মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঢাকায় নবাগত তারুণ্য আবাসন সঙ্কট ও বিড়ম্বনা

প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারী ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

কেস স্টাডি ১

৬-৭ মাস আগের কথা। রাদুল মাগুরা থেকে এসেছে ঢাকায়। উদ্দেশ্য প্রথমে একটি ভাল কোচিং সেন্টারে ভর্তির পর এইচএসিতে রেজাল্ট অনুযায়ী যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার চেষ্টা। ওর প্রথম পছন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে না হলে যে কোন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, মোটামুটি সচ্ছল পরিবারের সন্তান। ব্যবসায়ী বাবা মাগুরা শহরে নিজেদের বাড়ি থাকলেও ঢাকায় তেমন আত্মীয়-স্বজন নেই। পরিচিতজনও নেই তেমন। বাড়ি থেকে আসার পর প্রথমে গুলিস্তান সংলগ্ন নবাবপুরের কম দামি এক হোটেলে ওঠে। কিছুদিন থাকার পর দু’একজন পরিচিতজনের মাধ্যমে খোঁজা শুরু হয় ১ রুমের বাসা। একাই থাকার ইচ্ছা। যাতে লেখাপড়ার সুবিধা হয়। এক রুমের বাসা বেশ কয়েকটা পাওয়া গেল বটে কিন্তু বয়স অল্প। অবিবাহিত, আয় নেই, ছাত্রকে ভাড়া দেবে না ইত্যাকার কারণ-দেখিয়ে বাড়িওয়ালারা রাদুলকে হতাশ করে। এদিকে টাকাও ফুরিয়ে আসছে আবার কোচিং সেন্টরে ভর্তির সময়ও সমাগত।

রাদুলের দুঃশ্চিন্তা দেখে এর মধ্যে পরিচয় হওয়া কয়েকজন এগিয়ে আসে। তারা পরামর্শ দেন কোন মেসে ওঠার। শুরু হয় আবার মেস খোঁজা। শাহবাগ, ধানম-ি, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় মেসের জন্য ঞঙ-খঊঞ টানানো বিজ্ঞপ্তিতে ‘আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধা দেখে উঠে পড়ে এক মেসে। পনেরো দিন যেতে না যেতেই শুরু হয় আমাশয় তার পরের মাসে জন্ডিস। কোচিং সেন্টার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে দুঃশ্চিন্তা জেঁকে বসে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশÑ নেই আলো-বাতাস ঢোকার কোন ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির কথা ভাবা যায় স্বপ্নে, রাতের প্রথম প্রহরের মধ্যেই আলো নিভানোর নির্দেশ নানা কারণেই লেখাপাড়া হয় ব্যাহত। পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন। বারো এলাকার বারোজন। কেউ কাউকে ভালভাবে চেনে না। গাদাগাদি করে এক রুমে ৬-৭ জন। ফ্লোরেও ঘুমায় কেউ কেউ। নিজের শখের ল্যাপটপ, দামি মোবাইল, পেন ড্রাইভ সঙ্গে মানিব্যাগ নিয়েও তার দুঃশ্চিন্তা। কোথায় এসব রাখবে? যদি চুরি হয়ে যায় কিংবা ব্যবহৃত হয় নানা হাতে!

অনেক কষ্ট করে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামলে উঠেছে তথাপি ভর্তি পরীক্ষা আশানুরূপ না হওয়ায় ভর্তি হতে পারেনি স্বপ্নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে হয়েছে ঠাঁই। স্বপ্ন পূরণে বাধা হিসেবে আজও ও মনে মনে দোষারোপ করে ঢাকার বাইরে থেকে আসা তারুণ্যের অনুকূলে যথার্থ, প্রয়োজনীয় এবং উপযুক্ত আবাসন ব্যবস্থা না থাকাকে।

কেস স্টাডি ২

সিরাজগঞ্জের ছেলে মৃদুল। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছাত্র জীবনে বেশ কয়েকবার ঢাকায় এসেছেন বিভিন্ন প্রয়োজনে। দুই একদিনের বেশি থাকার প্রয়োজন পড়েনি, এর চেয়ে বেশি থাকতেও চাননি। কেন যেন দম বন্ধ হয়ে আসত তার। গ্রামের মুক্ত পরিবেশে অবাধ বিচরণে অভ্যস্ত মৃদুল ঢাকার এমন পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারেনি। দুর্ভাগ্যই হোক আর যা-ই হোক শেষ পর্যন্ত তার কর্মস্থলই হয়েছে ঢাকায়। দুয়েকজন পরিচিত বা আত্মীয়-স্বজন যারা আছেন সেখানে দীর্ঘস্থায়ী বাসের কোন সুযোগ তার নেই।

ঢাকায় স্থায়ীভাবে আসার আগে গত বছর এ বাস্তবতা তাকে ভাবিয়েছে। ঢাকায় একটি প্রাইভেট ফর্মে ভাল বেতনে চাকরি পেলেও থাকার শুরুটা যেমন ওর জন্য বিড়ম্বিত তেমনি ফেলেছিল লজ্জায় ও বিপদে। ভাল আয় তবু ফ্ল্যাট পাননি ব্যাচেলর বলে। শেষমেষ উঠতে বাধ্য হন এক মেসে। ওপর থেকে দৃশ্যত বেশ ভাল পরিবেশ মনে হলেও কিছুদিন পরে বেরিয়ে আসে এর আসল চেহারা।

দুই রুমের ফ্ল্যাটে বাসিন্দা চারজন। মৃদুলের রুমে ও সহ দুইজন অন্য রুমে দুইজন। পাশের রুমে প্রায়ই গেস্ট আসে। অনেক রাত অবধি চলে হৈ হুল্লোড়। ওদের পেশা সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু ধারণাও পাওয়া যাচ্ছিল না। যারা গেস্ট হয়ে আসত তাদের হাবভাবও কেমন যেন সন্দেহজনক। ওই রুম থেকে গভীর রাতে আসা গাঁজার গন্ধে বেশ অস্বস্তিতে পড়ে যেত মৃদুল। ওর আশঙ্কা একদিন ফলে যায়। পুলিশ তল্লাশি চালায় ওদের ফ্ল্যাটে। ওর পাশের রুমে পাওয়া যায় ইয়াবাসহ গাঁজা। যারা ওই রুমে আসত তাদেরও ক’জন ধরা পড়ে। বেরিয়ে আসে তাদের পরিচয়-মাদক ব্যবসা, ছিনতাই-রাহাজানির সঙ্গে তারা জড়িত। পুলিশ ওর রুমে তল্লাশি চালিয়ে যদিও কিছু পায়নি তবুও যেতে হয় থানায়। অন্যের অপরাধে বাড়িওয়ালার চাপে ছাড়তে হয় রুম। থানা-পুলিশ করতে গিয়ে পড়ে পদে পদে বিড়ম্বনায়। নিজ এলাকার এক রাজনৈতিক বড় ভাইয়ের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি সামনে উঠলেও অফিসে তার ভাবমূর্তি হয় প্রশ্নবিদ্ধ। যদিও আরেকটি মেসে অনেক কষ্টে নিজের জায়গা হয়েছে তবু মানসিকভাবে দুঃশ্চিন্তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। মানসম্মানের ভয়, অর্থ গেল। নিজের ভাবমূর্তি সঙ্কটে আবার না জানি কী হয়!

প্রতিদিন না হলেও প্রতিমাসে এই ঢাকা শহরে উচ্চশিক্ষার জন্য, নতুন কর্মস্থলে যোগদান বা জীবিকার তাগিদে অসংখ্য তরুণ আসছেন। এর মধ্যে শতকরা ৯০ জনের অধিকই বলা যায় অবিবাহিত। তাদের সংসার হয়ত নেই। আর যাদের আছে ঢাকার বাসাভাড়ার উর্ধগতির বাস্তবতায় স্ত্রী-সন্তানকে আনতে সাহস পান না। একজন তরুণের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রারম্ভিক অবস্থায় কিংবা নতুন কর্মস্থলে যোগদানের প্রাথমিক সময়ে যে আবাসন সঙ্কটে পড়েন তার দুটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এ দুটি ঘটনা সামগ্রিক চিত্রের খ-াংশমাত্র। লক্ষ তরুণের এ ধরনের হাজারো সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত তারুণ্যের মধ্যে নারীও আছেন। তাদের সমস্যাও বিপদ তো আরও ভয়ঙ্কর। সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

ঢাকার বাইরে থেকে নতুন আসা এ তরুণদের আবাসন সঙ্কট আজকের নয়। দিনে দিনে জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে। উচ্চশিক্ষা, কর্মস্থল ও জীবিকার প্রয়োজনে ঢাকা শহরে নবাগত তরুণদের সংখ্যাও তাল মিলিয়ে বাড়ছে। শুধু বাড়ছে না, তাদের উপযোগী ও সংখ্যাগত আবাসন ব্যবস্থা। যদিও কোন তরুণ বা তরুণী উচ্চশিক্ষা নিতে এসে একটা সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলে সিট পেয়ে যান তবে মোট সমস্যার তা কিয়দংশমাত্র। কিন্তু সিট পাওয়া যেমন কষ্টসাধ্য তেমনি সময়ের ব্যাপার। সিট পাওয়ার আগ পর্যন্ত তার আবাসন সঙ্কটের সমাধান হবে কীভাবে? সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো আর আবাসন ব্যবস্থা থাকে না। ঢাকা শহরে হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে, তাও আবার ব্যয়বহুল ও স্বাস্থ্যকর নয়।

ব্যাচেলর কর্মজীবী তরুণের জন্য আবাসন সমস্যাকে কেন্দ্র করে এ শহরে গড়ে উঠেছে ব্যবসা। একজন ভাড়াটিয়া অর্থের বিনিময়ে যে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার কথা তা তো পানই না বরং ক্ষেত্র বিশেষে হন বিব্রত ও বিড়ম্বিত। ঢাকা শহরে নবাগত তরুণদের আবাসন সমস্যার সমাধান এখন জরুরী। দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে এ সঙ্কট হয়ত এতটা প্রকট নয়; ঢাকা শহরে যতটা প্রবল। রাজধানী যেহেতু দেশের প্রাণকেন্দ্র সেহেতু এখানে নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর, উন্নত, শিক্ষাপাঠের উপযোগী আবাসন ব্যবস্থা সরকারী-বেসরকারীভাবে নতুন করে গড়ে উঠবে এ প্রত্যাশা শিক্ষা ও উন্নয়নের মেরুদ- লক্ষ কোটি তরুণের।

প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারী ২০১৫

১৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: