিরো হয়ে হাজির হয়েছেন বেগম জিয়া। তা না হলে তিনি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আবাহ্র্রাম লিঙ্কনের বিখ্যাত উক্তি- ‘জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণ হতে’ বেমালুম ভুলে যেতেন না। সব কিছু দেখে শুনে মনে হয়, বিএনপির কাছে গণতন্ত্রের অর্থ হলো যে কোন মূল্যে ক্ষমতা গ্রহণ। সেটা যে কোন পন্থায়ই হোক না কেন। সেজন্যই বিএনপি গোপন স্থান থেকে নির্দেশ দিয়ে রাস্তায় নামায় হেলমেটধারী ঘাতকদের। আর এরা নির্দেশ পালনে মুহূর্তেই আগুন-বোমাবাজির তা-ব চালিয়ে হয়ে যায় অদৃশ্য। তাদের তা-বে শেষ হয়ে যায় হাজার নিরীহ মানুষের স্বপ্ন।

rahuls769@yahoo.com

প্রকাশিত : ১৬ জানুয়ারী ২০১৫

১৬/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: