হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রংপুরে পেট্রোল বোমায় পুড়িয়ে মারল ৪ জনকে

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী ২০১৫
রংপুরে পেট্রোল বোমায় পুড়িয়ে মারল ৪ জনকে
  • নিহতদের মধ্যে ১ শিশু ২ মহিলা ॥ গুরুতর অগ্নিদগ্ধ ১৮ জন হাসপাতালে

স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর ॥ জ্বালাও পোড়াও অপরাজনীতির শিকার হয়ে এবার রংপুরে ঝরে গেল চারটি তাজা প্রাণ। আরও চারটি প্রাণ এখন হাসপাতালের বিছানায় ঝরার অপেক্ষায়। মঙ্গলবার মধ্যরাতে জেলার মিঠাপুকুরে যাত্রীবাহী একটি বাসে অবরোধকারীদের পেট্রোলবোমার আগুনে ঘটনাস্থলেই ১ শিশু ২ মহিলাসহ ৪ জন অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেছে। গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হয়ে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ১৮ জন। এদের মধ্যে ৪ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। নিহতদের সকলের শরীর পুড়ে যাওয়ায় তাদের কারোরই নাম পরিচয় জানা যায়নি। বাসটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে গেছে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগী এবং রোগীর স্বজনদের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে আসছিল সেখানকার পরিবেশ। এ ঘটনায় পুলিশ সন্দেহভাজন ৮ জামায়াত-শিবির কর্মীকে আটক করেছে। পেট্রোলবোমায় মানুষ পুড়িয়ে মারার এ ঘটনায় জেলাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সকলেই রাজনীতির নামে এই নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য তীব্র নিন্দা ক্ষোভ জানিয়ে অবিলম্বে এই নোংরা রাজনীতিকদের খুঁজে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর থেকে ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী ‘খলিল স্পেশাল’ একটি বাস ঢাকার উদ্দেশে যাচ্ছিল। মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ১টার দিকে বাসটি মিঠাপুকুরের জায়গীরহাট নামক স্থান অতিক্রম করার সময় অবরোধকারীরা বাসটির উদ্দেশে কয়েকটি পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে। এতে মুহূর্তে বাসটিতে আগুন ধরে গেলে যাত্রীরা তাড়াহুড়ো করে নামার চেষ্টা করলেও বাসের দরজা-জানালা সব বন্ধ থাকায় তাৎক্ষণিক তারা ব্যর্থ হন। এতে কম-বেশি সকলের শরীরেরই আগুন ধরে যায় এবং ঘটনাস্থলেই এক শিশু ও দুই মহিলাসহ ৪ জন প্রাণ হারান। অগ্নিদগ্ধসহ আহত হন কমপক্ষে ৩০ জন। এদের মধ্যে গুরুতর আহত ও অগ্নিদগ্ধ ১৮ জনকে রাতেই রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে একই পরিবারের মা মনোয়ারা বেগম (৩৫) ও তার দুই মেয়ে নুসরাত (১৩) এবং নাদিয়া (৬) কে রংপুরের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শাহিদা বেগম জানান, ড্রাইভার বসার স্থানের জানালা দিয়ে হঠাৎ করেই বিকট শব্দে কয়েকটি বোমা এসে পড়ে গাড়ির ভেতর। সঙ্গে সঙ্গেই আগুন ধরে যায় গাড়িতে। এ সময় ড্রাইভার গাড়ি থামানোর আগেই আগুন সমস্ত গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের বীভৎসতার বর্ণনা দিতে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান শাহিদা। আনোয়ার হোসেন নামের অপর এক গুরুতর দগ্ধ ব্যক্তি জানান, সমস্ত গাড়িতে আগুন জ্বলছে, কিন্তু তাঁরা যে নামবেন তার উপায় নেই। কারণ সবখানেই আগুন। এ অবস্থায় কেউ জানালা ভেঙ্গে, কেউ সিঁড়ি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই নেমে পড়ে। হাসপাতালের উপপরিচালক ডাঃ আব্দুল কাদের জানান, রাতে এত বেশি বার্ন রোগী নিয়ে তাঁরা অনেকটাই বিপাকে পড়েন। তারপরও তাঁদের চিকিৎসায় কোন ঘাটতি হয়নি।

জানা গেছে, কয়েকদিন ধরে চলে আসা অবরোধের কারণে অভাবী এলাকা উলিপুরের কিছু কর্মজীবী মানুষ অনেকটা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কর্মের সন্ধানে যাত্রা করেছিল রাজধানীর উদ্দেশে। কিন্তু তার আগেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকদের অপরাজনীতির শিকার হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো তাঁদের। মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলে যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন তাঁরা সকলেই পুড়ে অঙ্গার হয়েছে। তাঁদের কোনভাবেই চেনার উপায় ছিল না। আর যে শিশুটি মরেছে তার শুধু মাথার খুলিটি তারা উদ্ধার করতে পারে। তবে হাত দিয়ে তোলার সময় সেটিও ছাই হয়ে যায়। তিনি জানান, নিহতদের কারোরই নাম পরিচয় জানা যায়নি। কারও পরিবারে কেউ হারিয়েছে এ পর্যন্ত কেউ দাবি না করায় তাদের পরিচয় বের করা সম্ভব হয়নি। হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের ময়নাতদন্তকারী ডাঃ রবি শংকর ম-ল জানান, যেহেতু তাঁদের চেনার কোন উপায় নেই, তাই ময়নাতদন্ত ছাড়াও তাদের ডিএনএ সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে লাশ স্বজনদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে কিনা তা তিনি জানাতে পারেননি। পুলিশ সুপার আব্দুর রাজ্জাক পিপিএম জানান, তাদের পরিচয় বের করতে বিশেষ মাধ্যমে উলিপুরে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। হয়ত পরিচয় বের করা সম্ভব হবে। ঘটনাস্থল ঘুরে এসে পুলিশ সুপার আরও জানান, জেলাজুড়েই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। তবে এ ধরনের চোরাগোপ্তা হামলা হলে তাদের করার কী থাকে। সকালে রংপুর বিভাগীয় কমিশনার দিলোয়ার বখত্, জেলা প্রশাসক ফরিদ আহম্মেদ হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের খোঁজখবর নেন। বুধবার বিকেলে এ রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত থানায় কেউ মামলা করেনি। তবে পুলিশ সন্দেহভাজন জামায়াত-শিবিরের ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে।

জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে পদযাত্রা ॥ মানিক সরকার মানিক, রংপুর থেকে জানান, ‘দেশজুড়ে আর নয় নৈরাজ্য, বোমাবাজি, অগ্নিসংযোগ, মানুষ হত্যা, এবার চাই শান্তি ও নিরাপত্তা’Ñএমন সেøাগানকে সামনে রেখে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক জঙ্গী কর্মকা-ের বিরুদ্ধে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সচেতন মানুষকে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন ‘জাগো রংপুর’ নামের একটি সংগঠন। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বুধবার রংপুর নগরজুড়ে জাতীয় পতাকা, ব্যানার ফেস্টুন নিয়ে বিশাল এক পদযাত্রা ও সমাবেশও করেছে তারা। সমাবেশে সাম্প্রদায়িক জামায়াত-শিবির রুখবার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন তাঁরা।

দেশজুড়ে চলে আসা হরতাল-সন্ত্রাস-নৈরাজ্য আর আগুনে মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনার প্রতিবাদ জানাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে সম্প্রতি গড়ে ওঠে ‘জাগো রংপুর’ নামের এ সংগঠনটি। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার সকালে রংপুরের সর্বস্তরের মানুষ জমায়েত হতে থাকে নগরীর সাংস্কৃতিক পল্লী বলে খ্যাত পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে। সেখান থেকে তারা পদযাত্রা শুরু করে নগরীর জিরো পয়েন্ট কাছারি বাজার, শাপলা চত্বর পর্যন্ত ব্যাপক এলাকা ঘুরে এসে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ করে তারা। সেখানে বক্তব্য রাখেন, আওয়ামী লীগের মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, এ্যাডভোকেট রেজাউল করীম রাজু, কমিউনিস্ট পার্টির শাহাদাত হোসেন, ওয়ার্কার্স পার্টির নজরুল ইসলাম হাক্কানী, জাসদের সাখাওয়াত রাঙ্গা, আনোয়ার হোসেন, বাসদের আব্দুল কুদ্দুস, ডাঃ সৈয়দ মামুনুর রহমান, সাংস্কৃতিক কর্মী ডাঃ মফিজুল ইসলাম মান্টু, বিপ্লব প্রসাদ, মোয়াজ্জেম হোসেন লাবলু প্রমুখ।

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী ২০১৫

১৫/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: