কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী ২০১৫
  • স্মরণ

আশির দশকে নাট্যকার সেলিম আল দীন গ্রাম থিয়েটার প্রতিষ্ঠার জন্য ছুটে গেছেন দেশের নানা প্রান্তরে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আসেন ১৯৮১ সালে, সে সময়েই তাঁকে আমার প্রথম দেখার সুযোগ ঘটে। মাথায় ঝাকড়া চুল, ফর্সা, লম্বা, সুদর্শন, অনিন্দ চেহারার এক দীপ্ত পুরুষ। তাঁর কথা, বাচন ভঙ্গি দেখে কেবলই তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। গ্রামে গঞ্জে তখনও টেলিভিশনের ব্যাপকতা লাভ করেনি। শীত মৌসুমে পাড়ায় পাড়ায় যুবকেরা দলবেঁধে নাট্য চর্চা করত। কয়েক মাস রিহের্সাল দেয়ার পর অবশেষে তারা একটা নাটক উপহার দিত এলাকাবাসীকে। কয়েক গ্রামের লোকজন মিলে রাত জেগে সে নাটক উপভোগ করত। গ্রাম বাংলার নারী-পুরুষের বিনোদনের এক বিশেষ খোরাক যোগাত সেই নাটক। নিভৃত পল্লীর মানুষের বিনোদনের খোড়াক সেই নাটককে আরও প্রাণবন্ত ও জীবন ঘনিষ্ঠ করে উপহার দেয়ার জন্য সেলিম আল দীন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রাম থিয়েটার।

মুক্তাগাছার রৌয়ারচর গ্রামের তরুণদের উদ্যমতায় গ্রামের সকল বয়সের মানুষ সম্মিলিতভাবে স্বাগত জানিয়েছিল গ্রাম থিয়েটারকে। রৌয়ারচর গ্রামে পূর্ণাঙ্গ অবয়বে গড়ে উঠেছিল গ্রাম থিয়েটারে কর্মযজ্ঞ। সে বছরই শীতের মৌসুমে ‘রৌয়ারচর’ থিয়েটার কর্তৃক আয়োজন করা হয় তিনব্যাপী গ্রাম থিয়েটার মেলার। সেলিম আল দীন ছিলেন ঐ মেলার প্রধান অতিথি। মুক্তাগাছায় তাঁর ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে ছিলেন নাট্য ব্যক্তিত্ব আফসার আহমেদ ও সালাম সাকলাইন। তবে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়ায় সেলিম আল দীন সেই মেলায় যোগ দিতে পারেননি। মুক্তাগাছা থেকে ফিরে আসেন জাহাঙ্গীরনগরে। রৌয়ারচর গ্রামবাসী সেদিন প্রচ- আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন তাঁকে একনজর দেখার জন্য কিন্তু তাদের সে দিনের ইচ্ছা পূরণ হয়নি।

আমি তখন প্রাইমারির গ-ি পেরিয়ে হাইস্কুলে পা রেখেছি মাত্র। নাটক বা নাট্যকার সম্পর্কে বুঝবার মতো জ্ঞান ছিল না। তবে সেলিম আল দীনকে দেখে নাটক ও লেখালেখির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ১৯৮১ সালে সপ্তম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় সেলিম আল দীনের নাটক সাহিত্য প্রসূনে পাঠ্যসূচী ছিল। সেই নাটক পড়ে তাঁর প্রতি এবং তাঁর লেখার প্রতি আগ্রহ আরও প্রবল হয়ে ওঠে। ১৯৮৯ সালে জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসে আবার দেখার সুযোগ ঘটে সেলিম আল দীনকে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় ক্লাস এবং সাংবাদিকতার ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মধ্যে সেলিম আল দীনের সঙ্গে দেখা করতাম। তিনি যখন কথা বলতেন বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখতাম তাঁর কথা বলার স্টাইল ও বাচনভঙ্গি। ক্রমান্বয়ে তাঁর প্রতি আগ্রহ আরও প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। তাঁকে যতই দেখি দেখার তৃষ্ণা আরও প্রবল হয়। হঠাৎ তিনি একদিন ডেকে পাঠান নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে। এই বিভাগে তখনও পূর্ণ অবয়বে সবকিছু গড়ে উঠেনি। সেলিম আল দীন তখন বিভাগের চেয়ারম্যান। তাঁর কক্ষে উঁকি দিতেই ভেতরে যেতে বলেন। আতিকুল হক চৌধুরী, জামাল উদ্দিন হোসেনসহ সেখানে কয়েকজন বসা ছিলেন পরিচয় করিয়ে দেন তাদের সঙ্গে। একপর্যায়ে তিনি নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ ও ক্যাম্পাসের নাট্যচর্চার খবর পত্রিকায় কভারেজ দেয়ার কথা বলেন। আমি তখন তাঁকে দেখেছি তিনি এই বিভাগের জন্য কত কি করেছেন। বিভাগকে পূর্ণতা দেয়ার জন্য একবার গিয়েছেন ভিসি অফিসে, আবার ছুটে এসেছেন ক্লাসরুমে। কখনও কখনও তিনি ভুলে গিয়েছেন দুপুরের খাবারের কথা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভাগে কাটিয়ে ক্লান্ত হয়ে ফিরেছেন বাসায়। সংসারের কাজ কর্মে তাঁর স্ত্রী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসাকেই সব সামাল দিতে হয়েছে যা তাঁর কর্মব্যস্ততা থেকেই বুঝেছি। সেলিম আল দীনের সৃষ্টিশীলতার আড়ালে তিলে তিলে অনুপাণিত করেছেন তাঁর স্ত্রী ও সহপাঠীনী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা। তাঁর ত্যাগের বিনিময়েই সেলিম আল দীন হয়েছন বিখ্যাত। তাকে বলতে শুনেছি সস্তামানের অধিক লেখার প্রয়োজন নেই। যেকোন কিছু লেখার জন্য কিন্তু সেলিম আল দীনের জন্ম হয়নি। সেলিম আল দীন রচনা করে গেছেন অনেক তবে তাঁর সবই সমুদ্রস্রোতের মতো সীমাহীন। তিনি বাঙলা নাটকের আকাশ নির্মাণ করেছেন আরও নির্মাণ করেছেন নাট্য সমুদ্র। তাঁর নাটক ছিল শিল্প ও নন্দনতত্ত্বের বলয়ে আবৃত। যা বাস্তব ও সকল সময়ের আধুনিক শিল্পের উচ্চতায় উন্নীত। বাঙালীর শিল্প ও সম্পদ তাঁর নাটকের উপাদান হওয়ায় আমাদের সকল পিপাসার তৃষ্ণা মেটে। তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান।

১৯৯৩ সালে আমি দৈনিক বাংলার জাহাঙ্গীনগর প্রতিনিধি হিসেবে যোগদানের চেষ্টা করি। তিনি তাঁর সহযোগিতার হাত প্রসারিত করে দৈনিক বাংলার সেই সময়ের সম্পাদক আহমেদ হুমায়ুনের কাছে চিঠি লিখে পাঠান আমাকে। তিনি দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক রেজোয়ান সিদ্দিকীর কাছেও চিঠি লিখে দেন আমার জন্য। সেখানে আমার নিয়োগ হয়ে যায়। দৈনিক বাংলার নিয়োগ পেয়ে সাংবাদিকতা ও লেখালেখির প্রতি আমার আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। যা সেলিম আল দীনের অনুপ্রেরণারই ফসল। আমি তাঁকে আরও জানতে পারি দৈনিক বাংলার জন্য তাঁর একটি ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে, যা ৩০ জুলাই ১৯৯৩ তারিখে দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত হয়। তাঁর কথা বলার স্টাইল, শব্দচয়ন এসব দেখে কোন অবস্থাতেই সামনে থেকে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু তাঁর ব্যস্ততার কারণে অবশেষে উঠতেই হয়। একদিন বাসায় গিয়ে দেখি তিনি ডাইনিং টেবিলে বসে নাটক লিখছেন। পাশে বসে তাঁর স্ত্রী বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর লেখা কেটে গাম দিয়ে সাদা কাগজে লাগিয়ে সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। নিজের লেখা সংরক্ষণের কোন সময় বা আগ্রহ কোনটাই ছিল না তাঁর । এগুলো সযতেœ করেছেন তার সহধর্মিণী। তিনি আমাকে তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং আমার জন্য খাবার আনতে বলেন। লেখা থামিয়ে তারা দুজনে যেভাবে আমাকে যতœসহকারে খাইয়েছিলেন তা আজও আমার মনে গেঁথে আছে। আমি তখন থেকে বেগমজাদী মেহেরুন্নেসাকে খালামণি বলে ডাকি যা আজও বজায় আছে। এরপর থেকে দৈনিক বাংলার জন্য লেখা আনতে এবং লেখার বিল পৌঁছে দিতে তাঁর বাসায় যেতাম।

আমার প্রতি তার সন্তানতুল্য ¯েœহ দেখে আমি অভিভূত হতাম। মাঝে মধ্যেই ডাকতেন তাঁর নাটকের স্ক্রিপট কপি করে দেয়ার জন্য। তিনি বলতেন আমি লিখতাম। দৈনিক বাংলার জন্য তাঁর কাছ থেকে অনেক লেখা আমাকে এভাবেই নিতে হয়েছে। দৈনিক বাংলার ত?কালীন সম্পাদক আহমেদ হুমায়ুনের আমন্ত্রণে তিনি একবার আমাকে এবং ভোরের কাগজের সে সময়ের জাবি সংবাদদাতা মোহনকে নিয়ে দৈনিক বাংলার অফিসে আসেন। সেখানে সম্পাদকের রুমে কয়েক ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে চলে আসেন জাদুশিল্পী জুয়েল আইচের বাসায়, জুয়েল আইচের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন, সেখান থেকে তাঁর এক আত্মীয়ের বাসা রায়ের বাজার হয়ে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে আমিন বাজারের কাছে ফাঁকা জায়গায় ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলেন। গাড়ি থেকে নেমে সিগারেট ধরিয়ে আকাশপানে তাকিয়ে জো?স্না রাতের তারা দেখেন মনে হচ্ছিল তিনি আকাশ ও তারার সঙ্গে কথা বলছেন, মুক্তবাতাসে কতক্ষণ কাটিয়ে ফিরে আসেন ক্যাম্পাসে।

তাঁর টিভি নাটকের অনেক স্ক্রিপট আমাকে ডিকটেশন দিয়ে লিখিয়েছেন। বলতেন তুই সাংবাদিকতা করিস তোকে ডিকটেশন দিলে আমার সময় কম লাগে। হঠাৎ করে পত্রিকায় লেখা প্রায় বন্ধ করেছেন। আমি জিজ্ঞেস করতেই একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। মনে হয়েছিল তিনি কিছুটা ক্লান্ত। তারপর আবার অনেক দিন দেখা নেই হঠাৎ একদিন শুনি স্যার ল্যাবএইড হাসপাতালে। সেখানে ছুটি গিয়ে বিস্ময়ে এক নজর দেখার চেষ্টা করি কিন্তু সে দেখা আর হয় না। অবশেষে তিনি ফিরে আসেন ক্যাম্পাস চোখ বন্ধ করে নিথর দেহ নিয়ে। শুনেছি তিনি মৃত্যুর কয়েকদিন আগে একবার আমার লেখালেখির খবর নিয়েছিলেন।

মেজবাহ উদ্দিন তুহিন; গবেষক ও লেখক

উপ-আঞ্চলিক পরিচালক, বাউবি

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী ২০১৫

১৫/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: