কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চলে যাওয়া মানেই প্রস্থান নয়...

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী ২০১৫

তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। যুদ্ধের পর অনেক স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেন চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ। তাঁর চলচ্চিত্রে বার বার ঘুরে-ফিরে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের কথা। নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বলেই বোধ করি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর আগ্রহটা বরাবরই একটু বেশি ছিল। অনেকদিন থেকেই চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। সময়টা একবারে কম নয় প্রায় চার দশক। তবে আজকের অনেকেই জানেন না তিনি এক সময় অভিনয় করতেন এবং চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন। ছোটবেলা থেকেই দীলিপ কুমারের অভিনয় মুগ্ধ হয়ে দেখতেন তিনি। তিনি আসলে দীলিপ কুমারের মতো একজন খ্যাতিমান অভিনেতাই হতে চেয়েছিলেন সেই ছোটবেলায়। ১৩ অথবা ১৪ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে বোম্বে চলে গিয়েছিলেন দীলিপ কুমারের সঙ্গে দেখা করতে। মজার ব্যাপার হচ্ছে সেখানে গিয়ে বিখ্যাত অভিনেত্রী মীনা কুমারীর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। তিনি বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাঁকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। বাড়ি ফিরে মীনা কুমারীকে অনেকগুলো চিঠি লিখে ফেলেন কিশোর চাষী নজরুল ইসলাম। তাঁকে অবাক করে দিয়ে একদিন বোম্বে থেকে চিঠির জবাব আসে মীনা কুমারীর। তিনি চাষীকে চিঠি লেখা বন্ধ করে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে বলেছিলেন। আরেক খ্যাতিমান পরিচালক ফতেহ লোহানীর সহকারী হিসেবে ১৯৬২ সালে তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। এর পরের বছর কাজ করেন নির্মাতা ওবায়দুল হকের সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র ‘ওরা এগারো জন’ ১৯৭২ সালে তিনি নির্মাণ করেন। ১৯৭৪ সালে নির্মাণ করেন আরেকটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘সংগ্রাম’। তাঁর ক্যারিয়ারে তিনি সব মিলিয়ে ২২টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। এর মধ্যে ছয়টিই মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র।

তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দেবদাস’, ‘ভাল মানুষ’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘শুভদা’, ‘বেহুলা লক্ষ্মীন্দর’, ‘দাঙ্গা-ফ্যাসাদ’, ‘মিয়া ভাই’, ‘বিরহ ব্যথা’, ‘লেডি স্মাগলার’, ‘বাসনা’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, ‘শাস্তি’, ‘আজকের প্রতিবাদ’, ‘শিল্পী’ , ‘সুভা’, ‘দুই পুরুষ’, ‘শিল্পী’, ‘হাছনরাজা’, ‘মেঘের পরে মেঘ’, ‘ধ্রুবতারা’, ‘রঙিন দেবদাস’ প্রভৃতি। সর্বশেষ তিনি ‘ভুল যদি হয়’ ও ‘অন্তরঙ্গ’ নামের দুটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। দুটি ছবিরই কাজ তিনি শেষ করে গেছেন।

চাষী নজরুল ইসলাম ১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর শ্রীনগর থানার সমষপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ২০০৪ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। অবশ্য ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ১৯৯৭ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। অবশ্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এর আগেও তিনি একবার পেয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে এই সম্মাননা অর্জন করেন তিনি ‘শুভদা’ চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য। ‘শুভদা’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনাসহ একাধিক শাখায় পুরস্কার পায়।

চাষী নজরুল ইসলাম এমনই একজন সৌভাগ্যবান পরিচালক যিনি জীবদ্দশায় দুইবার ‘দেবদাস’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যেতে পেরেছেন। বরেণ্য এই পরিচালক চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি অনেক চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। সর্বশেষ তিনি বাপ্পারাজ পরিচালিত ‘কার্তুজ’ ও সায়মন তারিক পরিচালিত ‘মাটির পরী’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। চাষী নজরুল ইসলাম কয়েক দফায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির ‘সভাপতি’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন। এছাড়াও চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের সদস্য হিসেবে ও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রগুলো ভবিষ্যত প্রজন্মের নির্মাতাদের প্রেরণা যোগাবে সে কথা নিশ্চিত করেই বলা যায়।

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী ২০১৫

১৫/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: