রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আশ্চর্য সুন্দর এই বেঁচে থাকা

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী ২০১৫

তিন তিনটি চলমান চিত্র তথা চলচ্চিত্র কিন্তু ত্রয়ী মিলে পূর্ণ করে একটি বৃত্ত। টেস্ট অফ চেরী চলচ্চিত্রে পঞ্চাশোর্ধ এক ইরানী ভদ্র লোক আত্মহত্যা করবার জন্য গহিন গর্তের সম্মুখে এগিয়ে চলছে। ইটারনিটি এ্যান্ড এ ডে চলচ্চিত্রে সত্তরোর্ধ এক কবি কাব্য সৃজনের সঙ্কট মানতে না পেরে আত্মহত্যার জন্য সমুদ্রের জল রাশির স্রোতে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে। অল দ্যাট জাজ চলচ্চিত্রে ষাটোর্ধ এক নৃত্যশিল্পী, নৃত্যশিল্পের মূল্যায়নের অবক্ষয় সহ্য করতে না পেরে অত্যাধিক ড্রাগ শরীরে পুশ করে আত্মহত্যার পথ সুগম করে চিরদিনের মতো মুক্তির পথ খুঁজে নিচ্ছে। চলচ্চিত্র তিনটি পুরোটা সময় ধরে আত্মহত্যার পরিক্রমা দেখায় কিন্তু সমাপনে আত্মহত্যার বিপরীতে বেঁচে থকার আনন্দের বার্তা ঘোষণা করে। অনেকটা সেভাবেই লেখা আমেরিকান নাট্যকার লুইজি ব্রায়ান্ট এর লেখা মঞ্চনাটক ‘দ্য গেম’। সহস্র প্রতিকূলতার বিপরীতে বেঁচে থাকার লড়াই অথবা আত্মহননের পথ বেঁচে নোবার মই-সাপ-লুডু খেলার মতোই জীবন নাট্যের খেলা দ্য গেম। অত্যন্ত সংবেদনশীল কিন্তু পরিশ্রম অনুপাতে প্রাপ্তীর চাপে খানিকটা দিশাহারা নাট্যকার-অনুবাদক-ভাবানুবাদক রুবাইয়াৎ আহমেদ অত্যন্ত দৃঢ়তা ও দক্ষতার সঙ্গে দ্য গেমের ভাষান্তর করেছে আশ্চর্য সুন্দর এই বেঁচে থাকা নামে। মঞ্চ নির্দেশনার কাজটিও তার। আমেরিকান নাট্যকারের নাটক, বাংলাদেশের নাট্যকারের ভাষান্তর ও নির্দেশনায়, তারেক মাসুদ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রযোজনায় দলের দুই বছর পূর্তি এবং সেলিম আল দীনের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে ১১ জানুয়ারি শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে মঞ্চস্থ হলো নাটক আশ্চর্য সুন্দর এই বেঁচে থাকা।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় (প্রসঙ্গ : সুনামী), মনুষ্য বিপর্যয় (প্রসঙ্গ : হানাহানি), রোগে বিপর্যয় (প্রসঙ্গ : ইবোলা), নিয়তি বিপর্যয় (প্রসঙ্গ : বিমান ভূপাতিত), ব্যবস্থাপনার বিপর্যয় (প্রসঙ্গ : রানাপ্লাজা) প্রভৃতির কারণে বেঁচে থাকাটাই যখন বাস্তব অর্থেই কঠিন থেকে কঠিনতর তখন এক কবি এবং এক নৃত্যশিল্পী এসেছে পাহাড়ের উঁচু সীমানায়। উদ্দেশ্য উঁচু স্থান থেকে ঝাঁপিয়ে নিচে পড়ে আত্মহত্যা করা। কাব্যের অনুরাগী না পেয়ে এবং কাব্য সৃজনের সঙ্কট মানতে না পেরে কবি জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা। বিষ প্রয়োগ, বন্দুকের ট্রিগার টিপে বিগত সময়ে ব্যর্থ হলেও এবার কবি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার ব্যাপারে। অপরদিকে বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী খ্যাতির তলে চাপা পড়ে, ব্যাকুল অনুরাগী অপেক্ষা কামুক মনোরোগী ভ-দের তাড়নায় অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করতে ঐ একই স্থানে উপস্থিত। কবি এবং নৃত্যশিল্পী উভয়ে তখন মৃত্যু এবং জীবন এর মতো মোহ এবং মুক্তির দোদুল্যমান টানাপোড়েনের খেলার উপকরণ। নাট্যকার লুইজি ব্রায়ান্ট শৈশবে বুঝতে শিখেই দেখেছে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ কত বেদনার, চোখের সামনে হঠাৎ রোগের কারণে দ্বিতীয় স্বামীর মর্মান্তিক মৃত্যু কত অসহায়তার, ভালবাসার অভাবে প্রথম ও তৃতীয় স্বামীর সঙ্গে ঘর করা কতটা যন্ত্রণার, পড়ন্ত বেলায় একাকী নিঃসঙ্গতা কতটা উন্মাদনার, আর তাই যখন জীবন মৃত্যুর টানাপোড়েনের মাঝে কবি এবং নৃত্যশিল্পী পরস্পরে আবদ্ধ হয় ভালবাসার বন্ধনে তখন টানাপোড়েনের খেলায়, মৃত্যু হয় পরাজিত আর জীবন হয় আদৃত। লুইজি ব্রায়ান্টের আদৃত ভালবাসাকে মর্মমূলে উপলব্ধি করে ভাষান্তরে রুবাইয়াৎ আহমেদ শুধু স্বার্থকই নয় বরং জীবন দর্শন ও নতুন নাট্যকারের সক্ষমতাকে চিনিয়ে দিতে স্বল্পপরিসরে প্রবর্তক।

প্রবর্তক নির্দেশকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ নাট্যকাররা মাত্রই যা বোঝে কিন্তু কাউকে বোঝাতে পারে না তা হলো, নাট্যকারকে দিয়ে পা-ুলিপি কাটাকুটি করানোটাই নির্দেশকের প্রধানতম দক্ষতা না। কারণ একজন নির্দেশক যা বাস্তবায়ন করতে পারে তার বেশিরভাগটাই কল্পনা করার সক্ষমতা রাখেন তাঁর লিখিত নাটকের পরতে পরতে। তার প্রমাণ আশ্চর্য সুন্দর এই বেঁচে থাকা। প্রযোজনাটি নাটকটির পিকচারইজেশন। তা যেমন সংলাপে তেমনি দৃশ্যায়নে-অভিনয়ে, উপরন্তু দর্শনের অন্বেষণে। নির্দেশক রুবাইয়াৎ-এর কাছে শুধুমাত্র একটাই নিবেদন সাহিত্য অনুরাগী হিসেবে আর তা হলো, দিন শেষে মনে হতেই পারে নির্দেশনা (পক্ষান্তরে আয়োজকের ভূমিকা) ক্লান্তিকর বরং সে সময়জুড়ে নাটক সৃজন বড় বেশি আনন্দের। ফলে সময় থাকতে থাকতেই শক্তির যথার্থ ব্যবহারটাই কাম্য।

দুর্লভ তারেক মাসুদকে আমরা হারিয়েছি দুর্ভাগ্যক্রমে। মায়াকান্নার কোন মানে নেই। মানে, মহৎ ব্যক্তিত্বদের মহৎ ভাবও আদর্শ অব্যাহত রাখা। একদিকে ক্যাথরিন মাসুদ চলচ্চিত্রাঙ্গনে তারেক মাসুদের দৈহিক অবর্তমানেও যেভাবে তারেক মাসুদকে সচল করেছেন নবতরঙ্গে বলিষ্ঠভাবে অনেকটা সে রকম না হলেও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী, নিজের পরিশ্রমে গ্রাম থিয়েটারের নাট্যকর্মী, তারেক মাসুদের ভ্রাতা এবং সংস্কৃতিকর্মী হাবিুবর রহমান মাসুদ সংক্ষেপে বাবু শুধু তারেক মাসুদ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাই করেননি বরং প্রযোজনা অধিকর্তা হয়ে এক ঝাঁক নবীন থিয়েটার কর্মী লালন-পালন এবং প্রযোজনায় প্রয়োগের মধ্যে দিয়ে জীবনের বেঁচে থাকার অর্থপূর্ণতা দিতে যাচ্ছেন। আর এখানেই আশ্চর্য সুন্দর এই বেঁচে থাকা’র প্রাসঙ্গিকতা। ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারাটাই যাপিত জীবনে পুনঃপুনঃ বেঁচে ওঠা।

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী ২০১৫

১৫/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: