কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মজুদ গ্যাসের অর্ধেক শেষ ॥ জ্বালানি সঙ্কটের পথে দেশ

প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারী ২০১৫
  • দশ বছরে বড় কোন মজুদের সন্ধান মেলেনি

রশিদ মামুন ॥ ভয়ঙ্কর জ্বালানি সঙ্কটের দিকে ধাবিত হচ্ছে দেশ। প্রধান জ্বালানি গ্যাসের প্রমাণিত মজুদের অর্ধেকের বেশি শেষ হয়ে গেছে। গত ১০ বছরে স্থলভাগে বড় কোন মজুদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য সুখবর মেলেনি। ভূতাত্ত্বিকরা বলছেন, নতুন করে স্থলভাগে বড় মজুদ পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অন্যদিকে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে কী পাওয়া যাবে তাও অনিশ্চিত। দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারী উদ্যোগ আলোর মুখও দেখছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই জ্বালানি সমস্যা সমাধানে সরকারের মনোনিবেশ করা উচিত।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এখন ১৯টি ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। এলোর মোট মজুদের পরিমাণ সাড়ে ১৯ ট্রিলিয়ন ঘনফুটের (টিসিএফ) কিছুটা বেশি। অর্থাৎ ১৯ হাজার ৬০৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ঘনফুট। এখন পর্যন্ত এই ক্ষেত্রগুলোর ১১ টিসিএফের কিছু বেশি গ্যাস উত্তোলন হয়েছে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৯ ক্ষেত্রের মোট উত্তোলিত গ্যাসের পরিমাণ ১১ হাজার ৯৫ দশমিক ২ বিসিএফ। অর্থাৎ অবশিষ্ট গ্যাস মজুদের পরিমাণ সাড়ে আট টিসিএফের মতো। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে যার পরিমাণ ৮ হাজার ৫২৫ দশমিক ৩৫ বিসিএফ। প্রতিবছর গড়ে দৈনিক দুই হাজার ঘনফুট হারে আমাদের বার্ষিক গ্যাস ব্যবহারের পরিমাণ এক টিসিএফের মতো। সরল হিসেবে অবশিষ্ট মজুদ দিয়ে আমাদের আর মাত্র আট বছর চলবে। যদিও পেট্রোবাংলা দেশের মজুদ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক নিয়ম না মেনেই পি-১, পি-২ এবং পি-৩ এই তিন ধাপে হিসেব করে। এর মধ্যে পি-১ কে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়। অন্য দুটি ধাপের মজুদ নির্ধারণে গ্যাস পাওয়ার বিষয়ে যথেষ্ট নিশ্চয়তা নেই।

পেট্রোবাংলা বলছে, পি-১ মূলত প্রমাণিত মজুদকে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে পি-২ তে প্রুভড (প্রমাণিত) মজুদের সঙ্গে সম্ভাব্য মজুদকে যোগ করা হয়। এক্ষেত্রে সম্ভাবনা রয়েছে এমন জায়গাতে কয়েকটি কূপ খননের পর এই গ্যাসের মজুদ নিশ্চিত করা সম্ভব। পেট্রোবাংলা বলছে পি-২ তে মজুদের পরিমাণ ২৫ দশমিক ৭৪৪ টিসিএফ। অন্যদিকে পি-৩ মজুদের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে বিবেচনা করা হয়। এখানে প্রমাণিত মজুদের সঙ্গে সম্ভাবনীয় এবং সম্ভবপর; এই তিনটি ধাপকে যোগ করা হয়। পি-৩ তে জমুদের পরিমাণ দেখানো হচ্ছে ২৯ দশমিক ৬৭৩ টিসিএফ। পি-৩ এর গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ভবিষ্যত বিশ্বে উন্নত প্রযুক্তির উদ্ভাবন বা অধিকতর খনন প্রক্রিয়ায় এখানে কিছু আবিষ্কারের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে পেট্রোবাংলা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রক্রিয়ায় মজুদ নির্ধারণে এক ধরনের ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হচ্ছে। আদৌ গ্যাস পাওয়া যাবে কি যাবে না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কাজেই কেন তিন স্তরের মজুদ নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. হোসেন মনসুর বলেন, পি-২ এবং পি-৩ মজুদ নির্ধারণের স্বীকৃত পদ্ধতি না হলেও আমাদের এখানে সেটা করা হয়। তবে বলা চলে আমাদের প্রমাণিত অবশিষ্ট মজুদের পরিমাণ কোন অবস্থানেই সাড়ে আট টিসিএফের বেশি হয়। ফলে বিকল্প অনুসন্ধান করতে হবে। প্রধান জ্বালানি গ্যাসের ওপর নির্ভরতা না কমালে আমাদের ভয়ঙ্কর জ্বালানি সঙ্কটে পড়তে হবে। বিকল্প হিসেবে সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, স্থলভাগে বড় কোন মজুদ পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। এছাড়া বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির কথাও আমাদের ভাবতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি আমদানির চুক্তি করা উচিত। সম্ভাব্য জ্বালানির সকল উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ওপর জোর দেয়ার আহ্বান জানান পেট্রোবাংলার সাবেক এই চেয়ারম্যান।

সরকারী হিসেবেই এখন দেশে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ঘাটতি আছে। যদিও বিতরণ কোম্পানিগুলোর হিসেবে এই ঘাটতি আরও ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট বেশি অর্থাৎ ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। পেট্রোবাংলা সম্প্রতি দেয়া এক প্রতিবেদনে বলছে, ২০১৯ দেশে গ্যাস ঘাটতি বেড়ে এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট ছাড়িয়ে যাবে। শিল্পে নতুন সংযোগ দেয়া সীমিত রাখলে আগামী দুই বছর ধরে একই রকম গ্যাস ঘাটতি থাকবে। পেট্রোবাংলা দেশের বিদ্যুত উৎপাদন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে গ্যাস ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি হিসেব করে বলছে, ২০১৮ এবং ২০১৯-এ সর্বাধিক গ্যাস ঘাটতির কবলে পড়তে হবে। ওই সময় ২০১৯ সালে সরবরাহ করা হবে সর্বোচ্চ তিন হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। একই সময় চাহিদা দাঁড়াবে চার হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরকার এখন গ্যাসনির্ভর বড় বড় বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করছে তা ২০১৮ এবং ২০১৯ এ উৎপাদন শুরু করবে। ফলে বিকল্প অনুসন্ধান না করলে বিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণের পরও উৎপাদন বন্ধ রাখতে হবে। আগামী ২০১৯ সালের মধ্যে বিদ্যুত উৎপাদনে দৈনিক দুই হাজার ৯৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হবে।

গত ১০ বছর দেশে গ্যাসের অনুসন্ধান কার্যক্রম খুবই হতাশাজনক। সর্বশেষ ২০০৪ সালে বাঙ্গুরা গ্যাস ক্ষেত্রের পর আর বড় কোন মজুদের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আশা এবং সাড়া জাগানো অনেক খবর প্রচার করা হলেও শেষ পর্যন্ত যা হতাশ করেছে সকলকে। ফলে ঘুরেফিরে শুধু বিদ্যমান গ্যাস ক্ষেত্রের মজুদের দিকে হাত বাড়ানো হয়েছে। এখনও উৎপাদন বৃদ্ধির প্রায় সকল প্রকল্পই বিদ্যমান গ্যাসখনিকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে ২০১১, ২০১২ এবং ২০১৪-তে তিনটি ক্ষেত্রে গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার করেছে বাপেক্স। এরমধ্যে দুটি ক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। ২০১১-তে সুন্দলপুর ক্ষেত্রের প্রতিদিনের উত্তোলন ক্ষমতা ১০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও প্রকৃত উৎপাদন চার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি নয়। আর ২০১২তে শ্রিকাইলে দ্বিতীয়বার কূপ খনন করে গ্যাস পাওয়া যায়। এখানে দুটি কূপ থেকে দৈনিক ৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন ক্ষমতায় ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তোলা হচ্ছে। সম্প্রতি আবিষ্কৃৃত কেরানীগঞ্জের রূপগঞ্জে খনি থেকে এখনও গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়নি। যদিও এখানে বড় কোন মজুদ থাকার কথা জানাতে পারেনি পেট্রোবাংলা। দাবি করা হচ্ছে এখান থেকে দৈনিক ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। এর বাইরে বাপেক্সের সালদা নদী ক্ষেত্রটির প্রতিদিনের উৎপাদন ক্ষমতা ২০ মিলিয়ন ঘনফুটের স্থলে ১১ মিলিয়ন ঘনফুট, ফেঞ্চুগঞ্জে উৎপাদন ক্ষমতা ৪০ মিলিয়ন ঘনফুটের স্থলে ৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট, শাহবাজপুরে ৩০ মিলিয়ন ঘনফুটের স্থলে সাড়ে সাত মিলিয়ন ঘনফুট এবং সেমুতাংয়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুটের স্থলে সাড়ে চার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস তোলা হচ্ছে। অর্থাৎ সংখ্যার বিচারে গ্যাস ক্ষেত্রের পরিমাণ বাড়লেও উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট অতিক্রম করতে পারছে না।

অন্যদিকে আশা জাগানো খবর দিয়েও সুনেত্র, ব্লক-৭ এবং গাজিপুরের কাপাসিয়ায় শেষ পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া যায়নি। এরমধ্যে সুনেত্র এবং কাপাসিয়ায় গ্যাসকূপ খনন করে বাপেক্স। অন্যদিকে ব্লক-৭ এ কূপ খনন করে বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি শেভরন বাংলাদেশ। এর মধ্যে সব থেকে সম্ভাবনাময় বলে প্রচার করা হয় সুনেত্রকে। জানা যায়, ২০০৮-০৯ মৌসুমে ব্লক ১১ তে নেত্রকোনা জেলা এবং এর সংলগ্ন এলাকায় বাপেক্সের নিজস্ব অর্থায়নে ৩০৪ দশমিক ১৯ লাইন কিলোমিটার ৩০ ফোল্ড ২-ডি সাইসমিক সার্ভের (ভূত্ত্বাতিক জরিপ) উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এলাকায় দুটি স্তরে সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া ২০০৯-১০ অর্থবছরে আরও ২৫০ থেকে ৩০০ লাইন কিলোমিটার সাইসমিক সার্ভের ফল বিশ্লেষণ করে কূপ খননের আগেই বলা হয়েছিল এখানে সাড়ে তিন থেকে অন্তত চার টিসিএফ গ্যাসের মজুদ রয়েছে। কিন্তু কূপ খনন করার পর আর গ্যাস মেলেনি।

গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুপারিশ থাকলেও এখনও বিকল্প ব্যবহারের শুরুর পর্যায়েই পৌঁছা সম্ভব হয়নি। বিগত ২০১০ সালে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিলেও এখনও চুক্তিই করতে পারেনি পেট্রোবাংলা। অন্যদিকে বিদ্যুত বিভাগ অপর একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ ব্যাপারে কোম্পানির সংক্ষিপ্ত তালিকা করা হয়েছে। তালিকায় থাকা পাঁচটি কোম্পানি হলোÑভারতের সর্ববৃহৎ এলএনজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পেট্রোনেট এলএনজি, এ্যাংলো-ডাচ সুপার মেজর শেল, চীনা হুয়াংকিউ কনট্রাকটিং এ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, বেলজিয়ামের ট্র্যাক্টেবল ইঞ্জিনিয়ারিং ও জাপানের মিত্সুই। কোন বিপত্তি না ঘটলে স্থায়ী টার্মিনাল নির্মাণের কার্যাদেশ দিতে আরও এক বছর সময় প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন। তিনি জনকণ্ঠকে জানান, কাজ পাওয়ার পর নির্মাণ করতে আরও তিন বছর সময় প্রয়োজন হবে।

উন্মুক্ত এবং সুড়ঙ্গ বিতর্কর কারণে সরকার দেশীয় কয়লা উত্তোলনে বিগত ছয় বছরে কোন উদ্যোগ নেয়নি। এ অবস্থায় জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারী ২০১৫

১৩/০১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: