হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সংলাপ তো বটেই আসল খেলাটা কি

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী ২০১৫
  • রাহাত খান

সবচে ক্ষতি হচ্ছে অর্থনীতির। বিশেষ করে পরিবহন, স্থানীয় সরবরাহ এবং ভেতরের ও বাইরের পর্যটনশিল্প ভ্যলুমের হিসাবে চারভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের আরোপ করা অবরোধ ও হরতালে অর্থনীতির ক্রম-সঙ্কোচন বাড়ছে।

অবরোধ ও হরতাল কবে বন্ধ হবে? এই প্রশ্নের জবাব একেকজনের কাছে একেকরকম। বিএনপি সমর্থক গোষ্ঠী মনে করে যতদিন মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ‘অবৈধ’ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় সরকার। ২০ দলীয় জোটের সাথে মতবিনিময় বা সংলাপে না বসবে ততদিন সারাদেশে অবরোধ-হরতাল চলবে। তারা মনে করে এটা ২০ দল বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির জন্য বাঁচা-মরা সংগ্রাম। এই সংগ্রাম ব্যর্থ হওয়ার অর্থ বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত রাজনীতির কবর রচনা হওয়া। গত এক বছরে নানা মিছিল-আন্দোলন, নানা নাশকতা চালিয়ে সরকারের ওপর কোন চাপই সৃষ্টি করা যায়নি। বরং ২০১৩ সালে দেশ-জোড়া যে জনপ্রিয়তা ছিল বিএনপির তা ২০১৪-১৫ সালে এসে প্রায় পুরোটাই চলে গেছে আওয়ামী লীগের দখলে। দেশের বেশিরভাগ ভোটার মনে করেন (শতকরা ৫৭ ভাগ) প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শেখ হাসিনাই যোগ্য। দল হিসাবেও আওয়ামী লীগ আগের চেয়ে অনেক বেশি গোছানো এবং শক্তিশালী।

আবার বিএনপি সমর্থকদের কেউ কেউ মনে করেন, সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, অবরোধ ঠিকই আছে। তবে জামায়াত থেকে সর্বপ্রকারে বিচ্যুতি না ঘটা পর্যন্ত বিএনপি তার হারানো ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে না। ১৯৭১ সালে বিএনপির জন্মও হয়নি। অথচ জামায়াত- সম্পৃক্ততার কারণে বিএনপিকে একাত্তুর সালে বর্বর পাকিস্তান-বাহিনীর নির্বিচারে বাঙালী নিধন, নারী নির্যাতন, বুদ্ধিজীবী হত্যার দায় ঘাড়ে নিতে হচ্ছে। এর কারণ আর কিছু নয়, বিএনপি বড়বেশি মজে গেছে যুদ্ধাপরাধী, একাত্তুরে পাকিস্তান বাহিনীর দোসর জামায়াতের মধ্যে। শোনা যায়, জামায়াতই নাকি অর্থ ও বুদ্ধিশুদ্ধি দিয়ে বিএনপিকে চালায়। বিএনপি ও জামায়াত একই রাজনৈতিক পরিবার,- এই ধারণা খুব প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে গোপনে বিশ্বাস করে বিএনপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। বিএনপির ভাবী প্রধানমন্ত্রীর দাবিদার তারেক রহমানের একটি উক্তি সম্ভবত এই ধারণার ভিত্তি। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বৃষ-স্কন্ধ আলী আহসান মুজাহিদের পিঠে হাত রেখে বগুড়ার এক জনসভায় সহাস্যে তারেক রহমান বলেছিলেন আমরা (বিএনপি ও জামায়াত) এক রাজনৈতিক পরিবারের লোক।

বিএনপির অভিজ্ঞ এবং কুশলী রাজনৈতিক অংশটি মনে করে, শতকরা ১০০ ভাগ জামায়াত-বিযুক্তি না ঘটা পর্যন্ত বিএনপির মিছিল, হরতাল, অবরোধ এসব কিছুই বিএনপিকে ২০১৩ সালে সেই জোয়ার ভাঙ্গা জনপ্রিয়তার মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। পারবে না সরকারের পতন ঘটাতে কোনক্রমেই। আওয়ামী লীগ তো ফেল্না দল নয়। বরং আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দল এই মুুহূর্তে গণ-মানুষের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতায় বিএনপির চেয়ে বহুদূর এগিয়ে। এছাড়া মুখে না বললেও গ্রাম ও শহরে বিএনপির একটি বৃহদাংশ অন্তত নিজেদের মধ্যে স্বীকার করে যে, হাসিনার মতো দক্ষ নেতৃত্ব খালেদার নেই। আর সন্ত্রাস দমন এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকা-ে শেখ হাসিনা যে বিশ্ব-নেতৃত্বের সমীহ এবং প্রশংসা অর্জন করে চলেছেন,- এটা বিএনপির সেই অংশটি বিলক্ষণ জানেন।

তবে কথা হচ্ছে দেশের লোক চাক না চাক, বাংলাদেশের রাজনীতি এই মুহূর্তে একটা আবর্তের মধ্যে পড়েছে। তাতে করে রাজনীতি তো বটেই দেশের অর্থনীতিও কম-বেশি একটা বিরূপতার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগ যত বড় দল হোক, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সন্ত্রাস দমন এবং দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যত পারঙ্গম হোন, অবরোধ ও আন্দোলনের নামে দেশে বর্তমানে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও যে নাশকতা এবং ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চলছে, তা ১৪ দলীয় সরকারকে কার্যকরভাবে থামাতে হবে। জনমনে আতঙ্কের বদলে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। বন্ধ করতে হবে বোমাবাজি, সন্ত্রাস এবং দেশের উন্নয়ন- ট্র্যাকে ওঠে পড়া অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতিকে বিএনপি মনে করে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না বিধায় এই নির্বাচন অবৈধ। এই নির্বাচনের বলে যে সরকার গঠিত হয়েছে সেই সরকারও কাজে কাজেই অবৈধ।

বিএনপি আরও বলছে, সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচন হতে হবে এবং সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রশ্নেই নির্বাচন হতে হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। দেশে বিদ্যমান সঙ্কট নিরসনে বিএনপি সংলাপ চায় সরকারের সঙ্গে।

বিএনপির মতে সরকার অবৈধ, তারপরও বিএনপি কেন যে অবৈধ সরকারের সাথে সংলাপে বসতে চায়Ñ। এর ‘বৈধ’ কোন কারণ বুঝতে আমরা অপারগ। বিএনপিকেও অবশ্য আওয়ামী লীগ ‘অবৈধ’ দল বলে অভিহিত করেছে দেশে সর্বোচ্চ আদালতে জেনারেল জিয়াউর রহমান সংক্রান্ত একটি রেফারেন্স টেনে এনে। ঠিক বিএনপির ভাষা ধার করে আওয়ামী লীগ বলেছে অবৈধ কোন রাজনৈতিক দলের (বিএনপি) সাথে কিসের মত-বিনিময়? কিসের সংলাপ? তাছাড়া সুপ্রীম কোর্টের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো বিলুপ্ত। সুপ্রীম কোর্ট ‘তবে’ এবং ‘ইচ্ছে করলে’ শব্দ দুটি ব্যবহার করে আরও দু’বছর নির্বাচনী সরকার হিসাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখা যেতে পারে বলে রায় দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ বলেছে সংসদে তারা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের ইচ্ছে হয়নি নির্বাচনী সরকার হিসাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বহাল রাখার। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার তাই নির্বাচনী সরকার হিসাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত করেছে। এতে কার কি বলার থাকতে পারে।

হ্যাঁ, সর্বোচ্চ আদালতে ‘তবে’ ও ‘ইচ্ছে করলে’ শব্দ দুটি ছিল। ‘তবে বঙ্গবন্ধুর ঘৃণিত খুনীদের বিচার করা যাবে না’ মর্মে খুনী মুশতাক ও স্বৈরাচারী একনায়ক জিয়াউর রহমান দুনিয়ার জঘন্যতম যে ‘আইনটি’ করেছিল, পরবর্তীকালে ক্ষমতায় আসা জিয়াপত্নী খালেদা জিয়া তো ‘ইচ্ছে করলে’ সেই জঘন্যতম আইনটি বিলুপ্ত করে দেশ ও জাতির সামনে অনুতাপ ও মহত্ত্বের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন। বেগম জিয়া ও তার ভ্যানিটি ব্যাগে থাকা পার্লামেন্ট সেই ইচ্ছা করেননি। পরে অবশ্য আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ইন্ডেমনিটি আইনটি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতারবলে রদ করে দেশ ও জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছিল।

ইচ্ছা হওয়া না-হওয়া নিয়ে গোয়ার্তুমি ও তর্ক করা বৃথা। মনে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, বেগম খালেদা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিলুপ্ত হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইছেন। কেন এই ইস্যুর ওপর সংলাপ চাইছেন সরকারের কাছে?

বিগত ৫ জানুয়ারির তিন চার মাস আগে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী সরকার বিষয়ে বিএনপির সাথে সংলাপ চেয়েছিল। আওয়ামী লীগের জ্যৈষ্ঠ নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রমুখ সংলাপে বসতে বিএনপির পায়ে ধরতে বাকি রেখেছিলেন। পার্লামেন্টে হোক, পার্লামেণ্টের বাইরে হোক, বিএনপির সাথে সংলাপে বসতে রাজি ছিল আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান দুই বা তিন দলের সমবায়ে গঠিত প্রস্তাবিত নির্বাচনী সরকারের বিএনপিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত দিতে রাজি হয়েছিলেন। জবাবে বিএনপি থেকে পরিহাসের ভাষায় বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তন করলেই তো হয়,- এইসব বসা-টসা, সংলাপ ইত্যাদির কি দরকার!

এরপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী নেতা বেগম জিয়ার সাথে নির্বাচনী সরকার নিয়ে একান্তে বসতে চেয়েছিলেন। বেগম জিয়া জবাবে অত্যন্ত কর্কশ কণ্ঠে হুঁশিয়ারি দিয়ে শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমতা ত্যাগ করুন, নতুবা সরকারের পতন দেখার জন্য প্রস্তুত থাকুন!

তখন জানতাম না। এখন জানি। শ্বশুরকে অহরহ শালা বলা, উত্তরা ষড়যন্ত্রের খলনায়ক মাহ্মুদুর রহমান ততদিনে হেফাজতের তেঁতুল হুজুর এবং তার চেলাদের টাকা-পয়সা দিয়ে ম্যানেজ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। কথা ছিল ওয়াজ পড়তে তাঁরা ঢাকা আসবেন। তারপর সরকার পতনের জন্য যা যা করতে হয় তাঁরা করবেন।

বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা অত্যন্ত পরহেজগার মুসলিম নারী হিসাবে সুপরিচিত। পীর-ফকীর-সুফীদের প্রতি তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। হেফাজতীদের ঢাকা আসার অনুমতি দিতে তাঁর শুভান্যুধায়ীদের অনেকের নিষেধ না শুনে তিনি হেফাজতে ইসলামকে ঢাকা এসে ওয়াজ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। পরের বৃত্তান্ত সবারই জানা। ঢাকা শহরে তা-বের চূড়ান্ত করেছিল হেফাজতীরা। বায়তুল মোকাররমে শত শত পবিত্র কোরান শরীফ পোড়াতেও তাঁদের ‘ইমানী- দায়িত্বে’ বাঁধেনি।

না, অবৈধভাবে ক্ষমতায় চেপে বসা জিয়াউর রহমানের বিএনপি সংলাপ তথা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করে না। তার নিদর্শন তো গত ৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেখা যায়। আশ্চর্যের বিষয় বিএনপি যে আওয়ামী লীগের সংলাপ তাচ্ছিল্য এবং পরিহাসের সাথে উপেক্ষা করল তাতে আমাদের প্রভাবশালী মিডিয়া, স্যার ও নোবেলপ্রাপ্ত দুই ব্যক্তি আন্তর্জাতিক সংস্থার ‘গণতন্ত্র-প্রাণ’ কতিপয় এজেন্সি এবং সুশীল দালালরা তেমন রা’- শব্দ করল না। যেন বিএনপির সংলাপে বসার কিংবা গণতন্ত্রী হওয়ার প্রয়োজন নেই। যা কিছু প্রয়োজন তা আওয়ামী লীগের।

বিএনপির রাজনীতিকে ধ্বংসাত্মক করার পেছনে উল্লেখিত ব্যক্তি, মিডিয়া এবং এজেন্সি সুশীল-দালালরাও দায়ী বলে অনেকে মনে করেন। এই মুহূর্তে বিএনপি সেই পুরনো কায়দায় সরকারের সাথে সংলাপ চাইছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেখানে সেখানে সংলাপ তো অবশ্যই। তবে তালগাছটা আমার, ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে সংলাপে বসেই বা কি লাভ!

গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রায় একতরফা হওয়ার অপ-নায়ক বিএনপি-জামায়াত। অনেকে বিশ্বাস করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা মধ্যবর্তী নির্বাচন ইস্যুতে কোন পক্ষ অনড় থাকলে সংলাপে বসে লাভ নেই।

৫ জানুয়ারি বিএনপি যে নির্বাচনে আসেনি, সেই অপরাধ বা ভুলের দায় আওয়ামী লীগ তথা ১৪ দলের ওপর আসে না, আসে বিএনপি-জামায়াতের ওপর। সংলাপ, সংলাপ খেলার পেছনে আসল খেলাটা, সেটা আগে বুঝা দরকার।

১৪ জানুয়ারি, ২০১৪

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

প্রকাশিত : ১৫ জানুয়ারী ২০১৫

১৫/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: